ঘুষ নিয়ে এমপিওভুক্তির ‘রেকর্ড’ নাসিরের, মোতালেবও কোটিপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৩ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০১৮

দুর্নীতির অভিযোগে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) উচ্চমান সহকারী মো. নাসির উদ্দিন এর আগেও ঘুষ নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেছিলেন। এ কারণে ২০১৩ সালে মাউশি তাকে শাস্তিও দিয়েছিল। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন রাজধানীর বছিলা রোডে পাঁচ তলা একটি বাাড়ি নির্মাণ করছেন। যার বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা। অথচ তার মূল বেতন ২৮ হাজার ১০০ টাকা।

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাসির প্রায় ২০ বছর ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করছেন। ২০১৩ সালে তিনি মাউশির এমপিও শাখায় নিয়োজিত ছিলেন। সেসময় এমপিওভুক্তি নিয়ে নানা দুর্নীতি ও অর্থ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তৎকালীন মাউশির ডিজির নির্দেশে পরিচালক অধ্যাপক মো. দিদারুল আলমকে আহ্বায়ক করে ২৭৩টি অবৈধ এমপিওভুক্তির ঘটনার তদন্ত কমিটি করে অধিদফতর।

মাউশির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘মাধ্যমিক শাখার উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিন, নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার কাছিহাটা হাইস্কুলের পাঁচজন সহকারী শিক্ষক, একজন কম্পিউটার শিক্ষকসহ মোট সাতজন নিয়মবহির্ভূত এমপিওভুক্তির জন্য দায়ী।’

প্রতিবেদনে দুর্নীতি প্রমাণ পাওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নাসির উদ্দিনকে প্রথমে মিরপুর জেলা শিক্ষা অফিসে জেলা শিক্ষা অফিসারের অফিস সহকারী হিসেবে বদলি করা হয়। সেখানে এক বছর চাকরির পর সিরাজগঞ্জের উল্ল্যাহ পাড়া সরকারি কলেজে বদলি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জোর তদবির করে গত চার মাস আগে সংযুক্ত বদলি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আসেন তিনি।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নাসির খিলক্ষেতে লেকসিটি কনকর্ডের বৈকালী-৬ ভবনের চতুর্থ তলার ৬-এফবি ১/৩ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন, যার বর্তমানমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। চার বেডরুমের ফ্ল্যাট, ড্রয়িং-ডাইনিং মিলে মোট সাড়ে ১৩শ স্কয়ার ফিট। গত ১৪ বছর আগে ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন তিনি। সরকারি বেতন কাঠামো অনুযায়ী, ২০ বছরের চাকরি জীবনে বৈধভাবে তার পক্ষে কোনোভাবেই কোটি টাকা আয় করা সম্ভব নয়। তার একটি জিপ গাড়ি আছে, যেটি তিনি মাউশির বলে দাবি করেন। এছাড়া তার একটি প্রাইভেটকারও রয়েছে।

এদিকে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী মো. মোতালেব হোসেন প্রায় ২০ বছর ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করছেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় বিভাগ, এমপিওসহ বিভিন্ন দফতরে কাজ করেছেন। গত দুই বছর ধরে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

jagonews24

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে ১০ম গ্রেডে মোতালেবের মূল বেতন ২৮ হাজার ১০০ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। অথচ মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকার পশ্চিম ধানমন্ডির বি ব্লকে তার একটি বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি হচ্ছে। পাঁচ তলা ফাউন্ডেশনের বাড়িটির দুই তলার কাজ শেষ। এর বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা।

বছিলা রোডের ওই বাড়িতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটি দুই ইউনিটের। প্রতি ইউনিটে দুটি বেডরুম, একটি ডাইনিং রুম, দুটি বাথরুম এবং দুটি বারান্দা রয়েছে। সিঁড়িসহ লিফটের পজিশনও রয়েছে। একদম নিচতলায় গ্যারেজের জন্য জায়গা রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র দোতলায় দুটি ইউনিট সম্পন্ন হয়েছে। বাকি তলাগুলো খালি পড়ে আছে। কক্ষের দেয়াল তোলাসহ বাকি কাজ সম্পন্ন হয়নি।

গতকাল দুর্নীতির অভিযোগে তাদের গ্রেফতার দেখানো হলেও তাদের দুর্নীতির ধরন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে লেকহেড গ্রামার স্কুলের মালিক মো. খালেদ হাসান মতিনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার দেয়া তথ্য মতে বাকিদের গ্রেফতার করা হয়। বন্ধ থাকা লেকহেড স্কুলটি চালুর ব্যবস্থা করে দিতে শিক্ষামন্ত্রীর পিও এবং উচ্চমান সহকারী মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘যতদূর জানি সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি তাদের গ্রেফতার করেছে। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলে বোঝা যাবে তারা কতটুকু দোষী কিংবা কোনো অপরাধ করেছে কিনা।’

দুর্নীতির অভিযোগে একই মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রেফতারের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত সহকারী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী নাসিরকে কেন ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করেছে আমি জানি না। এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে অ্যাডমিনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা (গ্রেফতাররা) যদি অপরাধী হয় পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগামীকাল (মঙ্গলবার) সকালে তাদের দুজনকে আদালতে হাজির করা হবে।’

এআর/এমএইচএম/জেএইচ/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :