প্রবাসে নারীরা অন্য পেশায় যাবে, গৃহশ্রমে কেন?

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ এএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ১০:১০ এএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭

দক্ষতা নিয়ে বাংলাদেশি নারীরা অন্য পেশায় বিদেশ যেতে পারেন। কিন্তু নির্যাতন নিশ্চিত জেনেও কেন তাদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো হবে- এমন প্রশ্ন অ্যাডভোকেট সালমা আলীর। সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট এ আইনজীবী ‘বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি’র সাবেক প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায় নিয়েও কাজ করছেন তিনি। প্রবাসী নারী শ্রমিক এবং তাদের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি জাগো নিউজ’র মুখোমুখি হন সালমা আলী।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজ’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সায়েম সাবু। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারে আজ থাকছে প্রথম পর্ব-

জাগো নিউজ : প্রবাসী নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের নানা খবর আসছে। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। আপনি এসব নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। প্রবাসী নারী শ্রমিকদের দিনকাল কেমন দেখছেন?

সালমা আলী : সংবিধান মানুষের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করেছে। একজন নারীও তার ইচ্ছামতো চলাচল করতে পারেন, কাজ করতে পারেন। কাজের বেলায় নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। এ কারণে আমি মনে করি, একজন নারী পুরুষের ন্যায় দেশের বাইরে গিয়েও কাজ করতে পারেন। কিন্তু কাজ করার আগে সবার আগে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। প্রবাসে নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা আমাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

জাগো নিউজ : নিরাপত্তা তো আপেক্ষিক বিষয়। দেশের মধ্যেও নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

সালমা আলী : দেখুন শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইনের নারীরাও মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে কাজ করছেন। তারা জানেন, কীভাবে শহরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, কথা বলতে হয়। তারা জানেন, কীভাবে জামা-কাপড় ইস্ত্রি করতে হয়, চুল বাঁধতে হয়। তারা খানিক ইংরেজিও জানেন। এরপরও তারা নারী শ্রমিক পাঠানোর যে চুক্তি, তা বাতিল করেছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকদের পাঠানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে যারা যাচ্ছেন, তারা ভালো করে কথাই বলতে পারেন না। বাংলা ভাষাই বলতে পারেন না শুদ্ধ করে। একেবারে গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল নারী তারা। একটি থানা-শহরের সঙ্গে অনেকের যোগাযোগ থাকে না। এ পরিস্থিতিতে আমি মনে করি, মধ্যপ্রাচ্যে নারী গৃহশ্রমিক পাঠানো মানে সিংহের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেয়া। এটি তো হতে পারে না। জেনেশুনে একজন নারীকে এমন বিপদে ফেলা যায় না।

জাগো নিউজ : পরিস্থিতি এতই খারাপ! সিংহের খাঁচায় মানুষকে ঢুকিয়ে দেয়ার মতো মনে করছেন?

সালমা আলী : সিংহের খাঁচায় একটি বিড়ালকে ঢুকিয়ে দিলে সে হয়তো দাঁত খিঁচিয়ে কিছুটা প্রতিবাদ করতে পারবে। কিন্তু এ মানুষরা তাও পারবে না। ঢাকায় অনেক বাড়িতে গৃহকর্মী আছেন। তারাও কিন্তু অনেকটা বন্দি অবস্থায় থাকেন। কোনো কোনো বাড়িতে আবার একেবারে অরক্ষিতও বটে।

এরপরও মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকির মাত্রা আরও ভয়ঙ্কর বলে মনে করি। ওখানকার পুরুষরা মানসিকভাবেই সিদ্ধ যে, এমন কাজ করা যায়। নারী নির্যাতন তারা অনেকেই অপরাধ মনে করেন না।

ওই পুরুষরা মনে করেন, তার অধীনে যে নারীরা থাকেন তাদের ভোগও করা যায়। আবার নির্যাতনও করা যায়। আপনি টিভি সিরিয়াল সুলতান সুলেমান দেখলেই বুঝতে পারবেন নারীর প্রতি পুরুষের কী অবজ্ঞা!

জাগো নিউজ : আপনার কাছে কোনো কেস স্টাডি আছে?

সালমা আলী : এসব নারীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক ঘটনাই জানতে পেরেছি। এক মেয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম, স্বামীর ঘর থেকে বের করে দিয়ে তাকে দেবরের ঘরে নেয়া হয়। আবার দেবরের ঘর থেকে ছেলের ঘরে পাঠায়। স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের বলে, তুমি যদি দাসীদের এভাবে না রাখতে দাও, তাহলে অন্যত্র বিয়ে করব। স্বামী হাতছাড়া হবে, এ ভয়েই স্ত্রীরা এসব কর্মকাণ্ড মেনে নেন অথবা সহযোগিতা করেন। বলতেও ঘৃণা লাগে।

jagonews24

জাগো নিউজ : এ পরিস্থিতি কী গড়পড়তা। ভালো থাকার গল্প মেলে না?

সালমা আলী : সবাই এ পরিস্থিতির মধ্যে আছে, আমি তা মনে করি না। অনেকেই হয়তো ভালো আছেন। কিন্তু বিপদ জেনে আমি একজন নারীকেও সেখানে পাঠাতে পারি না।

জাগো নিউজ : নারীদের পাঠাতে গিয়ে তো সরকার ভালো গল্পও শোনায়!

সালমা আলী : অনেক কিছুই শুনিয়েছে সরকার। স্মার্টকার্ডের কথা শুনলাম। আমরাও একের পর এক কর্মশালায় অংশ নিয়েছি। মিটিং, সেমিনারও করা হয়েছে। ফলাফল কই? লেবানন, জর্ডান, সৌদি আরবে শেল্টার হোম করা হয়েছে। সেখানে লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে কাউন্সিলিং করতে। তারা আদৌ কোনো কাউন্সিলিং করছেন? কোনো খবর পাইনি।

জর্ডানের ইউনিসেফে এক বাংলাদেশি কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বললেন, দুই বছরে জর্ডানের একটি হাসপাতালে ৪৫ নারী শ্রমিকের লাশ মিলেছে। যারা সবাই অস্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন।

জাগো নিউজ : এমন খবর তো মিডিয়াতেও আসে না?

সালমা আলী : মিডিয়া হয়তো খবর রাখে না। লাশ আসলে চুপচাপ মাটি দেয়া হয়। পরিবারের মানুষরাও জানেন না, অস্বাভাবিক মৃত্যু কি-না? সম্প্রতি একটি লাশ আনার পর চুপচাপ কবর দেয়া হলো। বলা হলো, ফাঁসিতে মারা গেছে। আমি চ্যালেঞ্জ করলাম। লাশ কবর থেকে ওঠানো হলো। ফরেনসিক রিপোর্টেও বলা হলো আত্মহত্যা করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, একজন নারী সেখানে গিয়ে আত্মহত্যা করবে কেন? যদি আত্মহত্যা করেই থাকে, তাহলে যার বাড়িতে মারা গেল, তার দায় কী?

প্রথমত আমি মনে করি, আমাদের নিজেদেরই দায়বদ্ধতা নেই। আর এ কারণেই নারীরা লাশ হয়ে ফিরছেন।

জাগো নিউজ : তার মানে নারী শ্রমিক পাঠানোর বিপক্ষে আপনার অবস্থান?

সালমা আলী : নারীরা স্বাবলম্বী হোক, তা একজন নারী হিসেবে আমিও চাই। কিন্তু কোনো প্রকার দক্ষতা নেই এমন একজন নারীকে দূরদেশে পাঠিয়ে কোনো লাভ হয় না, ক্ষতি ছাড়া। অন্য পেশার জন্য নারীরা যেতেই পারেন। কারও বাড়িতে রাখা চলে না। বাড়ি হচ্ছে একটি খাঁচা। হোটেল বা বাড়ি ভাড়া করে কয়েকজন মিলে থাকতেই পারেন। কিন্তু সেটাও গৃহশ্রমিকের জন্য নয়।

ইন্দোনেশীয় একটি মেয়ের কাছ থেকে জানলাম, তাদের ওপর কিন্তু এমন নির্যাতন করতে পারে না। তারা কিছুটা ইংরেজি, আরবি বলতে পারেন। এ কারণে ভালো-মন্দ সবই বুঝতে পারেন।

আমাদের অবস্থান তো খুবই খারাপ। ভারত তাদের মেয়েদের পাঠায় না। নেপাল কমিয়ে দিয়েছে। ফিলিপাইন চুক্তি বাতিল করেছে। তারা নারীদের অন্য শ্রমে পাঠাচ্ছে। আমাদের শিক্ষিত মেয়েরাও যেতে পারে অন্য পেশায়। কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু গৃহশ্রমে যাবে কেন?

এএসএস/এসআর/এমএআর/আরআইপি

মধ্যপ্রাচ্যে নারী গৃহশ্রমিক পাঠানো মানে সিংহের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেয়া। এটি তো হতে পারে না। জেনেশুনে একজন নারীকে এমন বিপদে ফেলা যায় না

একজন নারী সেখানে গিয়ে আত্মহত্যা করবে কেন? যদি আত্মহত্যা করেই থাকে, তাহলে যার বাড়িতে মারা গেল, তার দায় কী?

ভারত তাদের মেয়েদের পাঠায় না। নেপাল কমিয়ে দিয়েছে। ফিলিপাইন চুক্তি বাতিল করেছে। তারা নারীদের অন্য শ্রমে পাঠাচ্ছে। আমাদের শিক্ষিত মেয়েরাও যেতে পারে অন্য পেশায়। কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু গৃহশ্রমে যাবে কেন?

আপনার মতামত লিখুন :