কাউন্সিলর-পুলিশ যোগসাজশে পরিবহন খাতে অভিনব চাঁদাবাজি


প্রকাশিত: ০৩:৪০ পিএম, ২০ জুন ২০১৬

দলীয় প্রভাব ও পুলিশের যোগসাজশে রাজধানীর বেশ কয়েকটি রুটের বাসে চলছে অভিনব কৌশলে চাঁদাবাজি। দিনে দুইবার খুচরা ৯৩০ টাকা জোর করে ধরিয়ে দিয়ে ১০০০ টাকা করে নিয়ে নেয়া হচ্ছে। এই অভিনব এই চাঁদাবাজিকে বলা হচ্ছে ‘ব্যাক মানি’। এভাবে বাস ও লেগুনা থেকে চাঁদাবাজি হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টু আব্দুল্লাহপুর, মোহাম্মদপুর টু মতিঝিল ও উত্তরা রুটসহ শিয়া মসজিদ, আগারগাঁও ও মিরপুর রোডে চলাচলকারী যানবাহনে এ অভিনব চাঁদাবাজি চলছে। পরিবহন মালিক, শ্রমিক পক্ষ এবং সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সরকারি দল আর কাউন্সিলর পদের প্রভাব দেখিয়ে পুলিশের যোগসাজশে এ চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব।

তবে রাজিব এসব কাজে সরাসরি না জড়ালেও তার ইশারায় তানভীর নামে এক নিকটত্মীয় এই অভিনব চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। তানভীর শুধু বাসে নয়, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, মহাখালী ও ফার্মগেট রুটের লেগুনা থেকেও ব্যাপক হারে চাঁদাবাজি করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ শাহিনুর রহমানের বিরুদ্ধেও। তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসোয়ারা পেয়ে থাকেন। সে কারণে অভিযোগ পাওয়া সত্ত্বেও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে দাবি পরিবহন মালিক শ্রমিক সংগঠনের।

পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, কারা কাদের প্রভাব দেখিয়ে এবং কোন মহলের প্রত্যক্ষ মদদে চাঁদাবাজি করছে তা পুলিশ স্পষ্ট জানে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকেও বলা হয়েছে তবুও বন্ধ হচ্ছে না চাঁদাবাজি। বাধা দিলে শ্রমিকদের মারধর ও বাসে ভাঙচুর চালানো হয়।


চাঁদাবাজি সম্পর্কে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান বলেন, নগরীর বেশ কয়েকটি রুটে বাস থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও স্থানীয় কাউন্সিলরকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। কিন্তু চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায়ের সুবিধার্থে বাসের সুপারভাইজারের কাছে খুচরা টাকা রাখতে হয়। প্রতিদিন সকালে বাস সড়কে নামার আগেই প্রত্যেক কোম্পানির যানবাহনে খুচরা ৯৩০ টাকা জোর পূর্বক দেয়া হয়। সেই খুচরা টাকা সরবরাহের পর দুপুরে ও রাতে বিভিন্ন যানবাহনের কাছ থেকে ১০০০ টাকা উত্তোলন করে কাউন্সিলর রাজিবের আত্মীয় তানভীর এবং তার ক্যাডার হাসানের লোকজন। খুচরা না নিলে কিংবা ১০০০ টাকা না দিলে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের চালক ও সহকারীকে মারধর করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চালক বলেন, দিনের শুরুতে কোম্পানির মালিকরা খুচরা টাকা দিয়ে দেয়। বাইরে থেকে খুচরা টাকা নিতে পারি না। আমাদের কাছ থেকে হাজারে ৭০ টাকা করে আদায় করা হয়।

তেঁতুলিয়া পরিবহনের এক সুপারভাইজার জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের ৯০টা বাস রয়েছে। প্রতিটি বাস থেকে ৭০ টাকা করে খুচরা টাকার কথা বলে বেশি টাকা আদায় করা হয়। সে হিসেবে ৬ হাজারে ৩০০ টাকা নেয়। দিনে কমপক্ষে দুইবার নেয়। সে হিসেবে ১২ হাজার ৬০০ টাকা নেয় প্রতিদিন। মাস শেষে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু মোহাম্মদপুর থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচল করে প্রজাপতি, তেঁতুলিয়া, ভূইয়া ও রংধনু পরিবহন। চক্রটি প্রত্যেকটি বাস থেকে সমপরিমাণ টাকা আদায় করে। মাস থেকে চক্রটি অর্ধকোটি টাকা শুধু খুচরা টাকা ভাংতি দেয়া বাবদ চাঁদাবাজি করছে। চক্রটির পেছনে আদাবর থানা পুলিশ ও স্থানীয় কাউন্সিলরের হাত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। ঈদকে সামনে রেখে এই বাহিনী আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

police
শনিবার দুপুরে মোহাম্মদপুর জাপান গার্ডেন সিটির সামনে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রবীর নামে হাসানের এক লোক এসে খুচরা টাকার বদলে হাজার টাকা নিতে এসেছেন। পরিচয় জানতে চাইলে কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, সামনের স্ট্যান্ডে হাসান ভাই আছেন। যা বলার তাকেই বইলেন। আমাকে বইলা লাভ নাই।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের মিরপুর অঞ্চলের আহ্বায়ক শাহজাহান বাবুল বলেন, মোহাম্মদপুরে কতিপয় ব্যক্তি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যানবাহনে চাঁদাবাজি করছে; পরিবহন মালিকরা একাধিকবার আামদের এমন অভিযোগ করেছেন। আমরা ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও কমিশনারকে অনুরোধ জানিয়েছি।

আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ শাহিনুর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। আমাকে জড়িয়ে যারা অভিযোগ করেছে তা পুরোটাই মিথ্যে। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। আমাদের ওখানে চেকপোস্ট আছে। বিষয়টি নজরদারিতে আনা হবে।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার জাগো নিউজকে বলেন, পারিবারিক কারণে আমি গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে আছি। ঢাকায় ফিরে এ ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানান তিনি।

জেইউ/বিএ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]