নেশাতেই ডুবে বাঁচি, জাগনা পেলেই মরি

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক দৌলতদিয়া যৌনপল্লী থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ০৮:৩৯ পিএম, ১৫ মে ২০১৮

চোখের নিচে যেটুকু কালি ভর করেছে, তা দীর্ঘ রাত জাগার ছাপ। কালির ওপর কালির লেপন। রাতের শুরুতে দেয়া কাজল মধ্যরাতেও সযতনে রয়েছে। বদনজুড়ে যে মায়া, তা মূলত ডাগর ডাগর চোখজোড়ার কারণে। হরিণ চোখের বাঁকা ভ্রুগুলোর ইশারা ভেতরের কথা মেলে ধরছে। অমন নেশা নেশা চোখ, তার ওপর মাদকের টান। গভীর ঘোরের চোখে, তবুও সিগারেট হাতে জেগে থাকা। অন্ধকার গলিতে সে চোখের দৃষ্টি কোনো পুরুষই এড়িয়ে যেতে পারছে না।

দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর প্রধান ফটক হয়ে খানিক পার হলেই খাজার ডেক (খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির নামে দরগা)। দরগা ঘেঁষেই জুয়ার আসর। খাবার হোটেল, ডিস্কো, দোকানগুলো মূলত এখানেই। যৌনকর্মীদের জটলাও ঠিক জায়গাটি ঘিরে।

পল্লীর কেন্দ্র থেকে দক্ষিণের গলিতে যেটুকু আলো, তা পুরো গলির আঁধার তাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। আলো-আঁধারের মাঝে এক খালার (যৌনপল্লীতে নারী দোকানিদের বিশেষ নাম) দোকানে বসে খদ্দেরের অপেক্ষা করছে ওরা। কারো হাতে সিগারেট, কারো হাতে চায়ের কাপ। গভীর রাতে খদ্দেরের টান পড়লে চা, সিগারেট আর নানা নেশাদ্রব্য সঙ্গী হয় ওদের। দোলার (ছদ্মনাম) হাতেও গাঁজার স্টিক জ্বলছে। খানিক আগে ইয়াবাও সেবন করে এসেছে সঙ্গী নিয়ে।

বয়স ভাটা পড়ছে আর নেশাতেও টান বাড়ছে দোলার। চায়ের দোকানে বসে খানিক আলাপ। আলাপ না ফুরাতেই ফের নেশার টান। ঘরে গিয়ে মদের পিয়ালায় চুমুক আর গাঁজার স্টিকে আগুন লাগাতে লাগাতে জীবনের গল্পকথা মেলে ধরলেন এ যৌনকর্মী।

শেরপুরের ললিতাবাড়িতে কৃষক পরিবারে জন্ম নেয়া দোলার স্বপ্নআলো যেন অঙ্কুরেই নিভে যায়। নয় মাস বয়সে মাকে হারিয়ে দুঃখ-সাগরে ভাসা শুরু। দোলার দেখভালের জন্য বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু সেই সৎ মা জীবনের সুখতারা চিরতরে নিভিয়ে দেন। নির্যাতন আর অনাহারের মধ্যে শুরু হয় দোলার বেড়ে ওঠা।

শৈশবের আভা না কাটতেই ঢাকায় বুয়ার কাজ করাতে অন্যের হাতে তুলে দেয়া হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আর আসা হয়নি দোলার। পাচারকারী চক্রটি তাকে বিক্রি করে দেয় নারায়ণগঞ্জের টানবাজার যৌনপল্লীতে। নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকার গলিতে তার ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা।

নব্বইয়ের দশকের কথা। সরদারের চাপে ১৯৯৪ সালে দূরন্ত কৈশোর পার না হতেই নাম লেখাতে হয় যৌনপেশায়। রূপের মোহ আর অল্পবয়সী হওয়ায় টানবাজারে দোলার নাম ছড়িয়ে পড়ে রাতারাতি। খদ্দেরে ভরপুর থাকত দোলার ঘর। খদ্দের আর অর্থ পেয়ে ভুলতে থাকেন জীবনের স্বপ্নকথা।

কিন্তু চাইলেই কি স্বপ্ন থেকে দূরে থাকা যায়! সমাজ, সংসারে ঘর বাঁধতে প্রেমে পড়েন ওই সময়ে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এক যুবলীগ নেতার। যুবলীগের ওই নেতা দোলার নিয়মিত খদ্দেরও ছিলেন। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গতর খাটানো প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে সে। প্রেমিক আর টাকা হারিয়ে তখন পাগলপ্রায় দোলা। বাঁচার তাগিদে ফের খদ্দেরে হাত মেলাতে থাকেন।

১৯৯৯ সালে টানবাজার যৌনপল্লী উচ্ছেদের পর ব্যবসায় ভাটা পড়ে। সরদারের হাত ধরে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে পাড়ি জমান ২০০১ সালে। এ পল্লীতেই ১৭ বছর কেটে যায় দোলার।

এখন শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে নয়, গতর খাটান নেশার টাকা যোগাতেও। পল্লীর গলিপথে রাতভর চেয়ে থাকা খদ্দেরের আশায়। প্রতিদিন ৩০০ টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে যা থাকে, তার প্রায় সবই চলে যায় নেশায়।

‘প্রেমিক হারিয়ে সেই যে নেশা ধরলাম, তা আর ছাড়া হলো না। পল্লীর মধ্যে সব নেশাতেই টান এখন। নেশাতেই ডুবে বাঁচি, জাগনা পেলেই মরি’- বলেন দোলা।

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে মন চায় কিনা- জানতে চাইলে দোলা বলেন, ‘আর হবে না রে…। কে দেবে আমায় ঠাঁই? কে দেবে নেশার টাকা? রূপ থাকতেই তো ঘর বাঁধতে পারলাম না। এখন তো শরীরের সবই গেছে। হয়ত এই পল্লীই হবে শেষ ঠিকানা।’

জীবনের গল্প বলা না ফুরাতেই ভোরের আভা মিলছে তখন। গলা ধরে আসছিল এ বেলায়। কথাও আর সরছিল না। দু’চোখ ভরে গেল দুঃখের জলে। সে জল কখন গড়িয়ে গড়িয়ে মাটিতে পড়ল, তা টেরও পেল না দোলা। যখন টের পেল, তখন চোখে-মুখে কাপড় গুঁজে পাশ ফিরে নিজেকে আড়াল করতে চাইল সে।

এএসএস/এমএআর/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :