নির্বাচন ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা হোঁচট খাবে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:২২ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৮

সাইফুল হক। সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা। বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ইউনিয়নের সভাপতিরও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

নির্বাচন, সংলাপ, রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন হলে দেশে সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধ) হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সরকারের অবস্থানের পরিবর্তন আহ্বান করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির দাবি জানান। সরকারের নীতির পরিবর্তন হলে বাম গণতান্ত্রিক জোট আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবে বলেও জানান তিনি। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষটি থাকছে আজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনমুখী। যদিও আন্দোলনের কথাও বলছেন তারা। এ ফ্রন্টের গতিবিধি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

সাইফুল হক : আমরা যে দাবিগুলো নিয়ে কথা বলছি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও তার অনেক কথা বলছেন। যারাই আমাদের দাবির সঙ্গে একমত হবেন, আমরা তাদের সঙ্গেই আন্দোলনে শরিক হবো।

শেখ হাসিনার সরকার এককেন্দ্রিক, ব্যক্তিনির্ভর। যে স্বৈরব্যবস্থা তিনি কায়েম করেছেন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো হচ্ছে নৈতিক দায়িত্ব। ফ্যাসিবাদী সরকার যে দুঃশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, এখন সেই দুঃশাসন সামনে রেখে আন্দোলনের কথা বলতে হচ্ছে।

আমি মনে করি, এ ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে শুধু বামপন্থীরা এককভাবে আন্দোলন করতে পারবে না। সমাজের সকল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক শক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে আন্দোলন জোরদার করতে হবে। এমনকী শাসক শ্রেণির মধ্যে যারা গণতান্ত্রিক, উদারপন্থী তাদেরও আমাদের আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সমস্ত অগ্রসর শক্তিকে একীভূত করে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলেই মানুষকে রাস্তায় নামানো সম্ভব। যদিও আদর্শিক জায়গা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তফাৎ আছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও তাদের আহ্বানে মানুষ সাড়া দিয়েছে বলে আমি মনে করি।

jagonews

জাগো নিউজ : আপনারা সাড়া দেবেন কীভাবে?

সাইফুল হক : আমি চাই বা না চাই, রাজপথে দাঁড়ানো শক্তিগুলোর মধ্যে এক ধরনের ঐক্য গড়ে ওঠে। সেই ঐক্য কার্যকর হবে কিনা- তা নির্ভর করবে আন্দোলনকারীদের মধ্যে পরস্পর সমঝোতা, সংবেদনশীলতার মধ্য দিয়ে। স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের পতনের মধ্য দিয়ে রাজপথে একটি ঐক্য গড়ে ওঠাকে আমি অসম্ভব মনে করি না।

জাগো নিউজ : ঐক্যফ্রন্ট শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকলে আপনাদের অবস্থান কী থাকবে?

সাইফুল হক : আমরা চাই, গণতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত থাকুক। নির্বাচনও আন্দোলনের অংশ। আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে গ্রহণ করবো। তবে তাদের নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখবো।

জাগো নিউজ : বামপন্থী অনেক নেতাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ মনে করেন। আপনার মত কী?

সাইফুল হক : আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, এখন প্রধানতম বিপদ হচ্ছে আওয়ামী লীগের দুঃশাসন। এই দুঃশাসনকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে জনগণের এক নম্বর কর্তব্য।

সম্মিলিত আন্দোলনে অংশ নিয়েও বামপন্থীদের অবস্থান পরিষ্কার রাখা যায় বলে আমার বিশ্বাস। এ বিশ্বাস থেকে ভিন্ন মতের দলের সঙ্গেও ঐক্য গড়ে তোলা যায়, যদি সেখানে আমার আদর্শকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারি।

চলমান আন্দোলনকে যদি বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কাজ বলে বামপন্থীরা মনে করেন, তাহলে তারা কখনই নেতৃত্বে আসতে পারবেন না। রাজনীতির প্রধান ধারায় আসতে হলে বাস্তবতা বুঝতে হবে। গণতান্ত্রিক ধারায় আন্দোলন করে দুঃশাসকের পতন ঘটানো অবশ্যই কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি গণতান্ত্রিক ধারার সামান্যতম জায়গা না থাকে, তাহলে আমি আমার শ্রেণি সংগ্রামের আন্দোলনের পথও খুঁজে পাবো না।

জাগো নিউজ : কিন্তু গণতান্ত্রিক ধারায় আওয়ামী লীগের অবদান তো একেবারে অস্বীকার করা যায় না…

সাইফুল হক : আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল। তাদের বর্ণাঢ্য অতীত রয়েছে। তারা মানুষের ভোটের জন্য রাজপথে আন্দোলন করেছে। অথচ সেই আওয়ামী লীগ এখন মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করছে প্রতিনিয়ত। আমি মনে করি, আজকের পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের একটি ঐতিহাসিক পরাজয়।

আওয়ামী লীগ যদি গণতান্ত্রিক দল হয়, তাহলে এত ভয় পাওয়ার কী আছে? উন্নয়ন করে থাকলে চ্যালেঞ্জ নিক। ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচনে আসুক।

জাগো নিউজ : ক্ষমতা ছাড়লে তো অন্য শক্তি আসারও আশঙ্কা থাকে?

সাইফুল হক : সংলাপে প্রধানমন্ত্রীও আমাদের কাছে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। আমরা বলেছিলাম, সরকার ভেঙে দিয়ে উদ্যোগ নিন। আমরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান বের করতে পারবো।

জাগো নিউজ : নির্বাচন ব্যর্থ হলে?

সাইফুল হক : নির্বাচন ব্যর্থ হলে গৃহযুদ্ধ বাধবে। শুধু সরকারি দলের জন্য সংকট তৈরি হবে না, ৪৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে দেশ। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অস্বীকার করা যায় না। এবারের নির্বাচন ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা হোঁচট খাবে।

কারণ এত বিরোধ, বৈষম্য, প্রতিবন্ধকতা রেখে একটি সমাজ, রাষ্ট্রের টেকসই অগ্রযাত্রা হয় না। মতবিরোধ থাকতেই পারে। তাই বলে আমি আপনার মুখ চিরতরে দেখা বন্ধ করে দিতে পারি না।

শুধু এবার নয়, যদি স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না পায়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতেও নির্বাচন ব্যর্থ হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া না হয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন না থাকে তাহলে শেষ বিচারে কেউ রক্ষা পাবে না।

প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে না পারলে সরকার যা ইচ্ছা তাই করবে। যা এখন চলছে। বাইরের দেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, কিন্তু বৈরিতা নেই। আপনাকে নিঃশেষ করে দিয়ে আমার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মানসিকতা কম দেশেই আছে। বিরোধীপক্ষের মতের মর্যাদা দিয়ে ক্ষমতাসীনরা শাসন করে।

এ কারণেই বলছি, আরেকটি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষ ধারণ করতে পারবে না। এমন নির্বাচনে গভীর ক্ষত তৈরি হবে, আরও বিভাজন তৈরি হবে। আর অধিক মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরি হলে বিস্ফোরণ ভয়াবহ হবেই।

এএসএস/আরআইপি

সমস্ত অগ্রসর শক্তিকে একীভূত করে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলেই মানুষকে রাস্তায় নামানো সম্ভব

গণতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত থাকুক। নির্বাচনও আন্দোলনের অংশ

মতবিরোধ থাকতেই পারে। তাই বলে আমি আপনার মুখ চিরতরে দেখা বন্ধ করে দিতে পারি না