দুর্বল তদন্তে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৪৮ পিএম, ৩০ জুলাই ২০১৮

বর্তমান বিশ্ব তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর। বাংলাদেশও এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একুশ শতকে বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকারও।

বাংলাদেশ এখন অনেকটাই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ যুগে অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে। অপরাধ রুখতে করা হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি)। এ আইনে মামলাও হচ্ছে বেশ।

বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত (২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই) তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ১৪২৬টি মামলা বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে এসেছে। এর মধ্যে সাজা হয়েছে মাত্র ১৮টি মামলার আসামির। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ২২০টি মামলায় আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধ তদন্তে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তির। কিন্তু সে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ না থাকা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে 'দায়সারা গোছের' তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।

আইসিটি মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ফরেনসিক রিপোর্ট, ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস, প্রকাশিত বিষয়ের ইউআরএল ও ঘটনার আলামত। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তারা অধিকাংশ সময় এগুলো বাদ দিয়ে দায়সারা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের (অভিযোগ গঠন) কোনো উপদানই খুঁজে পান না ট্রাইব্যুনাল। উপাদান খুঁজে না পাওয়ায় তাদের দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত (২০১৮ সালের ২৬ জুলাই) ৪৮৯টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ১৩১টি মামলায় আসামিদের চার্জ গঠনের সময় অব্যাহতি প্রদান করা হয়।

অধিকাংশ আদেশে বিচারক উল্লেখ করেন, ‘মামলায় কোনো আলামত জব্দ করা হয়নি। মানহানিকর বক্তব্য বা অশ্লীল ছবি কোন ওয়েবসাইট বা ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে প্রচার বা প্রকাশ করা হয়েছে তার বর্ণনা দেয়া হয়নি। আইটি ফরেনসিক রিপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা দাখিল করেননি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় এসব বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো না থাকায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা সম্ভব নয়। তাই তাদের অব্যাহতি প্রদান করা হলো।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিটি আইনের অধিকাংশ অপরাধ সংঘটিত হয় ফেসবুক, গুগল ও টুইটারের মাধ্যমে। বেশির ভাগ সময় তদন্তকালে তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তদন্তকারী কর্মকর্তারা এ নতুন আইনের বিষয়ে তেমন অভিজ্ঞও নন। তাই তদন্তে ঘাটতি থেকে যায়। তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রযুক্তির বিষয়ে আরও বেশি প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন তারা।

অব্যাহতি-১

মিরপুর আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও মোহনা টেলিভিশনের চেয়ারম্যান কামাল মজুমদারের ছবি এডিট করে ভিডিও সিডি তৈরি করেন রোকাইয়া আফরোজ বাপ্পি ও সাদ্দাম হোসেন হৃদয়। পরবর্তীতে কামাল মজুমদারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করা হয়। অন্যথায় ওই সিডির কপি অন্যত্র সরবরাহ করে কামাল মজুমদারকে সমাজে হেয় করা হবে বলে হুমকি প্রদান করা হয়।

এমন অভিযোগে ২০১৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর মোজাম্মেল হক মজুমদার বাদী হয়ে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ (২) ধারায় মামলা করেন। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের প্রার্থনা করেন।

অপরদিকে আসামি রোকাইয়া আফরোজ বাপ্পির আইনজীবী তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করার মতো কোনো উপাদান না থাকায় ফৌজদারি কার্যবিধি ২৬৫ (গ) ধারায় অব্যাহতির আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক বাপ্পি ও সাদ্দাম হোসেন হৃদয়ের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর ৫৭ (২) ধারায় অভিযোগ গঠনের মতো উপাদান বিদ্যমান না থাকায় অব্যাহতি প্রদান করেন।

বিচারক আদেশে উল্লেখ করেন, ‘মামলায় কোনো আলামত জব্দ করা হয়নি। কোনো মানহানিকর বক্তব্য বা অশ্লীল ছবি কোনো ওয়েবসাইট বা ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে প্রচার বা প্রকাশ করা হয়নি। যে মোবাইল নম্বর থেকে চেয়ারম্যান কামাল মজুমদারকে হুমকি দেয়া হয়েছে তা ফরেনসিক আইটি এক্সপার্ট দ্বারা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়নি।’

অব্যাহতি-২

মেয়েদের জিন্স ও শাড়ি পরা নিয়ে নাটোর জেলার কানাইখালী গ্রামের তাসনুভা রহমান ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তার ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি একই গ্রামের শামীমা সুলতানা সুমির ছবি এডিট করে ব্যবহার করেন। এতে সামাজিকভাবে ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে- এমন অভিযোগ এনে সুমির বন্ধু সাঈম হোসেন বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর ৫৭ (২) ধারায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় শিক্ষিকা তাসনুভা রহমানকে।

২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল নাটোর সদর থানার উপ-পরিদর্শক এস এম আবু সাদাদ আসামি তাসনুভা রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি তাসনুভা রহমান আইনজীবীর মাধ্যমে ২৬৫ ধারায় ডিসচার্জের (অব্যাহতি) আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।

আদেশে বিচারক বলেন, ‘মামলার আসামি তাসনুভা রহমান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে কোনো অপরাধ করেননি। মামলার বাদী ঘটনাস্থলের কোনো ব্যক্তি নন। জব্দকৃত মোবাইলের মালিকানা বর্ণনা করা হয়নি। যে পোস্টটি করা হয়েছে তা মানহানিকর নয়। এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তা আইটি ফরেনসিক রিপোর্ট দাখিল করেননি।’

এ বিষয়ে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. নাজমুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলার অপরাধসমূহ গুগল, ফেসবুক, টুইটার ও ইন্টারনেট ভিত্তিক হয়ে থাকে। তদন্তকালে গুগল, ফেসবুক ও টুইটারের কাছে তথ্য চাওয়া হলে তারা অনেক সময় তা দেয় না। তথ্য আদান-প্রদানে যেহেতু তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তি নেই সেহেতু তথ্য প্রদানে তারা বাধ্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইনটি নতুন। নতুন আইন হওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তারা অনেক বিষয় জানেন না। তাদের প্রযুক্তির বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মামলাগুলো তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালাও তৈরি করা সম্ভব হয়নি।’

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সোহেলী ফেরদৌস জাগো নিউজকে বলেন, ‘মামলাগুলো তদন্তের ক্ষেত্রে যে প্রযুক্তির দরকার, তার ধারেকাছেও আমরা নেই। প্রযুক্তিগত বিষয়ে আমরা অনেক দুর্বল। এছাড়া যারা মামলাগুলো তদন্ত করেন তাদের প্রশিক্ষণেরও অভাব রয়েছে। এ কারণে যথাযথ তদন্তে সমস্যা হচ্ছে।’

‘আমরা চেষ্টা করছি প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা গড়ে তোলার’- যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলাগুলো প্রযুক্তিনির্ভর। প্রযুক্তির বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’

আইনজীবী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আইসিটি আইনের মামলাসমূহ তদন্তে কর্মকর্তাদের দুর্বলতা রয়েছে। এ বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাহলে চার্জশিট দেয়ার পর আসামিদের অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।’

জেএ/এমএআর/আরআইপি