সুদ দিচ্ছে পদ্মা অয়েল, লাভ খাচ্ছে বিমান!

রফিক মজুমদার
রফিক মজুমদার রফিক মজুমদার , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:০১ পিএম, ২১ জানুয়ারি ২০১৯

বিমানে ফুয়েল (জ্বালানি তেল) সরবরাহের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের সুদ ও আসল নিয়মিত পরিশোধ করছে পদ্মা অয়েল। তবে বাকিতে নেয়া ফুয়েল পুড়িয়ে যে লাভ হচ্ছে তা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে খাচ্ছেন বাংলাদেশ বিমানের স্থায়ী চাকরিজীবীরা!

বিমান সূত্রে জানা যায়, জেট ফুয়েলের দুই হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) কাছে বাকি রেখেই মুনাফা ভাগ করে নিচ্ছেন বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিগত অর্থবছরের মুনাফা হয়েছে এমন তথ্য প্রকাশের পর ৬২ হাজার ৯৮৮ টাকা হারে বিমানের সব পদের স্থায়ী জনবলের মধ্যে বণ্টনের সিদ্ধান্ত হয়। ইতোমধ্যে ৩০ হাজার টাকা করে বিতরণ হয়েছে। বাকি টাকা শিগগিরই বিতরণ হবে বলে জানা গেছে।

এদিকে বিমানের কাছে বাকিতে জেট ফুয়েল বিক্রির পরিবর্তে নগদে সরবরাহ এবং পুরনো বকেয়া আদায়ে কঠোর হচ্ছে বিপিসি। এর অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে নগদ মূল্যে তেল ক্রয়ের জন্য বিমানকে চিঠি দিয়েছে বিপিসি।

চিঠিতে বলা হয়েছে, গত অক্টোবর পর্যন্ত বিমানের কাছে বিপিসির পাওনা এক হাজার ৯৪৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এ পাওনা পরিশোধ এবং চলতি জানুয়ারি থেকে নগদ মূল্যে জেট ফুয়েল সংগ্রহে বিমানকে নির্দেশনা দিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।

বিপিসি জানায়, দীর্ঘদিন বিমানের কাছে বাকিতে জেট ফুয়েল সরবরাহ করলেও বকেয়ার পরিমাণ বাড়তে থাকায় জানুয়ারি থেকে আর বাকিতে বিক্রি করা হবে না।

পদ্মা অয়েল সূত্র জানায়, বকেয়া পরিশোধ করতে হলে প্রতি মাসের জ্বালানি তেল ক্রয়ের প্রায় ৫০ কোটি টাকার পাশাপাশি অতিরিক্ত ৩৪ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা দিতে হবে বিমানকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদ্মা অয়েলের হিসাব শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, বিমানে সরবরাহের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফুয়েল দিচ্ছে পদ্মা অয়েল। বিমান বাকিতে ফুয়েল নিলেও টাকা পরিশোধ না করায় সুদ ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে পদ্মা অয়েলকে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিমানের কাছে পদ্মা অয়েলের বকেয়া ছিল এক হাজার ৯৪৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। গত তিন মাসে বকেয়ার পরিমাণ বেড়েছে আরও প্রায় পঞ্চাশ কোটি টাকার কাছাকাছি। বকেয়া পরিশোধ না করা ও প্রতি বছর বকেয়ার পরিমাণ বাড়তে থাকায় ২০১৬ সালেও বিমানকে সতর্ক করেছিল পদ্মা অয়েল ও বিপিসি। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে বিমানের জ্বালানি কেনার অর্থ না থাকায় বিশেষ বিবেচনায় রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইনসটিকে জেট ফুয়েল সরবরাহ করে পদ্মা।

২০১০ সালের মাঝামাঝি থেকে বিমানকে বিভিন্ন দফায় জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও এর সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করেনি বিমান। বকেয়া পরিশোধে ২০১৬ সালের পর থেকে কয়েক দফায় তাগিদ দেয়া হলেও তাতে সাড়া দেয়নি বিমান কর্তৃপক্ষ।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অর্থ বিভাগের নিয়ন্ত্রক মনজুর ইমাম এ প্রসঙ্গে বলেন, বিমান মাসে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার জেট ফুয়েল বিপিসির কাছ থেকে নেয়। এর বিপরীতে প্রতি মাসে ১৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে আসছে। বিপিসি থেকে যে পরিমাণ ফুয়েল বিমান নেয় তার এক চতুর্থাংশের মতো টাকা পরিশোধ করছে বিমান।

নগদ অর্থে ফুয়েল ক্রয় করলে লাভ হতো কিনা এবং তখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লভ্যাংশ দেয়া যেত কিনা- এমন প্রশ্নে মনজুর ইমাম বলেন, লেবার ‘ল’ অনুযায়ী সব কিছু হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।

বাকিতে ফুয়েল নিয়ে কীভাবে লাভ নির্ণয় করা হয়- জানতে চাইলে বিমানের মুখপাত্র শাকিল মেরাজ বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যেহেতু রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি তাই এখানে কোম্পানি আইনের সবকিছু মেনেই করা হয়। মন্ত্রণালয়, বিমান বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মিলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

এ বিষয়ে বিপিসি চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিমানকে আর বাকিতে জেট ফুয়েল দেব না। অনেক দিন ধরে বলে আসার পর গত ১০ জানুয়ারি থেকে তারা নগদ অর্থে জেট ফুয়েল নিতে শুরু করেছেন।’

প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বাকির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুই হাজার কোটি টাকা বিমান কীভাবে শোধ করবে সেই প্রক্রিয়া বের করতে বিপিসির একজন পরিচালককে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ মতে বকেয়া আদায়ের প্রক্রিয়া নির্ধারণ হবে।’

এ বিষয়ে কমিটির প্রধান বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মো. সরওয়ার আলম বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। বিমান কোন প্রক্রিয়ায় বকেয়া পরিশোধ করবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আশা করছি সামনের সপ্তাহে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারব।’

উল্লেখ্য, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে জেট ফুয়েল সরবরাহ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। দুটিই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিপিসির কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বাকিতে জ্বালানি সংগ্রহের সুবিধা নিয়ে আসছে বিমান।

আরএম/এএইচ/এমএআর/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :