জনকল্যাণ আমার চ্যারিটি নয়, আমি বাধ্য

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৯ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, এমপি। সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। জাতীয় সংসদের হুইপ। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শিষ্টাচার নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘লোক দেখানো’ আয়োজনের সমালোচনা করে বলেন, ‘রাজনীতির অপসংস্কৃতি কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। শোভাযাত্রা, পোস্টার বা বিলবোর্ডে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় না। জনপ্রিয়তা পেতে হলে মানুষের হৃদয়ে ছবি আঁকতে হয়।

জনকল্যাণ নিশ্চিত করা সংসদ সদস্যদের সেবামূলক কাজ নয়, মূলত ‘বাধ্যতামূলক কাজ’ বলে মতামত ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : সম্প্রতি রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে মন্তব্য করেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তোষামোদের রাজনীতি সর্বত্রই। কোন উপলব্ধি থেকে আপনার এমন মন্তব্য?

আল মাহমুদ স্বপন : শিক্ষাকাল দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত। আমি নিজেও একজন রাজনৈতিক কর্মী। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি ভুল করি না, তা আমি বিশ্বাস করি না। প্রতিনিয়ত মানুষের কাছ থেকে, সমাজ থেকে, আমার নেতার কাছ থেকে কিছু শিখতে চেষ্টা করি।

গত এক দশক হলো আমি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছি। দীর্ঘ সময় ধরে জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি একাধারে আমাদের নেতা ও শিক্ষক। আমরা তার ছাত্র। তার জনকল্যাণমুখী আদর্শ প্রতিনিয়ত আমাদের প্রভাবিত করে। আমরা তার চেতনা ধারণের চেষ্টা করি। এমন কোনো দিন নেই আমরা তার কাছ থেকে শিখছি না।

জাগো নিউজ : শিখছেন বটে। কিন্তু আপনিও তো মোটরসাইকেল মহড়া বা সেলফির রাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। এখন ভিন্ন পথে হাঁটছেন কেন?

আল মাহমুদ স্বপন : হ্যাঁ, আমি নিজেও এমন রাজনীতির অভ্যস্ত ছিলাম। ২০০৬ সালে আমি আমার নিজ এলাকা রেখে জেলার আরেকটি আসনে দলের মনোনয়ন পাই। আমার নিজ আসনের মতো তখন ওই এলাকায় গণসংযোগ ছিল না। রাজনীতির কৌশল হিসেবে সেখানে প্রথম দিনই আমাকে বড় ধরনের একটি শো-ডাউন দিতে হয়েছে। তখন নিষেধাজ্ঞা ছিল না। কিন্তু ১/১১-এর পর শো-ডাউনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসে। আমি এরপর সে নিষোধাজ্ঞা পালনের চেষ্টা করি।

abu-sopon-02.jpg

২০০৯ সালে আমি যখন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হই, এর পরদিন এলাকায় যাই। বিশাল এক শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে আমাকে বরণ করা হয়। আমার বলতে দ্বিধা নেই, ওই শোভাযাত্রা যতটা না স্বতস্ফূর্ত ছিল, তার চেয়ে মেকিং (কৃত্রিম) বেশি ছিল। আমি এটি সজ্ঞানে স্বীকার করছি। সেখানে ভয়ঙ্কর একটি অভিজ্ঞতাও হয়। ওই শোভাযাত্রায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একজন কর্মী পঙ্গু হয়ে যান। আমি আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে দিতে পারিনি তাকে। যতবার এলাকায় গিয়ে বটতলী বাজারে যাই, ততবারই ওই ছেলে আমার সামনে আসে। আমি ওকে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। অনুশোচনা হয়।

জাগো নিউজ : তার মানে সেই দুর্ঘটনা থেকেই ...

আল মাহমুদ স্বপন : আমি গত দশ বছর দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি, এ ধরনের শোভাযাত্রা সাধারণ মানুষ পছন্দ করে না। মানুষ রীতিমতো বিরক্ত। ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার সামান্য প্রকাশ করলেই মানুষ নেতিবাচকভাবে দেখে। দম্ভ বা অহংকার হিসেবে দেখে। বিরোধী দলে থাকলে শোভাযাত্রা বা মহড়া নিয়ে মানুষ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায় না। জনপ্রিয় হিসেবে মূল্যায়ন করে। কিন্তু একই মানুষ ক্ষমতায় গিয়ে সামান্য মহড়ার আয়োজন করলেই ক্ষমতার দম্ভ হিসেবে দেখা হয়। ব্যক্তির অবস্থান পরিবর্তন মানুষের চিন্তার পরিবর্তন ঘটায়।

একবার পারিবারিক একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য এক জায়গায় যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি মোটরসাইকেলের বহর আমার গাড়ির সামনে চলে আসে। রাস্তার সব গাড়ি সরিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমার গাড়িটিও সড়কের পাশে পার্কিং করে দাঁড়াল। পরে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলাম, কে গেল? বললেন, অমুক উপজেলা নেতা। খুব পরিচিত নয়। মানুষ যে বিরক্ত তা সহজেই বুঝতে পারলাম।

ভাবলাম, আমার মহড়া নিয়েও তো মানুষ এমন বিরক্ত হয়। আমি প্রতিনিয়ত সমাজ নিয়ে স্ট্যাডি করি। আমি দেখেছি, যে দলই ক্ষমতায় আসুক কিছু কিছু নেতা বারবার নির্বাচিত হন। আমার আগ্রহ ছিল, কেন মানুষ তাদের বারবার ভোট দেয়? আমি ওই সব এলাকায় জরিপ চালিয়েছি।

