সিরাত পাঠ কেন অপরিহার্য?

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:১৯ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
সিরাত পাঠ কেন অপরিহার্য? ছবি: আনপ্ল্যাশ

আহমাদ সাব্বির

একজন মুসলমান এক মুহূর্তের জন্যও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও শিক্ষার বাইরে থাকতে পারে না। তাই সিরাতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হওয়া উচিত সার্বক্ষণিক। আমাদের জিহ্বা থাকবে তার স্মরণে সতেজ, হৃদয় থাকবে তার ভালোবাসায় পূর্ণ এবং চিন্তা-চেতনা হবে তার আদর্শে আলোকিত। কলমের জন্যও এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে—সে যদি নবীজির জীবনচরিত লেখার সম্মান লাভ করে।

সিরাতে মুহাম্মাদি চিরসবুজ ও চিরসজীব এক বিষয়। যুগের পরিবর্তনে এর আবেদন কখনো ম্লান হয়নি; বরং কেয়ামত পর্যন্ত তা অম্লান থাকবে। বক্তাদের ভাষণে, লেখকদের রচনায়, গবেষকদের চিন্তায় সিরাত বরাবরই প্রাণের সঞ্চার করে এসেছে। এজন্যই ইতিহাসে খুব কম আলেম পাওয়া যায়, যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সিরাত নিয়ে লেখেননি। কবিতায় নাত একটি স্বতন্ত্র ও পবিত্র ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষায়—ছোট-বড়, সহজ-গভীর, শিশু-কিশোর থেকে নারী-পুরুষ—সবার উপযোগী অসংখ্য সিরাতগ্রন্থ রচিত হয়েছে।

মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে তাদের নবীর সম্পর্ক অন্যান্য জাতির সঙ্গে তাদের ধর্মীয় নেতাদের সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউরোপের ইতিহাসে দেখা যায়, চার্চ ও রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের ফলে ধর্মকে মানুষের ব্যবহারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এর পরিণতিতে ধর্মীয় নেতারা কেবল সম্মানের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন, অনুসরণের আদর্শ হিসেবে নয়। অথচ ইসলামে আলহামদুলিল্লাহ, আলেম ও জনসাধারণের মাঝে এমন বিচ্ছেদ সৃষ্টি হয়নি। ইসলাম নবীকে মানবতার জন্য বাস্তব, অনুসরণযোগ্য আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তার জীবন ও শিক্ষা মানবপ্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই নবীর সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক শুধু শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নয়; বরং আনুগত্য ও অনুসরণের—যা ইমানের অপরিহার্য দাবি।

পবিত্র কোরআনে একাধিক স্থানে আল্লাহ তায়ালা রাসুলের আনুগত্যকে ইমানের শর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। রাসুলের আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্যের সমতুল্য করা হয়েছে। তার আদেশ পালন ও নিষেধ থেকে বিরত থাকা শরিয়তের মৌলিক নির্দেশ। এমন কি কোনো বিষয়ে রাসুল ফায়সালা দিলে সেখানে মুমিনের আর কোনো বিকল্প থাকে না। শুধু আনুগত্যই নয়, তার কর্ম ও আমলের অনুসরণ মুমিনের জন্য অপরিহার্য। বরং আল্লাহর ভালোবাসা লাভের শর্ত হিসেবেও রাসুলের অনুসরণকে নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সম্মান ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোরআন সাহাবিদেরকে তার আওয়াজের ওপর নিজেদের আওয়াজ উঁচু করতে নিষেধ করেছে। তাকে ডাকার ক্ষেত্রেও সাধারণ ডাকাডাকির মত ডাকতে নিষেধ করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে—রাসুল একজন মুমিনের কাছে তার নিজের জান, পরিবার ও সকল মানুষের চেয়েও বেশি প্রিয় না হলে তার ইমান পূর্ণ হয় না। (সহিহ বুখারি: ১৫, সহিহ মুসলিম: ৪৩) বাস্তবতাও তাই—এই উম্মতের হৃদয়ে নবীর প্রতি যে ভালোবাসা সঞ্চারিত হয়েছে, তার তুলনা ইতিহাসে বিরল।

কিন্তু এই ভালোবাসা কেবল আবেগের বিষয় নয়; বরং জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কেউ যত বেশি নবীজির জীবন, চরিত্র, ত্যাগ ও মহত্ত্ব সম্পর্কে জানে, তার হৃদয়ে তত বেশি সম্মান ও ভালোবাসা জন্ম নেয়। এজন্যই সিরাত অধ্যয়ন জরুরি।

ইসলামের সকল বিশ্বাস ও বিধান মূলত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তি ও জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোরআন তার ওপর নাজিল হয়েছে, আর সুন্নাহ তার কথাবার্তা ও কর্মের নাম। তাই ইসলামের শত্রুরা বরাবরই নবীজির ব্যক্তিত্ব ও জীবনচরিতকে আঘাত করার চেষ্টা করেছে। প্রাচ্যবিদরা ইংরেজি ও ইউরোপীয় ভাষায় অসংখ্য বিভ্রান্তিকর রচনা প্রকাশ করেছে, যা আধুনিক শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও সংশয় সৃষ্টি করে। অথচ এসব লেখার বেশির ভাগই পক্ষপাতদুষ্ট, দুর্বল ও বিশ্বাসযোগ্য উৎসবিহীন।

এই প্রেক্ষাপটে নবীজির সিরাত অধ্যয়ন শুধু ইবাদত নয়, বরং ইমান রক্ষার ঢাল। ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মোকাবেলা, হৃদয়ে প্রকৃত ভালোবাসা জাগ্রত করা এবং জীবনকে নববি আদর্শে পরিচালিত করার জন্য সিরাত অধ্যয়ন সময়ের অনিবার্য দাবি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য নির্ভরযোগ্য সিরাতগ্রন্থ পাঠ অত্যন্ত জরুরি।

তবে প্রশ্ন আসে—সিরাত কীভাবে পড়বো? ফলপ্রসূ সিরাত অধ্যয়নের জন্য শুধু নবীজির গুণাবলি ও মর্যাদা জানা যথেষ্ট নয়। সিরাতকে আমাদের আমলি জীবনের আয়না হিসেবে দেখতে হবে। ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রনীতি, দাওয়াতি কৌশল, বিরোধীদের সঙ্গে আচরণ—সব ক্ষেত্রেই নবীজির কর্মপদ্ধতি আমাদের পথনির্দেশক হওয়া উচিত। মক্কার দুর্বলতার সময় কীভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হয়, মদিনায় রাষ্ট্রগঠনের পর কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়, হুদায়বিয়ার মতো সন্ধি কখন প্রয়োজন আর কখন সাহসী পদক্ষেপ—এসব প্রশ্নের উত্তর সিরাতেই নিহিত।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমরা অনেক সময় জাতীয় ও সামষ্টিক সমস্যায় কেবল বৈষয়িক লাভ-ক্ষতির হিসাব করি। অথচ একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিত ছিল প্রতিটি সিদ্ধান্তে নববি আদর্শের আলো খোঁজা। এখানেই নিহিত রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের প্রকৃত সফলতা।

সিরাতে মুহাম্মাদি অধ্যয়ন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি ইমান, ভালোবাসা, অনুসরণ ও আত্মগঠনের অপরিহার্য মাধ্যম। নবীজির জীবন যত গভীরভাবে আমরা জানবো, ততই আমাদের জীবন আলোকিত হবে, চরিত্র হবে পরিশুদ্ধ এবং পথচলা হবে সুদৃঢ় ও সঠিক।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।