ইমাম আবু হানিফার (রহ.) জীবন, চিন্তা ও কর্মের ঐতিহাসিক ভূমিকা

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩১ পিএম, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬
ইমাম আবু হানিফার (রহ.) জীবন, চিন্তা ও কর্মের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছবি: ফ্রিপিক

আহমাদ সাব্বির

ইসলামের ইতিহাসে যারা কেবল একজন আলেম নন, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ চিন্তাধারা ও আইনতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের জন্মদাতা—ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি ছিলেন ইসলামের চার মহান ইমামের অন্যতম এবং হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা। তার জীবনকাল (৬৯৯–৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ) মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। উমাইয়া শাসনের অবসান এবং আব্বাসী খিলাফতের উত্থান—এই দুই যুগের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি কেবল ধর্মীয় নেতৃত্বই দেননি, বরং স্বাধীন চিন্তা, ন্যায়বোধ ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন ৮০ হিজরীতে (৬৯৯ খ্রিস্টাব্দ), ইরাকের বসরা নগরে। তার পিতামহ ছিলেন একজন ইরানি ক্রীতদাস এবং পিতা ছিলেন একজন সৎ, ধর্মভীরু ব্যবসায়ী। পিতার দূরদর্শিতার কারণে আবু হানিফা ব্যবসার পথে না গিয়ে জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগের সুযোগ পান। অল্প বয়সেই তিনি কোরআন মুখস্থ করে হাফেজে কোরআনের মর্যাদা লাভ করেন। আরবি ভাষা ও সাহিত্যে তার অসাধারণ দখল ছিল এবং ধর্মতত্ত্ব ও ব্যবহারশাস্ত্রের প্রতি তার আগ্রহ ক্রমশ গভীরতর হয়।

ইমাম আবু হানিফার (রহ.) শিক্ষাজীবন ছিল বহুমাত্রিক। তিনি কাতাদাহ, আল-আ’মাশ প্রমুখ বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের নিকট হাদিস শিক্ষা লাভ করেন। তবে তার চিন্তাজগৎ সবচেয়ে গভীরভাবে প্রভাবিত হয় ইমাম জাফর আস-সাদিক ও হাম্মাদ ইবনে সুলায়মানের সংস্পর্শে। ইমাম জাফর আস-সাদিক ছিলেন মহানবীর (সা.) বংশধর এবং শিয়া মতবাদের অন্যতম ভিত্তিস্থাপক—যার জ্ঞান ও ধর্মভীরুতায় সুন্নি-শিয়া নির্বিশেষে সকলেই মুগ্ধ ছিলেন। সমবয়সী হওয়া সত্ত্বেও আবু হানিফা তার কাছে বিনয়ভরে জ্ঞান আহরণ করেন। অন্যদিকে হাম্মাদ ছিলেন সে যুগের শ্রেষ্ঠ আইনজ্ঞদের একজন। এই দুই মহাপুরুষের প্রভাবে আবু হানিফার মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যুক্তিবাদী মনন ও বাস্তবমুখী আইনচিন্তা।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই আবু হানিফা (রহ.) ইসলামি ব্যবহারশাস্ত্র বা ফিকহের দিকে বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়েন। তিনি অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ) অপেক্ষা যুক্তি, বিচার ও বিবেকনির্ভর সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেন। ইজতিহাদ—অর্থাৎ কোরআন, হাদিস ও বাস্তবতার আলোকে নতুন সমস্যার সমাধান—তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন খ্যাতিমান আলেম ও বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কুফায় তার দরসে দলে দলে মানুষ সমবেত হতো। তার শিক্ষাপদ্ধতি ছিল প্রশ্নোত্তর ও বিশ্লেষণভিত্তিক, যা শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করত।

তার অসংখ্য শিষ্যের মধ্যে আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ ইবনে হাসান আশ-শায়বানী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে এই দুই শিষ্যই হানাফি মাজহাবকে সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। মূলত তাদের হাত ধরেই হানাফি ফিকহ একটি সুসংবদ্ধ আইনব্যবস্থায় পরিণত হয়।

