এগিয়ে চলা দুই নারী উদ্যোক্তার গল্প
‘সোনালি আশেঁর সোনার দেশ, পাটপণ্যের বাংলাদেশ’- এই প্রতিপাদ্যের প্রতিফলন ঘটেছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে। সেখানে চলছে পাটজাত পণ্যের মেলা। পরিবেশবান্ধব সব পাটজাত পণ্য নিয়ে উদ্যোক্তারা হাজির হয়েছেন। আছেন সাহসী নারী উদ্যোক্তারাও। মেলায় ৭৫টি স্টলে ১১২টি প্রতিষ্ঠান তাদের তৈরি করা পাটজাত পণ্য প্রদর্শন করছেন। চলছে বেচা-কেনাও। বাহারি সব রং আর ডিজাইনের তাক লাগানো পাটপণ্য দিয়ে সাজানো স্টলগুলোতে ব্যস্ত সময় কাটছিল বিক্রেতা- ক্রেতা-দর্শনার্থীদের। স্টলগুলো ঘুরে কথা হয় দুই নারী উদ্যোক্তা মোমেনা সুলতানা সালমা ও সারাবান তহুরার সঙ্গে। আলাপকালেই তারা শোনান নিজেদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প।
গল্পের মাঝেই তারা জানান, ‘নারী উদ্যোক্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনে রয়েছে নিজের পরিশ্রম এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। পথে পথে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে তাদের। তবে কখনই দমে যাননি তারা। অল্পকিছু পুঁজি আর উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পথচলা শুরু করে আজ নিজেরা হয়েছেন সফল। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন অন্য নারীদেরও।
মোমেনা সুলতানা সালমা :
‘আলিফ ইন্টারন্যাশনাল ফেব্রিক্স অ্যান্ড জুট প্রোডাক্টস’ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা মোমেনা সুলতানা সালমা। টাঙ্গাইলে বসবাস করেন তিনি। আর সেখান থেকেই পরিচালিত হয় তার ব্যবসা।
সালমা বলেন, অনেক শ্রম, নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আমি আজ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছি। উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টায় এখনও বিয়ে করিনি। প্রথমদিকে একটি এনজিওতে কাজ করতাম। ২০১৩ সালের দিকে মনে হলো আমার কিছু করা দরকার। সেই লক্ষ্যে হ্যান্ডিক্র্যাফট বানাতে শুরু করি, আগে থেকেই এসব কাজ কিছুটা পারতাম। তারপর অন্যদের পরামর্শে একটি প্রশিক্ষণ করে পাটজাত পণ্যের কাজ আরও ভালোভাবে শুরু করে দিই।
তিনি বলেন, প্রথমে নিজেই এসব কাজ করতাম পরে দুই-একজন নারীকে কাজ শিখিয়ে তাদের মাধ্যমে কাজ করতে থাকি। এরপর প্রথম মেলা করি যশোরে। প্রথম মেলাতেই ব্যাপক সাড়া পাই। এরপর কলকাতা, হংকং, মালয়েশিয়াতে মেলায় অংশ নেয়ার সুযোগ পাই। বর্তমানে পাটের তৈরি বিভিন্ন ধরনের শপিং ব্যাগ, লেডিস ব্যাগ, পিলো কভার, হ্যান্ডিক্র্যাফট, শো পিচসহ নানা পণ্য তৈরি করছি, যা বিদেশেও পাঠাই। বিদেশে আমাদের একটি বড় মার্কেট তৈরি হচ্ছে এই পাটজাত পণ্যের।
তিনি জানান, আমার ব্যবসা যখন আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করল তখন অল্প সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দিতে শুরু করি। বিশেষ করে দরিদ্র ঘরের শিক্ষিত মেয়েদের, যারা পড়ালেখার পাশাপাশি এসব কাজের সুযোগ পাবে। আমার চেষ্টা-ইচ্ছা আর পরিশ্রমের কারণে আজ অনেকটাই এগিয়ে আসতে পেরেছি। তিন-চার হাজার টাকা দিয়ে আমার ব্যবসা শুরু করেছিলাম। আজ টাঙ্গাইল কারখানা অফিস ছাড়াও ঢাকার মোহাম্মাদপুরে ফ্যাক্টরি অফিস করেছি। বর্তমানে এখানে ১৫ জন নারীর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে পেরেছি।
আমার তৈরি করা পাটজাত পণ্যর অর্ডার জার্মানি, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। তাদের চাহিদা মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে আমার ব্যবসার পরিসর আরও বড় করতে হবে। আামাদের দেশের অনেক নারীই ঘরে বসে থাকেন। তাদের এক একজনকে উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে হবে। তাহলেই আমরা নারীরা সমাজে মাথা উঁচু করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। আমি যেহেতু অল্প পুঁজি নিয়ে এতটুকু আসতে পেরেছি, অন্য নারীরাও চেষ্ট করলে পারবেন।
সারাবান তহুরা :
রাজধানীর আদাবরের মেয়ে সারাবান তহুরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে পড়ালেখা শেষ করেন। এরপর চাকরির জন্য চেষ্টা না করে শুরু করেন ব্যবসা। পাটজাত পণ্য নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘দ্যা সোর্স’ নামের প্রতিষ্ঠান। যদিও এই পাটজাত পণ্যের ব্যবসা শুরু করেছিলেন তার বাবা। আর এখন তিনি সেটারই হাল ধরেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে স্বামী-সংসার, দুই সন্তানের দায়িত্ব পালন করতে হলেও নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পিছিয়ে নেই তিনি।
সারাবান তহুরা বলেন, আমরা অনেক আইটেম নিয়ে কাজ করি। মূলত বাবা এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করলেও বাবার নানা ব্যস্ততার কারণে আমিই প্রতিষ্ঠানটি এখন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। বাবা বিদেশি অর্ডারগুলো দেখেন। আমাদের বিশেষ করে জাহাজের জন্য এমন পাটপণ্য আইটেম, কার্গো আইটেম, ক্রিসমাস আইটেম নিয়ে কাজ হত। পরবর্তীতে আমি আবার উদ্যোগ নিয়ে ব্যাগসহ আরও নানা আইটেম নিয়ে কাজ শুরু করি।
তিনি জানান, ২০১২ সালের পড়ালেখা শেষ করি। আর চাকরির জন্য চেষ্টা করিনি, স্বপ্ন দেখেছি একজন নারী উদ্যোক্তা হওয়ার। সেই লক্ষ্য পূরণে পরিশ্রমের পাশাপাশি আরও স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। এদিকে আমার ইঞ্জিনিয়ার জামাই আর দুই সন্তানের দিকে খেয়ালও রাখতে হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাধা- প্রতিবন্ধকতা এসেছে তবুও থেমে যাইনি। নতুন করে ব্যাগসহ নানা পাটজাত পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করি। পরিশ্রমের কারণে আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে থাকি। বর্তমানে ঢাকার আদাবর, ঢাকার বাইরে গাইবান্দা, খুলনা, গাজীপুরে আমার দ্যা সোর্স প্রতিষ্ঠানের জন্য পাটজাত দ্রব্য তৈরি হচ্ছে। যেখানে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল একজন উদ্যোক্তা হওয়ার। সেইসঙ্গে ব্যাপক পরিশ্রম আমাকে আজকের জায়গায় এনেছে। বলতে গেলে অনেকটাই শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম। তাই অন্য নারীদেরও উচিত হবে শুধু শুধু ঘরে বসে না থেকে সংসারের পাশাপাশি কিছু একটা করা। স্বপ্ন, সামান্য পুঁজি আর পরিশ্রম থাকলেই অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
এএস/জেডএ/আরআইপি