জালালুদ্দীন সুয়ুতী: ইসলামি জ্ঞান-ঐতিহ্যের এক অনির্বাণ দীপশিখা

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৫৭ পিএম, ২৮ মার্চ ২০২৬
জালালুদ্দীন সুয়ুতী: ইসলামি জ্ঞান-ঐতিহ্যের এক অনির্বাণ দীপশিখা ছবি: ফ্রিপিক

আহমাদ সাব্বির

মিসরের মামলুক শাসনামলের জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসে যেসব মনীষী অসামান্য কৃতিত্ব ও প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাদের মধ্যে জালালুদ্দীন সুয়ুতীর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়। তিনি শুধু একজন ঐতিহাসিক বা ধর্মতাত্ত্বিক নন, বরং কোরআন, হাদীস, ফিকহ, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্য—জ্ঞানচর্চার প্রায় সব শাখায় তার ছিলো বিস্ময়কর বিচরণ। পঞ্চদশ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বে জ্ঞান, চিন্তা ও সাধনার যে দীপ্তিমান ধারা প্রবাহিত হয়েছিল, জালালউদ্দীন সুয়ুতী ছিলেন তার অন্যতম প্রধান কান্ডারি। তার বহুমুখী প্রতিভা, অপরিসীম কর্মশক্তি ও জনকল্যাণমুখী লেখনী তাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে মিসরের অন্তর্গত সয়ুত নামক অঞ্চলে জালালুদ্দীন সুয়ুতীর জন্ম। জন্মভূমির নামানুসারেই তিনি ‘সুয়ুতী’ নিসবত গ্রহণ করেন। তার শৈশব জীবন যদিও পিতৃহীন অবস্থায় শুরু হয়—কারণ অতি অল্প বয়সেই তিনি পিতাকে হারান—তবু তার শিক্ষা-দীক্ষার পথে কোনো বড় বাধা সৃষ্টি হয়নি। পরিবার ছিলো সচ্ছল, আর তার চেয়েও বড় কথা—তিনি জন্মসূত্রেই ছিলেন অসাধারণ স্মরণশক্তি ও প্রখর মেধার অধিকারী। মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি সম্পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করে হাফেজে কোরআনের মর্যাদা অর্জন করেন, যা তার ভবিষ্যৎ জ্ঞানজীবনের সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করে।

জালালুদ্দীনের জীবনে তার মায়ের ভূমিকা ছিলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী নারী, যিনি পুত্রের প্রতিভা উপলব্ধি করে তৎকালীন মিসরের প্রায় সকল খ্যাতিমান আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিকট তার শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জালালুদ্দীন কেবল ধর্মীয় বিদ্যায় নয়, বরং ইতিহাস, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব, অলঙ্কারশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়েও অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও ইলমুল কালামের মত গভীর শাস্ত্রে তার দখল ছিলো ঈর্ষণীয়। এই বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চাই তাকে সমসাময়িক অন্যান্য আলেমদের থেকে স্বতন্ত্র ও শ্রেষ্ঠ করে তোলে।

শিক্ষাজীবন সমাপ্ত হওয়ার পর জালালুদ্দীন সুয়ুতী কায়রোর বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হন। তার জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও গভীরতা এমন ছিলো যে, প্রায় প্রত্যেক বিষয়েই তিনি প্রধান অধ্যাপকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। সারাজীবন তিনি অধ্যাপনা ও গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন প্রেরণার উৎস, আর বিদ্বৎসমাজের কাছে এক জীবন্ত বিশ্বকোষ। তার বক্তৃতা ও পাঠদান ছিলো প্রাঞ্জল, সুসংহত ও যুক্তিনিষ্ঠ, যা শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করত।

