নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি খালেদা জিয়া?

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:০৯ পিএম, ১২ নভেম্বর ২০১৮

দুর্নীতির দুই মামলায় ১৭ বছরের সাজা নিয়ে আগামী নির্বাচনে অযোগ্য হতে পারেন- এমন শঙ্কার মধ্যেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তিনটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। ফেনী-১ আসন থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষে প্রথম মনোনয়নপত্রটি সংগ্রহ করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বগুড়া-৬ আসন থেকে এবং মির্জা আব্বাস বগুড়া-৭ আসন থেকে খালেদা জিয়ার পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।

আরও পড়ুন >> খালেদার জন্য তিনটি আসন

মামলা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতির দুই মামলায় সাজা পাওয়া বিএনপি চেয়ারপারসনের আপিলসহ আইনি সব প্রক্রিয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

গত ৮ নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ বিভিন্ন জোট ও দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার সকালে কমিশন সভা করে ভোট পিছিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোটের তারিখ ধরে ঘোষিত পুনঃতফসিলে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৮ নভেম্বর, বাছাই ২ ডিসেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ৯ ডিসেম্বর।

দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর বিএনপি চেয়ারপারসন আদৌ কি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন- এমন প্রশ্ন এখন অনেকের মুখে মুখে। কারণ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন উচ্চ আদালত। অপরদিকে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সাজা দিয়েছেন নিম্ন আদালত।

নির্বাচনে যদি অংশগ্রহণ করতেই হয় তাহলে সেটা কোন পন্থায়- এ নিয়ে আইনজ্ঞদের কাছ থেকে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। সাজা হওয়ার পরও নির্বাচনে অংশগ্রহণের নজির ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেই আছে। অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, কোনোভাবেই খালেদা জিয়ার নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন >> ঐক্য নিয়ে এগিয়ে যেতে বললেন খালেদা

বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দাবি, নির্বাচন পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে নানামুখী আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত রাখতে চায় সরকার। তাই তড়িঘড়ি করে আদালতের মাধ্যমে মিথ্যা মামলায় তাকে সাজা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমন বক্তব্যের পাল্টা জবাবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, অপরাধের কারণে আদালত তাকে সাজা দিয়েছেন। এর সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

দুর্নীতির দুই মামলায় সাজা হওয়ার পরও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আরও তিন মামলা বিচারাধীন। এসব মামলার বাদীও দুদক। সব মামলাই এক-এগারোর সময় দায়ের করা। এর বাইরে বর্তমান সরকারের আমলে নাশকতাসহ আরও কয়েক ডজন মামলা রয়েছে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না- সোমবার নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলামের কাছে এমন প্রশ্ন রাখেন সাংবাদিকরা। জবাবে তিনি বলেন, ‘সেই সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা।’ তিনি বলেন, ‘মনোনয়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রিটার্নিং কর্মকর্তার। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেকোনো প্রার্থী কমিশনে আপিল করতে পারবেন।’

গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা সম্পর্কে বলা আছে যে, ‘কোনো ব্যক্তি কোনো আদালতে দুই বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন।’

তবে, আদালতের এমন রায়ের বিরুদ্ধে কেউ উচ্চ আদালতে আপিল করলে সেই ব্যক্তি নির্বাচন করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে আইনে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।

গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জমা হওয়া মনোনয়নপত্র বৈধ কি অবৈধ, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার রিটার্নিং কর্মকর্তার। রিটার্নিং কর্মকর্তা কারো মনোনয়নপত্র অবৈধ বলে বাতিল করলে তার বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ইসিতে আপিল করতে পারবেন। কমিশন সেই আবেদন বাতিল করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, কমিশন সে অনুযায়ী কাজ করবে।

আরও পড়ুন >> খালেদা নয় জোবাইদা

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নির্বাচন কমিশন (ইসির) ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার ড. মোহাম্মদ ইয়াসীন খান জাগো নিউজের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে, দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছি, খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। সাজা থেকে খালাস না পেলে উনি নির্বাচন করত পারবেন না। বিষয়টি সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (গ) ধারায় উল্লেখ আছে।’

এ বিষয়ে বিএনপি নেতা ও সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী কারও দুই বছর বা ততধিক সাজা হলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারাবেন। কিন্তু আদালত যদি সেই সাজা স্থগিত করেন তাহলে তার নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা থাকবে না। এ নজির ভারতসহ উপমহাদেশের অনেক দেশেই আছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অনেকেই সাজা মাথায় নিয়ে নির্বাচন করেছেন। ম্যাডামের পক্ষে আমরা আবেদন করবো এবং ইনশাআল্লাহ তিনিও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।’

৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে তা সম্ভব কি না- এর জবাবে তিনি বলেন, ‘একদিনের মধ্যেই সম্ভব। দরখাস্ত দিলে একদিনেই আদালত সাজা স্থগিত করতে পারেন। এ জন্য বেশি সময়ের প্রয়োজন নাই।’

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, “এখন যে অবস্থা, উনি (খালেদা জিয়া) যেহেতু সাজাপ্রাপ্ত, সেহেতু তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য। এটা সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে আছে, ‘নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষীসাব্যস্ত হইয়া অন্যূন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে তাহলে তিনি নির্বাচনের যোগ্য হইবে না।’ এটা হলো সংবিধানের বিধান।”

আরও পড়ুন >> নির্বাচন করবেন না ড. কামাল

তিনি আরও বলেন, ‘এখন প্রশ্ন হলো, উনি (খালেদা জিয়া) একটাতে ১০ বছর এবং আরেকটাতে সাত বছর সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনি আপিল করার সুযোগ পেলেও আপিল শুনানি করে নির্দোষ প্রমাণের বিষয়টি তো সময়সাপেক্ষ। কাজেই এই পরিস্থিতিতে সংবিধানে যে বিধান আছে তাতে তিনি অযোগ্য হবেন। ফলে নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি পারবেন বলে আমার মনে হয় না।’

‘দরখাস্ত দিলে একদিনেই আদালত সাজা স্থগিত করতে পারেন’- খন্দকার মাহবুবের এই বক্তব্যের জবাবে শফিক আহমেদ বলেন, ‘আপিল করলেই তো হবে না। ধরেন উনি আপিল করলেন, আপিলের শুনানি কবে হবে? সার্টিফাইড কপি নিতে হবে। এরপর আবার আপিল বিভাগ আছে। এই অল্পসময়ের মধ্যে এতগুলো স্টেজ অতিক্রম করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা; আমার মনে হয় অসম্ভব ব্যাপার। সে জন্য উনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।’

এফএইচ/এমএআর/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :