রোজার যত্ন নেবেন যেভাবে
আহমাদ সাব্বির
রোজা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এটি শুধু শরীরের অনাহার বা তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; বরং এটি আত্মসংযম, নফস দমন এবং আত্মার পরিশুদ্ধির এক মহাসাধনা। রোজা রাখা খুবই কঠিন—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ, এটি মানুষের অন্তর্নিহিত কুপ্রবৃত্তি, প্রবল কামনা-বাসনা এবং দেহগত চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণে আনে। মানুষের স্বভাবই হলো—সে তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণ করতে চায়। সামান্য ক্ষুধা লাগলেই বিরক্তি আসে, খেতে দেরি হলে মেজাজ বিগড়ে যায়, মাথা ভারী লাগে। অথচ একজন রোজাদার সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিজেকে সংযত রাখে—খাবার, পানীয়, এমনকি বৈধ দাম্পত্য চাহিদা থেকেও বিরত থাকে। এটি নিছক অনাহার নয়; এটি আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ।
রোজার কঠোরতা যেমন বাস্তব, তেমনি এর প্রতিদানও অতুলনীয়। ইসলামে আমলের মূল্য নির্ধারিত হয় তার আন্তরিকতা, কষ্ট ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর। সাধারণ নিয়মে একটি নেক আমলের সাওয়াব দশগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রোজার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বিশেষ ঘোষণা দিয়েছেন—রোজা একান্তই তাঁর জন্য, আর তিনি নিজেই এর প্রতিদান দেবেন। এর অর্থ হলো, রোজার সাওয়াব সীমাহীন। মানুষ যতটা কষ্ট সহ্য করে, যতটা আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করে, তার প্রতিদান ততটাই মহিমান্বিত হয়।
হাদিসে রোজাকে `ঢাল’ বলা হয়েছে। ঢাল যেমন যুদ্ধে আঘাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি রোজা মানুষকে গুনাহ থেকে রক্ষা করে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে যখন নফস দুর্বল হয়, তখন পাপের প্রতি আকর্ষণ কমে আসে। রোজা মানুষকে অশ্লীলতা, মিথ্যা, গিবত ও অন্যায় আচরণ থেকে দূরে রাখে। এ কারণেই নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুবকদের জন্য রোজাকে এক প্রকার ঔষধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—বিশেষত যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে না। রোজা তাদের কামপ্রবৃত্তিকে সংযত রাখতে সহায়তা করে।
রোজার মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে, রোজাদারের মুখে অনাহারের কারণে তৈরি হওয়া গন্ধ—যা দুনিয়ার দৃষ্টিতে অস্বস্তিকর—আল্লাহর কাছে মৃগনাভির সুগন্ধের চেয়েও প্রিয়। এখানে মূলত রোজাদারের ত্যাগ ও আন্তরিকতাকেই মূল্যায়ন করা হয়েছে। মানুষ যখন একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করে, তখন সেই ত্যাগই তার সম্মানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রোজাদারের মুখের গন্ধ আসলে তার আত্মনিবেদনের প্রতীক।
রোজাদারের জন্য রয়েছে দুটি আনন্দ—একটি ইফতারের সময়, অন্যটি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময়। ইফতারের আনন্দ তাৎক্ষণিক; সারাদিনের কষ্টের পর যখন সে পানি পান করে, খাবার গ্রহণ করে, তখন সে এক প্রশান্তি অনুভব করে। কিন্তু দ্বিতীয় আনন্দটি চিরন্তন—যে দিন সে তার রবের সামনে উপস্থিত হবে এবং রোজার প্রতিদান লাভ করবে। সেদিনের আনন্দ দুনিয়ার সব সুখকে ছাড়িয়ে যাবে।
এত মর্যাদা ও প্রতিদানের পরও যদি কেউ রোজাকে যথাযথভাবে হেফাজত না করে, তবে তা চরম বোকামি। রোজা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; এটি চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্তরের রোজাও। কেউ যদি সারাদিন রোজা রেখে মিথ্যা বলে, গিবত করে, অশ্লীলতা ছড়ায়, অন্যকে কষ্ট দেয়, তবে সে তার রোজার সাওয়াব নষ্ট করে ফেলে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন, তোমরা সে নারীর মতো হয়ো না, যে সুতা মজবুত করে পাকানোর পর তা খুলে নষ্ট করে দেয়। (সুরা নাহল: ৯২) এই উপমা দ্বারা বোঝানো হয়েছে, মানুষ যেন কষ্ট করে আমল করার পর তা নিজের অসতর্কতার কারণে বরবাদ না করে।
নেক আমল নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে কোরআনে একাধিক সতর্কবাণী এসেছে। দানের পর খোঁটা দেওয়া বা কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে দান বরবাদ হয়ে যায়। একইভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের পর অবাধ্যতা দ্বারা আমল নষ্ট হয়। এই বিধান শুধু দানের ক্ষেত্রে নয়; নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত—সব ইবাদতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। রোজা রাখার পর যদি কেউ পাপাচারে লিপ্ত হয়, তবে তার কষ্ট বৃথা যেতে পারে।
রোজা মানুষকে আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। এটি এক মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, যেখানে মানুষ শেখে—কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ক্ষুধা সহ্য করা শুধু দারিদ্র্যের অনুভূতি দেয় না; এটি মানুষের হৃদয়ে সহানুভূতি জাগ্রত করে। একজন রোজাদার যখন ক্ষুধা অনুভব করে, তখন সে দরিদ্র মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। ফলে তার অন্তরে দানশীলতা ও মানবিকতা বৃদ্ধি পায়।
রমজান মূলত আত্মগঠনের মাস। এই মাসে একজন মুমিন তার মন্দ অভ্যাসগুলো ত্যাগের চেষ্টা করে। ধূমপান, গিবত, অশ্লীল ভাষা, রাগ—এসব থেকে দূরে থাকার অনুশীলন করে। যদি সে সত্যিকার অর্থে রোজার হক আদায় করতে পারে, তবে তার চরিত্রে স্থায়ী পরিবর্তন আসে। রোজা তার কলুষিত আত্মাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়, অহংকারকে দমন করে, বিনয় শেখায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেকে রোজার বাহ্যিক রূপ রক্ষা করলেও তার অন্তর্নিহিত শিক্ষা গ্রহণ করে না। তারা ক্ষুধার্ত থাকে, কিন্তু জিহ্বাকে সংযত রাখে না; তারা পানাহার ত্যাগ করে, কিন্তু অন্যের সম্মানহানি করে। এ ধরনের রোজা কেবল শারীরিক কষ্টে সীমাবদ্ধ থাকে। প্রকৃত রোজা সেই রোজা, যা মানুষের চরিত্রকে শুদ্ধ করে, অন্তরকে আলোকিত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য বৃদ্ধি করে।
রোজা আমাদের শেখায়, আত্মনিয়ন্ত্রণই প্রকৃত স্বাধীনতা। যে ব্যক্তি নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়। রোজা সেই নিয়ন্ত্রণের চর্চা। সারাদিনের সংযম মানুষকে শক্তিশালী করে তোলে। সে উপলব্ধি করে, আমি চাইলে নিজেকে দমন করতে পারি। এই উপলব্ধি তাকে অন্যায় থেকে দূরে থাকার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
ওএফএফ