বাংলাদেশের নারীরা এখন অপ্রতিরোধ্য

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০১ পিএম, ০৭ মার্চ ২০১৯

রুবানা হক। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী। প্রতিযোগিতা করছেন তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বিজিএমই’র পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে সভাপতি পদে।

বিশ্ব নারী দিবস নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজের। ‘অগ্রযাত্রার বাংলাদেশ’যে উন্নয়নের গল্প বলে সেখানে নারীরও হাজার গল্প আছে বলে উল্লেখ করেন। নারীর ক্ষমতায়নে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বিশ্বে নজির স্থাপন করেছে বলে মনে করেন এ উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, নারীর বাধা নারীও। বৈষম্য কমিয়ে আনতে নারীকেই মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে বলে মত দেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলে। নারীর এগিয়ে যাওয়া নিয়ে কী বলবেন?

রুবানা হক : বাংলাদেশ এখন যে উন্নয়নের গল্প বলছে, তাতে নারীর এগিয়ে যাওয়ার গল্পও আছে। বাংলাদেশের নারীরা এখন অপ্রতিরোধ্য। নারীর সফলতা এখন ঘরে ঘরে। ঘরে ঘরে নারী উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। বিশ্ব সংস্থাগুলো আমাদের নারীর উন্নয়নে প্রশংসা করছে। প্রচলিত রীতিনীতি ঠিক রেখে আমাদের নারীর এগিয়ে যাওয়া বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

জাগো নিউজ : নারীর এগিয়ে যাওয়ার গল্পের পাশে বৈষম্যের গল্পও আছে। প্রতিকূলতার কাঁটাতারে এখনও নারী।

রুবানা হক : নারীর প্রতি বৈষম্য গোটা দুনিয়াজুড়েই। নারীর জন্মই হয়েছে যেন, শত প্রতিবন্ধকতা ঘিরে।

তবে নারীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ‘প্রতিকূলতার অজুহাত’ বন্ধ করতে হবে। হাজার বছরেও এই প্রতিবন্ধকতা শতভাগ দূর করা যাবে না। এসব বলে কোনো লাভ নেই।

পরিবার চাইছে না, স্বামী চাইছে না এসব এখন পুরানো কথা। মনে রাখতে হবে আমার এগিয়ে যাওয়া হয়তো কেউই চাইবে না। তাই বলে তো ঘরে বসে থাকতে পারি না। মানুষ চাইলে নিজে নিজেকে ক্ষমতায়িত করতে পারেন। সে মনোবল, দৃঢ়তা থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাস থাকলেই কেবল অবিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। তখন কেউ আর দাবিয়ে রাখতে পারবে না।

জাগো নিউজ : আত্মবিশ্বাস থাকার পরও তো অনেকেই ঝরে যায়?

রুবানা হক : এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে নারীরা নারীর পাশে দাঁড়ায় না। পুরুষ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হলেই চলবে না। নারীকেও নারীর পাশে দাঁড়াতে হবে।

জাগো নিউজ : তার মানে নারীর শত্রু নারীও

রুবানা হক : পুরো সমাজকেই বদলাতে হবে। পুরুষের চিন্তা বদলিয়ে পুরো সমাজে সমতা আসবে না। একজন নারী আমার পাশে এসে দাঁড়াবে এ আশা সবসময়ই আমি করতে পারি। নারীরা তো এখন পাশে দাঁড়িয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।

জাগো নিউজ : ক্ষমতায়নের কথা বলছেন। কর্তৃত্বের প্রশ্নে নারীরাও পুরুষের সমকক্ষ কেউ কেউ। তার মানে ক্ষমতা পেলে নারীর ওপরেও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ভর করে!

রুবানা হক : কর্তৃত্ব বিষয়টিই ঠিক আলাদা। সব দোষ পুরুষতান্ত্রিকতার ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেকে রক্ষা করা যায় না। যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তারা আসলে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে চায় না। সেটা পুরুষও হতে পারে নারীও হতে পারে। প্রতিটি মানুষের চত্রিরই তো আলাদা। এটি আপেক্ষিক ব্যাপার। সবার ক্ষেত্রেই এমন হয় বলে আমি বিশ্বাস করি না। ঈর্ষাকাতরতা মানুষের ভালো গুণ ধ্বংস করে। আর এটি উভয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে।

জাগো নিউজ : বিজিএমইএ’র নির্বাচনে সভাপতি পদে অংশ নিচ্ছেন। জয়ের ব্যাপারে কতটুকু আশবাদী?

রুবানা হক : আমরা পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিয়েছে। আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। আমরা মোট ৩৫ জন বোর্ডে আছি। আমাদের বিপক্ষের গ্রুপ মাত্র ১৭ জনের প্যানেল দিয়েছে। আমরা এমনিতেই এগিয়ে আছি।

জাগো নিউজ : নারী উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে কী বলবেন?

রুবানা হক : দেখুন, এখন ঘরে ঘরে হস্তশিল্পের কাজ হচ্ছে। আমি মনে করি এসব নারীদের কাজগুলোকে রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা জরুরি। আমার মনে হয় বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার সময় আর নেই। সমন্বয় করা জরুরি। ভারত কিন্তু এখন তাই করছে।

জাগো নিউজ : এক্ষেত্রে তো রাষ্ট্র বা ব্যবসায়ী সংগঠনের দায়িত্বেই বেশি।

রুবানা হক : অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। ভারত পারলে আমরা কেন পারব না। আমি মনে করি, আরও সহজ শর্তে নারীকে ব্যাংক ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকেই ঋণ চাইছে। কিন্তু পাচ্ছে না। এটি উদ্যোক্তাদের হতাশ করছে।

আমি মনে করি, বিশেষ ব্যবস্থার সময় এসেছে, যাতে করে নারীরা সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারেন। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারেন।

মনিটরিং করেই নারী ব্যবসায়ীদের সংঘবদ্ধ করতে হবে। দশ নারী আলাদা আলাদা করে বাড়িতে বসে নকশী কাথা সেলাই করছেন। তাদের কাজগুলো যদি এক জায়গায় করা হয়, তাহলে কিন্তু সহজেই সেগুলোর বাজারজাত করতে পারবেন।

আমি মনে করি, নারীর অনেক কিছুই করার আছে। নারীর কাজগুলো ব্যাপকহারে দৃশ্যমান করে তোলা সময়ের দাবি বলে মনে করছি। এর কোনো বিকল্প নেই।

সরকারের সহযোগিতা এবং নারীর উদ্যোগী মানসিকতা থাকলেই বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে। আর এক্ষেত্রে একটি ভিশন পেপার তৈরি করা জরুরি, যার মধ্য দিয়ে নারী উন্নয়নের মূল সড়কে হাঁটতে পারবেন।

জাগো নিউজ : এক্ষেত্রে নারী শিক্ষা...

রুবানা হক : বাংলাদেশে নারী শিক্ষায় ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। তবে গুণগত পরিবর্তন আনতে শিক্ষার মান আরও বাড়ানো দরকার।

আজ চীন অর্থনীতিতে সারাবিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে সে দেশে নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের কারণে। চীনে এখন লাখ লাখ নারী উদ্যোক্তা, সব সম্ভব হয়েছে নারী শিক্ষার উন্নয়নের ফলে।

এএসএস/এনডিএস/পিআর