শোক পালন করবেন কতদিন?

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৫৮ পিএম, ১২ জানুয়ারি ২০২২

আত্মীয়-স্বজন মারা গেলে হাউ-মাউ করে উচ্চ আওয়াজে কান্নাকাটি-আহাজারি করা ইসলামে নিষিদ্ধ। যদিও আপনজনের মৃত্যু সীমাহীন কষ্টের। এ সময় যারা ধৈর্য ধরবেন আল্লাহ তাআলা তাদের উত্তম বিনিময় দান করবেন। তবে আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতে শোক পালন করা যাবে। কিন্তু কতদিন পালন করা যাবে এ শোক?

হ্যাঁ, ইসলাম আপনজনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের অনুমোদন দেয়। তিনদিন পর্যন্ত শোক পালন করা যাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে চুমু দিয়েছিলেন এবং শোক পালনে তিন দিন কেঁদেছিলেন। হাদিসে এসেছে-

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত জাফরের পরিবারকে শোক প্রকাশে তিন দিনের অবকাশ দিয়েছিলেন যে, তিনি তাদের কাছে আসবেন। এরপর (তিনদিন পর) তাদের কাছে আসলেন এবং বললেন- ‘আজকের দিনের পর তোমরা আমার ভাইয়ের প্রতি আর কেঁদো না।’

শোকের সময় ধৈর্যধারণ করা সর্বোত্তম আমল। এ আমলের পুরস্কার দিয়েই মহান আল্লাহ নিজে সন্তুষ্ট হবেন। তাই ধৈর্যধারণ করে শোক প্রকাশে- ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ তথা ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব’ এই বলে আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া। আল্লাহ কী পুরস্কার দিয়ে সন্তুষ্ট হবে বলে উল্লেখ করেছেন হাদিসে?

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি যার কোনো প্রিয়জনকে উঠিয়ে নিই আর সে ধৈর্য ধারণ করে এবং নেকির আশা রাখে আমি তাকে জান্নাত দিয়েই সন্তুষ্ট হবো।’ (তিরমিজি)

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শোক

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনেও বার বার শোক এসেছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁর একান্ত প্রিয়জনদের হারিয়েছেন। তিনি জন্মের আগেই তার বাবাকে হারান। জন্মের ৬ বছর বয়সে মমতাময়ী মাকে হারান। আট বছর বয়সে দাদাকে হারিয়ে একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।

এরপর তাঁর লালনপালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন চাচা আবু তালিব। নবুয়তের দশম বছরের রমজান, মতান্তরে শাওয়াল মাসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচা আবু তালিবকে হারান।

চাচার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই তিন বা পাঁচ দিনের ব্যবধানে তাঁর একান্ত প্রিয়জন, সহধর্মিণী হজরত খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে হারান। তাঁর জীবনে চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদিজাতুল কুবরার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। কেননা তারা দুজনই সবসময় নবিকে রেসালাতের কাজে শক্তি-সাহসসহ সার্বিক সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতেন। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে ওই বছরকে ‘আমুল হুজুন বা শোকের বছর হিসেবে অভিহিত করা হয়।

হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শোক

হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন যে, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়ায় চড়ে তাঁর বাড়ি থেকে এসে নামলেন। এরপর মসজিদে প্রবেশ করলেন। (সে সময়) ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন।

আবু বকর রাদয়িাল্লাহু আনহু কারো সঙ্গে কথা না বলে হজরত আয়েশার ঘরে প্রবেশ করলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তায়াম্মুম করাচ্ছেন। এ অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাদর (হিবারা) দ্বারা আবৃত ছিলেন।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা খুললেন এবং ঝুঁকে পড়ে তাঁর দুচোখের মাঝখানে চুমু দিলেন এবং কাঁদলেন। এরপর বললেন-

‘হে আল্লাহর নবি! আপনার জন্য আমার বাবা-মা কোরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য দু'বার মৃত্যুকে একত্রিত করবেন না। আপনার যে মৃত্যু হলো; এটা হয়েই থাকে।’

মানুষের প্রিয়জন হারানোর শোক একদিনেই শেষ হয়ে যায় না। ক্রমান্বয়ে অনেকটা সহনীয় হয়। তবে প্রিয়জনের মৃত্যুশোক স্মৃতি হয়ে রয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনের কোঠায় ভেসে উঠে মনকে ব্যথিত করে। সে ক্ষেত্রে আবারও ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলে আল্লাহর দিকে ধাবিত হতে হবে।

শোক পালনকারী ব্যক্তিকে সহযোগিতা করতে উৎসাহ দিয়েছেন স্বয়ং বিশ্বনবি। তিনি বলেছেন, ‘

স্বামীহারা নারী ও মিসকিনের জন্য খাদ্য জোগাড়ে চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো অথবা রাতে নামাজে দণ্ডায়মান ও দিনে রোজা পালনকারীর মতো।’ (বুখারি)

তাই শোকার্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া, সমবেদনা জানানো, যথাসাধ্য খোঁজখবর নেওয়া ও সহযোগিতা করা ইসলামের অন্যতম মানবীয় সদাচরণ। বিধবা, ইয়াতিম ও সন্তানহারা মায়ের প্রতি সমবেদনা প্রদর্শন করতে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ তাদের দুঃখ বা শোক বর্ণনাতীত। তাদের অসহায়ত্ব সীমাহীন। তাইতো নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন-

সন্তানহারা মাকে যে সান্ত্বনা দেয়; জান্নাতে তাকে বিশেষ পোশাক পরানো হবে।’ (তিরমিজি)

সুতরাং আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুর পর ধৈর্যের সঙ্গে হাউ-মাউ করে কান্নাকাটি না করে তিনদিন শোক পালন করা যাবে। এমনকি মৃতব্যক্তির চেহারা উম্মুক্ত করা এবং দুচোখের মাঝখানে (কপালে) চুমু দেয়াও বৈধ। শোক প্রকাশের এ তিনদিন কান্নায় চোখ থেকে অশ্রু ঝরবে। কিন্তু হাউ-মাউ বা উচ্চ আওয়াব বা বিলাপ হবে না।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আপনজনের মৃত্যুকে সুন্নাত নিয়মে তিনদিন শোক পালন করার তাওফিক দান করুন। ধৈর্যধারণ করে হাদিসে ঘোষিত আল্লাহর সন্তুষ্টির জান্নাত পাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]