ব্যক্তিজীবনে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত সংযমী ও সংসারনির্লিপ্ত। ধন-সম্পদ, খ্যাতি বা ক্ষমতার প্রতি তার কোনো মোহ ছিল না। শাসকগোষ্ঠীর অনুগ্রহ লাভ বা দরবারকেন্দ্রিক আলেম হওয়ার প্রবণতা তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এই নৈতিক দৃঢ়তাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।

কুফার শাসক ইবনে হুবায়রা তাকে কাজীর পদ গ্রহণে বাধ্য করতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, অন্যায় ও জুলুমের আশঙ্কা থাকা অবস্থায় এমন পদ গ্রহণ করা আত্মমর্যাদাবিরোধী। এই প্রত্যাখ্যানের শাস্তি হিসেবে তাকে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করা হয়। পরবর্তীতে আব্বাসী খলিফা আল-মনসুরের আমলেও শাসকদের অন্যায় হত্যাকাণ্ড ও স্বৈরাচারী নীতির প্রকাশ্য সমালোচনার কারণে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। বহু ঐতিহাসিকের মতে, কারাগারেই তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। ১৫০ হিজরীতে (৭৬৭ খ্রিস্টাব্দ) এই মহান মনীষীর ইন্তেকাল ঘটে—ধর্মভীরুতা, সাহস ও আত্মসম্মানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

তার মৃত্যুর পর জনসাধারণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার যে বিস্ময়কর প্রকাশ ঘটে, তা তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ। প্রায় দশ দিন ধরে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সবচেয়ে বড় অবদান হলো মুসলিম জুরিসপ্রুডেন্স বা আইনতত্ত্বের সুসংহত রূপদানতার চিন্তাধারার কেন্দ্রে ছিল কুরআন ও সহিহ হাদিস। এর পরেই তিনি স্থান দেন ইজমা (সম্মিলিত মত) ও কিয়াস (যুক্তিনির্ভর তুলনা)। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো—তিনি ইজমাকে কেবল সাহাবিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সকল যুগের মুসলিম সমাজের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর ফলে ইসলামি আইনচর্চা স্থবির না হয়ে চলমান ও যুগোপযোগী থাকে।

কিয়াসের বাস্তব প্রয়োগে তিনি ‘ইসতিহসান’ বা ন্যায়সংগত ব্যতিক্রমের ধারণা প্রবর্তন করেন। জনকল্যাণ ও সামাজিক প্রয়োজনের আলোকে কঠোর আইনি বিধানের যুক্তিসঙ্গত সংশোধন—এই ধারণা ইসলামী আইনে এক বৈপ্লবিক সংযোজন। একইভাবে ‘উরফ’ বা প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি আইনের উৎস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়াও তারই অবদান।

হাদিস বিষয়ে তার অবস্থান নিয়ে নানা অপবাদ থাকলেও ইবনে খালদুনের মতো মনীষীরা স্পষ্ট করেছেন—তিনি হাদিস অস্বীকার করেননি, বরং গ্রহণের ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। অপ্রামাণ্য বা দুর্বল সূত্রের হাদিসের ওপর আইন প্রতিষ্ঠা করতে তিনি নারাজ ছিলেন। এই সতর্কতাই তার ফিকহকে যুক্তিবহ ও সুসংহত করেছে।

আজ বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুসলমান হানাফি মাজহাবের অনুসারী। উপমহাদেশ, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া ও বহু আরব দেশে এই মাজহাবের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এই বিস্তারের পেছনে রয়েছে ইমাম আবু হানিফার (রহ.) উদারতা, বাস্তবতা ও মানবকল্যাণমুখী চিন্তা।

ইমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) শুধু একজন মাযহাব-প্রতিষ্ঠাতা নন—তিনি ছিলেন স্বাধীন চিন্তার প্রতীক, ন্যায়ভিত্তিক আইনচিন্তার পথিকৃৎ এবং ক্ষমতার কাছে মাথা না নোয়ানো এক নির্ভীক আলেম। ইসলামের ইতিহাসে তার অবদান সূর্যালোকের মতোই স্পষ্ট ও চিরভাস্বর।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।