ওলি-আউলিয়ার গল্প

রাজকীয় জীবন ছেড়ে হলেন দিনমজুর

আহমাদ সাব্বির
আহমাদ সাব্বির আহমাদ সাব্বির , আলেম, লেখক ও অনুবাদক
প্রকাশিত: ০৯:১৬ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
ওলি-আউলিয়ার গল্প ছবি: ফ্রিপিক

আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের ছেলে আহমাদ সিবতী মাত্র ষোল বছর বয়সেই বুঝেছিলেন—দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, এখানে যা কিছু আছে তা একদিন শেষ হয়ে যাবে। এই উপলব্ধি থেকেই তার মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। তিনি অন্য যুবকদের মতো আনন্দ-উল্লাসে সময় কাটাতেন না, বরং বেশি সময় কাটাতেন আল্লাহভীরু মানুষের সঙ্গে। তাদের কথা শুনতেন, তাদের জীবন থেকে শিক্ষা নিতেন।

তিনি প্রায়ই কবরস্থানে যেতেন। সেখানে দাঁড়িয়ে মৃতদের নিয়ে ভাবতেন। যেন নিজেকেই প্রশ্ন করতেন, যারা একদিন এই পৃথিবীর মালিক ছিলেন, তারা আজ কোথায়? তাদের সম্পদ, ক্ষমতা, অহংকার—সবই তো মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। এই চিন্তাগুলো তাকে গভীরভাবে নাড়া দিত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দুনিয়ায় যত সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তিই থাকুক, শেষ পরিণতি সবার একই—কবর।

একদিন তিনি তার বাবার দরবারে গেলেন। কিন্তু তার পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল একেবারেই সাধারণ। রাজদরবারের লোকেরা তাকে দেখে বিদ্রূপ করল। তারা মনে করল, এই ছেলে বাদশাহর সম্মান নষ্ট করছে। কিন্তু তিনি এসব কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। বরং এক অদ্ভুত শান্তি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসে রইলেন। এক সময় রাজ দরবারের লোকেরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে লক্ষ করলো, ১৬ বছরের এই কিশোর একটি পাখির দিকে ইশারা করতেই পাখিটি তার কোলে এসে বসে পড়েছে। তারা বুঝতে পারলো, বাদশাহর ছেলে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে অনন্ত অসীম ঐশ্বর্যের মালিক হয়েছে।

এই ঘটনার পর আহমদ সিবতী তার বাবাকে বলেন, দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা মানুষকে ছোট করে দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আর রাজপ্রাসাদে থাকবেন না। শুধু একটি কোরআন নিয়ে তিনি অজানার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। তার মা তাকে একটি দামি আংটি দিয়েছিলেন, সেটাও তার সঙ্গে ছিল মায়ের স্মৃতি হিসেবে। কিন্তু আংটিটিও তিনি ব্যবহার করতেন না।

বসরা শহরে গিয়ে তিনি একেবারে সাধারণ শ্রমিকের জীবন বেছে নেন। সপ্তাহে একদিন তিনি সাধারণ শ্রমের কাজ করতেন, এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরি নিতেন; তা দিয়েই তার সারা সপ্তাহ চলে যেত। নির্দিষ্ট মজুরির বেশি কেউ দিতে চাইলেও ফিরিয়ে দিতেন। তার কাছে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ উপার্জন করা ছিল অর্থহীন।

নিজের কাজে তার দক্ষতা ছিল। তিনি একাই অনেক মানুষের কাজ করে ফেলতেন। কিন্তু কখনো এ নিয়ে গর্ব করতেন না। বরং খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের কাজ করে যেতেন। যারা তাকে দেখত, তারা অবাক হয়ে যেত—কীভাবে একজন মানুষ এত কম সময়ে এত বেশি কাজ করতে পারে! 

নামাজকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। কাজ নেওয়ার সময়েই স্পষ্ট করে বলে দিতেন, নামাজের সময় হলে তিনি কাজ ছেড়ে দেবেন।

এভাবে কিছু কাল পরিচয়হীন এক সাধারণ শ্রমিকের জীবন যাপন করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখনও তিনি কাউকে নিজের পরিচয় দেননি। প্রতিবেশীদের মধ্যে যারা তার কাছে আসতো, তাদেরকে তিনি আখেরাতের জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলতেন। দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার উপদেশ দিতেন।

মৃত্যুর আগে তিনি অসিয়ত করেন—তাকে যেন তার পুরনো সাধারণ কাপড়েই দাফন করা হয়। মৃত্যুর পর নতুন কাপড় বা জাঁকজমকের কোনো মূল্য নেই। মানুষের সাথে শুধু তার কাজই যাবে।

তিনি তার বাবার জন্য একটি বার্তা রেখে যান। তিনি চেয়েছিলেন, তার বাবা যেন বুঝতে পারেন—দুনিয়ার মোহে পড়ে থাকা ঠিক নয়। এই বার্তাটি যখন তার বাবার কাছে পৌঁছে, তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মৃত্যুর পর এক বুজুর্গ তাকে স্বপ্নে দেখেন। তিনি জানান, আল্লাহ তাকে এমন সব নেয়ামত দিয়েছেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে। তার ত্যাগ ও সাধনা সফল হয়েছে।

বাদশাহর সন্তান আহমদ সিবতী ইচ্ছে করলেই বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে বাদশাহী শান-শওকতে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু একদিন তাকে দুনিয়া ছেড়ে অনন্ত জীবনে পাড়ি জমাতেই হতো। আহমদ সিবতী দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়ার চেয়ে অনন্ত ঐশ্বর্যের মালিক হওয়াই পছন্দ করেছেন।

আমরা যদি তার দৃষ্টিতে এই দুনিয়ার দিকে তাকাতে পারি, আমরাও অনুভব করবো, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসের জন্য আমাদের এত ছুটোছুটি, অস্থিরতা অর্থহীন। দুনিয়ার মোহ আমাদের আমাদের চোখে ঠুলি পরিয়ে রাখে। আমরা সব বুঝেও বুঝতে পারি না। ক্ষণস্থায়ী বিলাসের পেছনে ছুটতে ছুটতে অনন্ত জীবনের কথা ভুলে যাই!

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।