তবে জ্ঞানী মানুষের জীবন অনেক সময়ই মসৃণ হয় না। ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে শত্রুপক্ষের চক্রান্তে জালালউদ্দীন সুয়ুতী। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ তোলা হয় তার বিরুদ্ধে। এই অপবাদে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন। আত্মসম্মানবোধ ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং জাগতিক কর্মজীবন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। এরপর তিনি নীল নদের তীরে অবস্থিত রাওদা দ্বীপে নির্জনবাস গ্রহণ করেন। এখানেই তিনি জীবনের শেষ চারটি বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্ঞানচর্চা, লেখালেখি ও আল্লাহর ইবাদতে অতিবাহিত করেন। ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে এই নির্জন সাধনাস্থলেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

জালালউদ্দীন সুয়ুতীর প্রকৃত মহিমা প্রকাশ পায় তার বিপুল গবেষণা ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে। তিনি আজীবন অবিরাম কলম চালিয়েছেন এবং জ্ঞানের বিস্তৃত প্রান্তরে একের পর এক অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা পাচশতেরও অধিক। বিষয়বৈচিত্র্যের দিক থেকেও তিনি ছিলেন অনন্য—কোরআন বিষয়ক গবেষণা থেকে শুরু করে হাদিস সংকলন, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, দর্শন, অলঙ্কারশাস্ত্র ও সমাজচিন্তা—সব ক্ষেত্রেই তার অবদান স্মরণীয়।

সুয়ুতীর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল জনমুখিতা। তিনি সাধারণ মানুষের চাহিদা ও বোধগম্যতার দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতেন। তার ভাষা ছিল সহজ, সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী। ফলে তার রচনাবলী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ছোট ছোট পুস্তিকা ও সংক্ষিপ্ত গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি জটিল ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন। আজও সারা পৃথিবীতে তার রচনাগুলো গভীর আগ্রহ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পঠিত হয়।

মুসলিম তাহযীব ও তমদ্দুনকে বিজ্ঞানসম্মত ও প্রামাণ্য উপায়ে জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে জালালউদ্দীন সুয়ুতীর লেখনী ছিলো সর্বাধিক কার্যকর। তিনি ধর্মকে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার স্তরে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আচার-আচরণ ও নৈতিক উন্নতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই কারণেই তার অবদান শুধু বিদ্বৎসমাজে নয়, গণমানুষের জীবনেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।

সুয়ুতীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় হলো—

  • আল-ইতকান ফি উলুমিল কোরআন; যা উলুমুল কোরআনের এক অমূল্য বিশ্বকোষ।
  • তাফসীরুল জালালাইন; যা জালালউদ্দীন মহাল্লীর অসমাপ্ত কাজকে সম্পূর্ণ করে যুগযুগান্তরের জন্য এক অনন্য তফসীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
  • মুজহির ফি উলুমিল লুগাহ; যা ভাষাতত্ত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
  • হুসনুল মুহাদারাহ ফি আখবারি মিসর ওয়াল কাহেরাহ; যেখানে মিসরের ইতিহাস সুসংহতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
  •  তারিখুল খুলাফা; যা খিলাফতের ইতিহাসে এক নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।

এই গ্রন্থগুলোয় সুয়ুতীর সাহিত্যিক দক্ষতা, বর্ণনাশৈলীর সৌন্দর্য ও ভাষার প্রাঞ্জলতা পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এগুলো শুধু তথ্যবহুল নয়, বরং পাঠককে আকৃষ্ট করার মতো মনোজ্ঞ রচনাশৈলীতে সমৃদ্ধ। এই গ্রন্থগুলো যুগ যুগ ধরে কালের খাতায় জালালউদ্দীন সুয়ুতীর অমর স্বাক্ষর হিসেবে জাগরূক থাকবে।

জালালুদ্দীন সুয়ুতী ছিলেন একাধারে আলেম, ঐতিহাসিক, ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও চিন্তানায়ক। তার জীবন ছিলো জ্ঞান ও সাধনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও জনকল্যাণের ব্রত গ্রহণ করলে একজন মানুষ কীভাবে ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন লাভ করতে পারেন। এই কারণেই জালালউদ্দীন সুয়ুতী শুধু তার সময়ের নন—তিনি চিরকালের জন্য মুসলিম জ্ঞান-ঐতিহ্যের এক অনির্বাণ দীপশিখা।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।