রহমতে যার দুনিয়া উজালা 

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৩৬ পিএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রহমতে যার দুনিয়া উজালা ছবি: ফ্রিপিক

আহমাদ সাব্বির

পবিত্র কোরআনে নবী মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যেসব গুণাবলি তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক, গভীর ও সর্বজনীন গুণ হলো—তিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমতআল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘আর আমি আপনাকে জগতসমূহের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭) এই ঘোষণা কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ভূখণ্ড বা সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা স্থান, কাল ও জাতিগত সীমানা অতিক্রম করে কেয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতিকে অন্তর্ভুক্ত করে। ইতিহাসে এমন সর্বব্যাপী ও বাস্তবভিত্তিক দাবি আর কোনো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নবীজির (সা.) রহমত কেবল আধ্যাত্মিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের চিন্তা, সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও দৈনন্দিন জীবনব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত।

এই রহমতের প্রথম ও মৌলিক দিক হলো তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষাআল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করা বাহ্যত সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি মানব ইতিহাসের এক মহাবিপ্লব। তাওহিদ মানুষের চিন্তা থেকে কুফরি, নাস্তিকতা, শিরক ও সৃষ্টিপূজার শেকড় উপড়ে ফেলে। আল্লাহকে অস্বীকার করলে মানুষ দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে, জবাবদিহিতার ভয় হারায় এবং দুনিয়াকে নিছক ভোগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। তখন সে স্রষ্টার দাসত্ব ত্যাগ করে প্রবৃত্তি ও বস্তুবাদের দাসে পরিণত হয়।

শিরক মানব মর্যাদার জন্য অপমানজনক। এতে মানুষ সৃষ্টির সামনে মাথানত করে, তুচ্ছ বস্তু ও ব্যক্তির কাছে লাভ-ক্ষতির আশা রাখে। ফলে তার অন্তরে ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক দাসত্ব বাসা বাঁধে। বিপরীতে তাওহিদ মানুষকে ঘোষণা করতে শেখায়—আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা নত হবে না। এই বিশ্বাসই মানুষের প্রকৃত সম্মান ও আভিজাত্যের ভিত্তি। কোরআনে ফেরেশতাদের দ্বারা আদমকে সিজদা করানো মানুষের এই মর্যাদারই প্রতীক। তাওহিদ বিশ্বাস মানুষকে আল্লাহভীতি ও আল্লাহপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে এবং তাকে সচেতন করে তোলে যে, দুনিয়া পরীক্ষাকেন্দ্র—এখানে প্রতিটি পদক্ষেপ হিসাবের আওতাভুক্ত। এভাবে তাওহিদ মানবজাতির জন্য এক অতুলনীয় রহমত, যা পূর্ণতা লাভ করেছে নবীজি (সা.)–এর মাধ্যমে।

যদিও নবী মুহাম্মাদের (সা.) আগেও বহু নবী তাওহিদের আহ্বান জানিয়েছেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—মানবসমাজে শিরকই ছিল প্রবল। এমন কি যেসব ধর্ম একেশ্বরবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, কালক্রমে সেগুলোও শিরকের আবরণে ঢেকে যায়। ইহুদিদের একাংশ উজাইরকে (আ.) আল্লাহর পুত্র বানিয়েছে, খ্রিস্টানরা ঈসাকে (আ.) ঈশ্বরের আসনে বসিয়েছে, হিন্দুধর্মে একেশ্বরবাদের চিহ্ন থাকলেও অসংখ্য দেবতার উপাসনা গড়ে উঠেছে, বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বর অস্বীকার করা হলেও বুদ্ধের উপাসনা শুরু হয়েছে। কিন্তু নবী মুহাম্মাদ (সা.) এমনভাবে তাওহিদের ভিত্তি স্থাপন করেছেন, যা কেয়ামত পর্যন্ত অটুট থাকবে এবং এমন কি শিরকভিত্তিক ধর্মগুলোর মধ্যেও তাওহিদমুখী চিন্তার স্রোত তৈরি করেছে।

নবীজির (সা.) রহমতের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের ঐক্য ও সাম্যের ধারণাতার আগমনের পূর্বে প্রায় সব সভ্যতা ও ধর্মে মানুষে মানুষে জন্মগত বৈষম্য বিদ্যমান ছিল। কোথাও বংশের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব, কোথাও জাতিগত বিভাজন, কোথাও বর্ণপ্রথার নির্মম শৃঙ্খল। ইহুদিরা বনি ইসরাইল ও অ-বনি ইসরাইলের মধ্যে পার্থক্য করতো, ইরানিরা রাজবংশকে খোদার নিকটতম ভাবতো, আর ভারতে বর্ণপ্রথা মানুষকে জন্মসূত্রে দাসে পরিণত করেছিল। শূদ্ররা শিক্ষা, সম্মান ও মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

