ডিএনসিসি নির্বাচন ‘জটিলতা’ এক মাসেই দূর করা সম্ভব

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৪০ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০১৮

অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। গবেষণা করছেন স্থানীয় সরকারের নানা বিষয় নিয়ে। লিখেছেন নির্বাচন, সুশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে।

আদালত কর্তৃক ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাচন স্থগিতাদেশ, আইনি জটিলতা, নির্বাচন কমিশনের করণীয় এবং নির্বাচন-কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। সামনের নির্বাচন ঘিরে শঙ্কার কথা উল্লেখ করলেও জনপ্রত্যাশা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু। তিন পর্বের প্রথমটি থাকছে আজ-

জাগো নিউজ : ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উপ-নির্বাচন স্থগিত করেছে আদালত। নির্বাচনের এ স্থগিতাদেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন জনমনে। আপনি কিভাবে দেখছেন?

তোফায়েল আহমেদ : ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে ১৮টি করে নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হয়েছে ২০১৬ সালের জুন মাসে। ২০১৭ সালের মধ্যেই নতুন এসব ওয়ার্ডে নির্বাচন হওয়া উচিত ছিল। তা হয়নি। মেয়র আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর উপ-নির্বাচনের বিষয়টি সামনে আসে।

নতুন ওয়ার্ডগুলোর ক্ষেত্রে আইনি যে জটিলতা ছিল, তা নিরসন করেই নির্বাচনে যাওয়া উচিত ছিল বলে মনে করি।

জাগো নিউজ : জটিলতার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনেরও জানার কথা...

তোফায়েল আহমেদ : আইনি জটিলতার বিষয়টি না জানার কথা নয় নির্বাচন কমিশনের। এটি সবারই জানা। হয়তো নির্বাচন কমিশন বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেনি। আইনি জটিলতা অবহেলা করেছে কমিশন।

সমাধান হতে পারতো, হয়নি। এখন এটিই বাস্তবতা। বিষয়টি আদালতে চলে গেছে। এখন নির্বাচন কমিশনের প্রথম কাজ হবে আদালতকে সন্তুষ্ট করে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করানো।

জাগো নিউজ : এ সময়ের মধ্যে আদালতকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব?

তোফায়েল আহমেদ : অবশ্যই সম্ভব। তিন মাস লাগবে না, নির্বাচন কমিশন আন্তরিক হলে এক মাসেই ডিএনসিসির জটিলতা দূর করতে পারে।

জাগো নিউজ : প্রক্রিয়া কী হতে পারে?

তোফায়েল আহমেদ : নির্বাচন নিয়ে নতুন করে আইন করা হয়েছে ২০০৯ সালে। এ আইনে ‘নতুন ওয়ার্ড যেগুলো যুক্ত হবে, সেখানে যারা নির্বাচন করবেন তারা অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন’- এমন একটি বাক্য যুক্ত করলেই সমস্যা মিটে যাবে। নতুন ওয়ার্ডে নবনির্বাচিতরা শপথ নেয়ার পরপরই আগের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যারা নির্বাচিত ছিলেন, তাদের মেয়াদ শেষ হবে।

জাগো নিউজ : উচ্চ আদালতে করা রিটে আসলে কী দেখানো হয়েছে?

তোফায়েল আহমেদ : এখানে বেশ কয়েকটি বিষয় অভিযোগ আকারে আনা হয়েছে। নির্বাচনপ্রত্যাশী অনেকেই ভোটার তালিকায় যুক্ত হতে পারেননি। কেন তারা পারেননি তা বলতে পারবো না। এর ব্যাখ্যা নির্বাচন কমিশনের কাছেই আছে। যদি সঠিক ব্যাখ্যা আদালতে দিতে পারে তাহলে সমস্যা মিটে গেলো।

সীমানা নির্ধারণ এখানে আরেকটি সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন চাইলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান দিতে পারে।

প্রধানতম জটিলতা হচ্ছে, নতুন ওয়ার্ডের প্রতিনিধিদের মেয়াদ। তার সমাধান কীভাবে হতে পারে তারও ব্যাখ্যা দিলাম। গঠনতন্ত্রে একটি লাইন যুক্ত করলেই হবে এবং সেটা সংসদ দায়িত্ব নিয়ে সংশোধন করবে।

এটি একটি নতুন সমস্যা এবং নির্বাচন কমিশন আন্তরিক হলে সহজেই এর সমাধান সম্ভব। আদালতকে সন্তুষ্ট করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তায়।

সমস্যার সমাধান করে নির্বাচন হবে- এটিই আমরা আশা করতে চাই। অন্য কোনো কারণে এ নির্বাচন হচ্ছে না- এমন ধারণা আমরা মনে আনতে চাই না। কার রাজনীতি কী, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে স্থানীয় নির্বাচন হচ্ছে সাংবিধানিক বিষয়।

জাগো নিউজ : কমিশন তো এ নির্বাচন নিয়ে আন্তরিক ছিল। অন্তত তফসিল ঘোষণাসহ নানা কর্মকাণ্ডে তা প্রমাণিত। অথচ নতুন ওয়ার্ড-কেন্দ্রিক যে আইনি জটিলতা, তা আমলে নেয়নি...

