রোজা আমাদের যে পয়গাম দেয়

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৪ এএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রোজা আমাদের যে পয়গাম দেয় ছবি: ফ্রিপিক

মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান

রোজা এমন এক ইবাদত, যার সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে রোজাদারের নিজের সাথে। কারণ রোজাদার নিজেই নিজেকে কষ্টের মধ্যে প্রবেশ করায়। সে নিজ ইচ্ছায় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে। এ দিক থেকে রোজা একান্ত ব্যক্তিগত আমল। আর ঠিক এই কারণেই রোজা ধর্মচর্চার প্রথম মূলনীতি মনে করিয়ে দেয়—দ্বীন পালনের শুরু অন্যকে পরিবর্তন হওয়ার উপদেশ দিয়ে নয়, বরং নিজেকে বদলানো দিয়ে।

রোজার মাধ্যমে এই সত্য সবচেয়ে প্রকটভাবে প্রকাশ পায় যে, দ্বীন পালন একটি ব্যক্তিগত বিষয়। বাহ্যিকভাবে রোজা ব্যক্তিগত ইবাদত হলেও প্রতীকী অর্থে এটি সামগ্রিক ধর্মীয় জীবনের পরিচয় বহন করে। প্রকৃত রোজাদার তিনিই, যিনি রোজা রেখে রোজার এই অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করতে পারেন।

রোজার সূচনা হয় রমজানের চাঁদ দেখার মাধ্যমে। মানুষ যখন আকাশে রমজানের বাঁকা চাঁদ দেখে, তখন তার মনে হয় স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন যেন আসমানি ইশারার ভাষায় তাকে ডাকছেন, তাকে বলছেন, হে আমার বান্দা, তুমি নিজেকে আমার আনুগত্যে সোপর্দ করো। আমি তোমার আমলকে বৃদ্ধি দেব, যতক্ষণ না তা ক্ষুদ্র চাঁদ থেকে পূর্ণিমার চাঁদের মতো পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এরপর যখন রমজানের প্রথম দিনে মানুষ খাদ্য ও পানি ত্যাগ করে, তখন সে যেন নীরব ভাষায় ঘোষণা করে, হে আল্লাহ, আমি আপনার হুকুমের তাবেদার, যদিও আমি আপনাকে চোখে দেখিনি। আমি নিজেকে আপনার ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করছি, যদিও আপনার আদেশ কেবল কিতাবের শব্দের মাধ্যমেই জেনেছি। আমাকে বাধ্য করার জন্য কোনো ফেরেশতা উপস্থিত না থাকলেও আমি আপনার হুকুম মানছি।

তারপর সারাদিন ক্ষুধা তাকে কষ্ট দেয়, তৃষ্ণা তাকে পীড়া দেয়। তবু সে খাবার ও পানীয় স্পর্শ করে না। নিত্যজীবনের অভ্যাস ভেঙে যায়, কিন্তু তার মুখে অভিযোগ আসে না। এভাবে সে প্রমাণ করে—আমি আল্লাহর ধৈর্যশীল বান্দা হতে চাই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি আল্লাহর নির্দেশ মান্য করব, যদিও তা ধৈর্যের চূড়ান্ত সীমা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

সাধারণ দিনে প্রত্যেক মুসলমানকে হারাম জিনিস থেকে বিরত থাকতে হয়। কিন্তু রোজার দিনে সে হালাল জিনিস থেকেও বিরত থাকে। এটি আসলে আল্লাহর আনুগত্যের অনুভূতিকে আরও দৃঢ় করে।

এর আগে তার অবস্থা ছিল—তৃষ্ণা লাগলে পানি পান করত, ক্ষুধা লাগলে খাবার খেত। কিন্তু রোজা রাখার পর একই মানুষ এমন অবস্থায় পৌঁছে যে তৃষ্ণার্ত হয়েও পানি পান করে না, ক্ষুধার্ত হয়েও খাদ্য মুখে নেয় না। এভাবেই রমজান তাকে প্রশিক্ষণ দেয়—সে নিজের জীবন একটি দৃঢ় নীতির অধীনে পরিচালিত করবে; আর সেই নীতি হবে আল্লাহ রব্বুল আলামিন নির্ধারিত চিরন্তন বিধান।

রোজাদার কষ্ট সহ্য করতে করতে, আল্লাহকে স্মরণ করতে করতে সারাদিন কাটায়। অবশেষে মাগরিবের ওয়াক্ত হয়। সূর্য অস্ত গিয়ে আসমানি ভাষায় ঘোষণা করে, হে আল্লাহর বান্দাগণ, তোমরা তোমাদের ওয়াদা পূর্ণ করেছ। এখন সেই সময় এসেছে, যখন আল্লাহ তার ওয়াদা পূর্ণ করবেন।

এখন তোমাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলো। এখন তোমরা আজাদ, তোমরা স্বাধীন। এখন আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত থেকে খাও ও পান করো। এখন খাদ্য গ্রহণে বা পান করায় কোনো বাধা নেই। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে করতে তার রিজিক উপভোগ করো।

রোজার পর ইফতারের এই অভিজ্ঞতা মুমিনের জন্য আরেকটি সুসংবাদ বহন করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, এই ইফতার আসলে আরও বৃহৎ এক ইফতারের প্রতীক। রোজা যেন মানুষকে ইঙ্গিত দেয়, সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দের দিন সামনে অপেক্ষা করছে, আখেরাতে; যখন আল্লাহ প্রকাশ্যে তার বান্দার ইবাদত কবুল হওয়ার ঘোষণা দেবেন এবং তাকে জান্নাতের চিরস্থায়ী উদ্যানসমূহে প্রবেশ করাবেন, যেখানে আর কোনো কষ্ট থাকবে না, কোনো ক্লান্তি থাকবে না।

তর্জমা: মওলবি আশরাফ

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।