নবী মুহাম্মাদ (সা.) এই সমস্ত বিভেদ ভেঙে ঘোষণা করেন, কোনো আরবের ওপর অনারবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের, কোনো বংশ বা রঙের ভিত্তিতে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া ও নেক আমল। এই ঘোষণা সমাজে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। আরবের অভিজাত ও হাবশার ক্রীতদাস একই কাতারে দাঁড়ায়, বেলাল ও সুহাইবের (রা.) মতো অনারব সাহাবিরা সমাজের নেতৃত্বে আসেন। ইসলামের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যের শিকল ভাঙতে থাকে এবং নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠী মুক্তির স্বাদ পেতে শুরু করে। এমনকি যেখানে নিপীড়ন টিকে ছিল, সেখানেও তা নিন্দিত ও ঘৃণিত হয়ে ওঠে। এভাবেই মানব ঐক্যের ধারণা মানব ইতিহাসে এক অনিবার্য সত্যে পরিণত হয়।

এই সাম্যের প্রভাব পড়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে—পেশা, শিক্ষা, বিচার ও সামাজিক মর্যাদায়। সব পেশা সম্মানজনক হয়ে ওঠে, জ্ঞানার্জনের অধিকার সবার জন্য উন্মুক্ত হয়, অপরাধ ও শাস্তির ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রব্যবস্থায়। ইসলামের পূর্বে বিশ্ব রাজতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের অধীনে ছিল। গ্রিসের গণতন্ত্রও ছিল সীমিত ও অভিজাতকেন্দ্রিক। ইসলাম বংশানুক্রমিক ক্ষমতার ধারণা ভেঙে শূরা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে নেতৃত্বের ধারণা উপস্থাপন করে। আধুনিক গণতন্ত্র—নিজের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও—মূলত এই ইসলামি সাম্যনীতিরই ধারাবাহিক রূপ। আজ রাজতন্ত্র প্রায় বিলুপ্ত বা প্রতীকী হয়ে পড়েছে—এটিও নবীজির (সা.) আদর্শের সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

নবীজির (সা.) রহমতের তৃতীয় দিক হলো জ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি অসামান্য উৎসাহ নিজে উম্মী হওয়া সত্ত্বেও তিনি জ্ঞানার্জনকে ফরজের মর্যাদা দিয়েছেন। উপকারী যে কোনো জ্ঞান অর্জন করতে তিনি নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন—যেখানেই জ্ঞান পাওয়া যায়, সেখান থেকেই তা গ্রহণ করতে হবে। বদর যুদ্ধের বন্দিদের মুক্তিপণ হিসেবে শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা, ইহুদিদের শিক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন—সবই তার উদারতার প্রমাণ।

এর ফলে সমাজে শুধু শিক্ষার প্রসার ঘটেনি; বরং বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। তাওহিদে বিশ্বাস সৃষ্টিকে স্রষ্টার আসন থেকে নামিয়ে এনে মহাবিশ্বকে গবেষণার ক্ষেত্র বানিয়েছে। কুসংস্কার, অশুভ লক্ষণ ইত্যাদি বিশ্বাস ভেঙে পড়েছে। নবীজি (সা.) ঘোষণা করেছেন, লাভ-ক্ষতি কোনো প্রাণী, দিন বা মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছাধীন। এর মাধ্যমে মানবজাতি কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞান ও যুক্তির পথে অগ্রসর হয়েছে।

আরও একটি বড় রহমত হলো দ্বীন ও দুনিয়ার কৃত্রিম বিভাজন দূর করাপূর্ববর্তী ধর্মগুলো বৈরাগ্য, সন্ন্যাস ও সংসারবিমুখতাকে ইবাদত মনে করতো। বিবাহ, পরিশ্রম, পরিচ্ছন্নতা পর্যন্ত পাপ ভাবা হতো। নবী মুহাম্মাদ (সা.) এই ধারণা ভেঙে ঘোষণা করেন—হালাল উপায়ে দুনিয়াবি কাজ করাও ইবাদতের অংশ। বিবাহ তার সুন্নত, জীবিকা অর্জন দায়িত্ব, পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। ইসলাম এমন কোনো বিধান দেয়নি, যা মানবপ্রকৃতির বিরুদ্ধে যায়; বরং প্রকৃতির সকল চাহিদাকে ভারসাম্যের সঙ্গে বৈধতা দিয়েছে।

সব মিলিয়ে নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মানব ইতিহাসে এক অনন্য রহমত। তাঁর মাধ্যমে মানুষ ফিরে পেয়েছে মর্যাদা, ন্যায়, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব। বিভেদ ও কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে গেছে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পথ প্রশস্ত হয়েছে। তিনি মানুষকে দিয়েছেন মধ্যপন্থী, ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রকৃতিবান্ধব জীবনব্যবস্থা—যা মানুষের আত্মিক ও পার্থিব সব চাহিদা পূরণে সক্ষম। তাই কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করবে—তিনি সত্যিই ‘জগতসমূহের জন্য রহমত’।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।