তোফায়েল আহমেদ : নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব লিগ্যাল অ্যাডভাইজার আছে। তাদের পরামর্শ নেয়ার কথা ছিল। কেন নেয়নি, তা কমিশনই ভালো বলতে পারবে।

মিডিয়া কমিশনকে বারবার বলেছে, আইনি জটিলতা ছিল কিনা; কমিশন বলেছে, ছিল না।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে এবং সে দায়িত্ব কমিশনের চেয়েও বেশি। সাধারণ মানুষ আগে থেকে এ নির্বাচন নিয়ে নানা সন্দেহ পোষণ করে আসছিল। মানুষ এখন অনেক সচেতন। সবাই এখন সবকিছুতে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়। নির্বাচন কমিশন মানুষের সন্দেহকে বাস্তবে রূপ দিলো। কমিশন এর দায় এড়াতে পারে না। এখন কমিশনের উচিত হবে আদালতে সঠিক জবাব দিয়ে মানুষের সন্দেহ দূর করা।

জাগো নিউজ : আপনি ডিএনসিসি নির্বাচনে আর কী জটিলতা দেখছেন?

তোফায়েল আহমেদ : ডিএনসিসি-তে নতুন ১৮টি ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ায় আইনের শর্ত পূরণ হয়নি। ৭৫ শতাংশ পদ নির্বাচিত হলে কর্পোরেশন গঠিত হয়েছে বলে বিবেচিত হয়। ডিএনসিসি-তে ৬৬ শতাংশ পদ নির্বাচিত রয়েছে।

মেয়রসহ বাকি পদগুলো শূন্য। মেয়র নির্বাচন হলে সমাধান হবে- এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বাকি পদগুলোর জন্যও তো নির্বাচন করতে হবে। আদালত যদি এর জন্য নতুন করে আদেশ দেন, তাহলে সমস্যা আরো বাড়বে।

জাগো নিউজ : নির্বাচিত কাউন্সিলররা তো ঝামেলা করতেই পারেন?

তোফায়েল আহমেদ : হ্যাঁ। মেয়র আনিসুল হক অনেক ভালো কাজ করেছিলেন। প্রশংসাও পেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তিনিও কি কাউন্সিলরদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন? এ অভিযোগ তার বিরুদ্ধেও ছিল।

কাউন্সিলরদের সভা ঠিক মতো হয়নি, গুরুত্ব দেয়া হয়নি। প্যানেল মেয়র দিয়ে ডিএনসিসি চলছে। কাউন্সিলররাও হয়তো চাইছেন আপাতত নির্বাচিত মেয়র না আসুক। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার।

জাগো নিউজ : সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়টিও জড়িত...

তোফায়েল আহমেদ : আমি বলতে চাইছি না রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান হোক। বিষয়টি আদালতে গেছে। আদালতেই এর সুরাহা হোক। যে কোনো সচেতন মানুষই এটি প্রত্যাশা করবে। আইনের বাইরে কথা বলার সময় আসেনি।

আমি ১১টি সিটি কর্পোরেশনের ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে একটি বই লিখেছি। ডিএনসিসি গেল নির্বাচনে ১৬ জন মেয়রপ্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রার্থী ভোট পেলেন সাত লাখ ৭৫ হাজার। বাকি ১৪ জন মিলে পেলেন মাত্র ৫৫ হাজার ভোট। ৫৫ হাজার ভোটের মধ্যে আবার তিনজন পেয়েছেন ৩৮ হাজার।

এ ধারা সব সিটি কর্পোরেশনেই। তার মানে দ্বি-দলীয় একটি ব্যবস্থা কায়েম হয়ে গেছে দেশে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এটি মেনে নিয়েই নির্বাচন করতে হচ্ছে। অন্য দলের অনেক ভালো প্রার্থীকেও মানুষ মূল্যায়ন করছেন না।

জাগো নিউজ : দ্বি-দলীয় ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক ধারা তো ক্ষতিগ্রস্ত হলো…

তোফায়েল আহমেদ : অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ ধারা উন্নত গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাতেও রয়েছে। যদিও অনেক উন্নত দেশে ভোটের অনুপাতে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পেয়ে থাকেন।

এ ধারা উন্নত চিন্তার ফসল। ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আমাদের এখানে ভোটাররা নির্বিঘে ভোট দেবে- এটিই নিশ্চিত করা যায়নি। অন্য বিষয়গুলো তো আরো পরের কথা।

জাগো নিউজ : নির্বাচনী ধারা তো বহমান। এটি ইতিবাচক বলা যায় কিনা?

তোফায়েল আহমেদ : আমরা সবাই নির্বাচন নিয়েই ব্যস্ত। মাজার থেকে প্রাইমারি স্কুলেও এখন নির্বাচন হচ্ছে। প্রচুর অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অথচ নির্বাচনের পর কী কাজ, তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথা-ব্যথা নেই।

স্থানীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন মিলে কাজ করার কথা। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনে কোনো সংস্কার নেই। পাকিস্তান আমল থেকেই জোড়াতালির সংস্কার দেখে আসছি আমরা।

নাড়াচাড়া ধাঁচের যে সংস্কার প্রশাসনে হয়েছে, তা জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য নয়। প্রশাসনের একচ্ছত্র ক্ষমতার জন্যই সংস্কার হয়েছে। কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। নির্বাচন ঘিরেই যত অসহিষ্ণুতা। নির্বাচনমুখী রাজনীতি হিংসা ছড়ালে বিপদ অনিবার্য। আবার অতিনির্বাচনী প্রবণতা সুস্থ রাজনীতি নয়। মসজিদ কমিটির নির্বাচন নিয়েও এখন মারামারি হয়। মহল্লার নির্বাচন নিয়েও মানুষ খুন হয়।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

নির্বাচনমুখী রাজনীতি হিংসা ছড়ালে বিপদ অনিবার্য

মানুষ এখন অনেক সচেতন। সবাই এখন সবকিছুতে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়। নির্বাচন কমিশন মানুষের সন্দেহকে বাস্তবে রূপ দিলো

মেয়র নির্বাচন হলে সমাধান হবে- এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বাকি পদগুলোর জন্যও তো নির্বাচন করতে হবে

আপনার মতামত লিখুন :