ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৫৩ এএম, ০৬ জানুয়ারি ২০২৬
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ছবি: জাগো নিউজ

আহমাদ সাব্বির

আঠারো শতকের সূচনালগ্ন থেকেই উপমহাদেশে মুসলিম রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে এক গভীর সংকটের সূচনা হয়। দীর্ঘদিনের শক্তিশালী মোগল সাম্রাজ্য দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে গেলে একদিকে প্রাদেশিক শাসকরা দিল্লীর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে থাকে, অন্যদিকে মারাঠা, শিখ ও ইউরোপীয় বণিক শক্তি—বিশেষত ইংরেজ ও ফরাসিরা—ক্রমশ রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মুসলিম সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় উদাসীনতা ও হিন্দুয়ানি কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ সমাজজীবনকে দুর্বল করে তোলে। এই যুগসন্ধিক্ষণে যে ক’জন মনীষী উপমহাদেশীয় মুসলমানদের আত্মসচেতন করতে ও নবজাগরণের পথ দেখাতে এগিয়ে আসেন, তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারিত নাম মুহাদ্দিসে দেহলভী বা দিল্লির মুহাদ্দিস মাওলানা শাহ ওয়ালিউল্লাহ

শাহ ওয়ালিউল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর এক সুপ্রাচীন আলিম ও সুফি পরিবারে। তার পরিবার ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য সুপরিচিত ছিল। তার বাবা শাহ আবদুর রহিম ছিলেন বিখ্যাত ‘ফতওয়ায়ে আলমগীরী’-র অন্যতম সম্পাদক এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। অনেকের মতে, শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন মুজাদ্দিদ আলফে সানী শায়খ আহমদ সিরহিন্দীর বংশধর। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রেই তিনি পেয়েছিলেন জ্ঞান, সাধনা ও সংস্কারমুখী চিন্তার এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য।

শৈশবকাল থেকেই শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তার স্মৃতিশক্তি ও অধ্যয়নক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। তিনি বাবার কাছে এবং পরবর্তীতে তৎকালীন খ্যাতনামা আলেমদের কাছে আরবি ও ফারসি ভাষা, কোরআনের তাফসির, হাদিস, ফিকহ, উসুল, ইতিহাস, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ন্যায়শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষত সমাজ ও ইতিহাস বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল প্রবল। তিনি ইবনে খালদুনের রচনাবলি গভীর মনোযোগে অধ্যয়ন করেন এবং তার চিন্তাধারার প্রভাব পরবর্তীতে নিজস্ব মৌলিক দর্শনে রূপ দেন। রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তার দৃষ্টি ছিল বাস্তববাদী ও বিশ্লেষণধর্মী।

মাত্র ষোলো–সতেরো বছর বয়সে বাবার ইন্তেকালের পর তিনি দিল্লির বিখ্যাত রহিমিয়া মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে এই মাদ্রাসা কেবল ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্রই নয়, বরং একটি আদর্শ শিক্ষা ও চিন্তাচর্চার প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। তিনি শিক্ষা পদ্ধতিতে সংস্কার আনেন এবং কোরআন-হাদিসের সঙ্গে সমাজ ও বাস্তব জীবনের সংযোগ ঘটানোর ওপর গুরুত্ব দেন। ১৭২৪ সালে হজ পালনের উদ্দেশ্যে তিনি মক্কায় গমন করেন এবং সেখানে খ্যাতনামা আলেম শাহ আবু তাহেরের কাছে হাদিসসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৭৩০ সালে দিল্লিতে প্রত্যাবর্তনের পর তার প্রকৃত কর্মজীবনের সূচনা হয়।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন একান্তভাবে জ্ঞানসাধনায় নিবেদিত মানুষ। অধ্যয়ন, শিক্ষা ও মৌলিক রচনাই ছিল তার জীবনের প্রধান ব্রত। তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক বৃহৎ জ্ঞানমণ্ডলী, যেখান থেকে পরবর্তীকালে বহু প্রখ্যাত আলিম ও সংস্কারক বেরিয়ে আসেন। তার পুত্র শাহ আবদুল আজিজ, পৌত্র শাহ ইসমাইল শহীদ এবং জামাতা মাওলানা আবদুল হাই—সকলেই তার চিন্তা ও আদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। বিশেষত শাহ ইসমাইল শহীদ উপমহাদেশীয় মুসলিম ইতিহাসে এক বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত। আল্লামা ইকবাল যথার্থই বলেছেন, ইসলামের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য যিনি কেবল কলম নয়, প্রয়োজনে তরবারিও ধারণ করেছিলেন, তিনি ছিলেন শাহ ইসমাইল শহীদ—আর তার সেই প্রেরণার উৎস ছিলেন পিতামহ শাহ ওয়ালিউল্লাহ।

ব্যক্তিগত জীবনে শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, নির্লোভ ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। দিল্লিতে বসবাস করলেও তিনি কখনো রাজদরবারের আনুকূল্য লাভের চেষ্টা করেননি। পার্থিব যশ, অর্থ ও ক্ষমতা তার কাছে ছিল তুচ্ছ। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, বাদশাহ থেকে শুরু করে সাধারণ ফকির পর্যন্ত সকল স্তরের মানুষ তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করত। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি তার চারিত্রিক দৃঢ়তা ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব তাকে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ ইসলামি জ্ঞানচর্চায় এক যুগান্তকারী কাজ করেন কোরআনের অনুবাদের মাধ্যমে। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম ফারসি ভাষায় কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ করেন। সে যুগে এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ। অনেক রক্ষণশীল আলেম এর বিরোধিতা করেন এবং তাকে সাময়িকভাবে দিল্লি ত্যাগ করতে হয়। পরবর্তীকালে তার পুত্র শাহ আবদুল কাদের উর্দু ভাষায় কোরআনের অনুবাদ করেন, যা উপমহাদেশে কোরআন বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই উর্দু অনুবাদকে ভিত্তি করেই গিরিশচন্দ্র সেন ১৮৮৫ সালে সর্বপ্রথম বাংলায় কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ করেন—যার ফলে শাহ ওয়ালিউল্লাহর প্রভাব বাংলার মুসলিম সমাজেও বিস্তৃত হয়।

সমসাময়িক রাজনৈতিক অবস্থা শাহ ওয়ালিউল্লাহকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। মোগল শাসনের পতন, মারাঠা ও শিখ শক্তির উত্থান এবং ইউরোপীয় বণিকদের আগ্রাসন—সব মিলিয়ে তিনি মুসলিম সমাজের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক অবক্ষয়ই তাদের রাজনৈতিক দুর্বলতার মূল কারণ। তাই তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে সমাজ সংস্কারের ডাক দেন এবং মুসলমানদের জিহাদি চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। তার ‘ফয়যুল হারামাইন’ ও ‘তাফহিমাতে ইলাহিয়া’ গ্রন্থে এই চেতনার প্রতিফলন সুস্পষ্ট।

তিনি মুসলিম সমাজে প্রচলিত বিদআত, কুসংস্কার ও হিন্দুয়ানি আচার-অনুষ্ঠানের কঠোর সমালোচনা করেন এবং শরিয়াভিত্তিক জীবনব্যবস্থার প্রতি আহ্বান জানান। মক্কায় অবস্থানকালে ওহাবি আন্দোলনের সঙ্গে তার চিন্তার মিল থাকলেও তিনি অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে সংস্কারের পথ বেছে নেন। জিহাদ সম্পর্কে তিনি এক সুস্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যা দেন যে তা কেবল সামরিক সংগ্রাম নয়, বরং নৈতিক, সামাজিক ও আত্মিক সংস্কারের সংগ্রামও বটে।

শাহ ওয়ালিউল্লাহ ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক দার্শনিকদের শেষ মহান প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন। ইমাম গাজালির মতো তিনিও দর্শন ও যুক্তির মাধ্যমে ইসলামের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ত্রিশেরও বেশি। এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক গ্রন্থ হলো ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাএই গ্রন্থে তিনি মানব সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার বিকাশকে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। মানুষের মৌলিক চাহিদা—আহার, আশ্রয় ও যৌন প্রবৃত্তি—কিভাবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি এখানে তুলে ধরেন।

রাষ্ট্র সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত আধুনিক। তিনি রাষ্ট্রকে কোনো ঐশী সত্তা হিসেবে দেখেননি, বরং মানুষের সামাজিক প্রয়োজনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। শাসক, প্রশাসন ও নাগরিকদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে তার বক্তব্য আজও প্রাসঙ্গিক। ন্যায়বিচার, কর ব্যবস্থার ভারসাম্য, শিক্ষা ও কৃষির গুরুত্ব, মালিক-শ্রমিকের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা—এসব বিষয়ে তার চিন্তা তাকে ইবনে খালদুনের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

উপমহাদেশীয় মুসলমানদের সংস্কার ও পুনর্জাগরণে শাহ ওয়ালিউল্লাহর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মধ্যযুগের অবসান ঘটেছে এবং মুসলমানদের নতুন বাস্তবতায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। তাই তিনি অস্ত্রের চেয়ে কলমকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংস্কারের পথ বেছে নেন। আজ উপমহাদেশে ইসলামের যে স্বতন্ত্র রূপ আমরা দেখি, তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তিনিই। এ কারণেই ইতিহাসে তিনি খ্যাত হয়েছেন ‘ইমামুল হিন্দবা হিন্দের ইমাম উপাধিতে।

১৭৬২ খ্রিস্টাব্দে শাহ ওয়ালিউল্লাহ ইন্তেকাল করেন। তার জন্মকালে মোগল সাম্রাজ্য ছিল শক্তিশালী, আর তার মৃত্যুকালে পলাশীর প্রান্তরে সেই সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়ে গেছে। কিন্তু রাজনৈতিক পতনের এই অন্ধকার সময়েই তিনি উপমহাদেশীয় মুসলমানদের জন্য রেখে যান এক দীপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার—যা আজও পথনির্দেশক হয়ে আছে।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।