আমি দেখেছি, তাদের রাজনীতির মধ্যে মহড়া, সেলফির সংস্কৃতি নেই। আচরণে ক্ষমতার দাপট নেই। পোস্টারে ছবি লাগানোর রীতি নেই। আমি তাদের রাজনৈতিক জীবন থেকে জেনেছি, আমি এমপি, আমি জনগণের চাকর। আমি যখন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছি, তখন জনগণের প্রতি আমার কিছু কমিটমেন্ট (প্রতিশ্রুতি) দাঁড়িয়ে যায়। জনগণকে বিরক্ত না করা তেমনই এক কমিটমেন্ট। জন-অর্থ সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করি। আমি জনগণকে সেবা দিতে বাধ্য। কারণ, জনগণের টাকায় আমার বেতন হয়। জনকল্যাণ আমার চ্যারিটি (বদান্যতা) নয়, আমি বাধ্য।

abu-sopon-02.jpg

এটি মানবিক বোধের ব্যাপার। মানুষের মাঝে বিরক্ত তৈরি করে জনপ্রিয় হওয়া যাবে না। যে নেতা যত বেশি বিনয়ী সে নেতা তত বেশি জনপ্রিয়। যারা পোস্টার-মহড়া বা সেলফিবাজি করে নেতা হন, তারা ক্ষণিকের জন্য।

জাগো নিউজ : আপনার উপলব্ধির কথা বলছেন। কিন্তু রাজনীতিতে ক্রমশই লোক দেখানো আয়োজন বাড়ছে। এখন জনপ্রিয়তাও নির্ধারণ হচ্ছে এমন আয়োজনেই…

আল মাহমুদ স্বপন : আমি আমার বিবেকের কথা বলছি। অন্যের কথা বলা আমার জন্য শোভনীয় নয় বলে মনে করি। আমি আমার জায়গা থেকে যুদ্ধটা শুরু করেছি। যুদ্ধটা আমার বেশি দিনের আগেও নয়।

আমি যা বলি, তা আগে নিজে প্র্যাক্টিসের (অনুশীলন) চেষ্টা করি। গত দশ বছরে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং এ নিয়ে চিন্তার উত্তরণ ঘটেছে। আমার এলাকায় আমার নামে কোনো বিলবোর্ড পাবেন না। আমার ছবি লাগিয়ে বিলবোর্ড বানানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি।

বাড়ির ছাদে, সড়কের মোড়ে মোড়ে মানুষের জায়গা দখল করে বিলবোর্ড বানানো হয়। এটিও এক প্রকার দখল। একজন আইন প্রণেতা হিসেবে আইন অমান্য করতে পারি না। নেতাদের নামে বিশাল বিশাল বিলবোর্ড। সেখানে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ছবি মাইক্রোস্কোপ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যায় না।

যার সৌজন্যে বিলবোর্ড বানানো, তার বিশাল ছবিতে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি ঢেকে যাচ্ছে। অথচ বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীর আলোয় আমরা আলোকিত। সৌজন্যের ব্যক্তিকে নিয়ে সমাজে ইতিবাচক ধারণাও থাকতে পারে, নেতিবাচক ধারণাও থাকতে পারে। একজন সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসায়ী, নেশাখোর, চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু যদি আমার ছবি ব্যবহার করে এমন বিলবোর্ড বানায়, তাহলে ওই এলাকায় ভোট কমার জন্য আর কোনো কারণের দরকার পড়ে না।

একবার আমার নির্বাচনী এলাকা আক্কেলপুর রেলগেট এলাকায় গিয়ে দেখি, আমার নামে বিলবোর্ড ও পোস্টারে ছেয়ে গেছে। সৌজন্যে যাদের ছবি দেখলাম, তারাই আমার ভোট কমানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তারাও দলের কর্মী।

আমি তখন আতঙ্কিত হয়ে কৌশল অবলম্বন করলাম। একটি যৌথসভা ডাকলাম। আমি বললাম, আমার ছবি ব্যবহার না করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিন। তাহলে এলাকায় যে আরও নির্বাচন আছে, তাতে অন্যরাও জিতে আসবেন। ছবিগুলো নামিয়ে ফেলেন। একজন আমার কথা ধরে ফেললেন। বললেন, আমরা কী আমার নেতার ছবি ব্যবহার করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারি না? বললাম, অবশ্যই। আপনি আমার ছবি ব্যবহার করে বিলবোর্ড বানালে আমার ইজ্জত বাড়বে। এ কথা শুনে সবাই মিটমিট করে হাসতে শুরু করলো। কারণ ওই ব্যক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক কোনো ধারণা নেই মানুষের মধ্যে।

আমি দলীয়ভাবে সব বিলবোর্ড নামানোর অনুরোধ করলাম। বললাম, বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীকে আমি লিজ নেইনি। সবারই অধিকার আছে বিলবোর্ড বানানোর। তবে আমার ছবি ব্যবহার না করার বিশেষ অনুরোধ রইল। আমাকে একটু ফ্রি করে দেন। আমি মানুষের মধ্যে জায়গা করে নেয়ার চেষ্টা করি। এরপর থেকে সেই অর্থে আমার এলাকায় আর এমন ছবি দেখা যায় না। কালেভদ্রে দেখা গেলেও আমি নামিয়ে ফেলার চেষ্টা করি।

বিভিন্ন সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীর সঙ্গে আমার ছবি দেখা যায়। তা কেন? আমি কি তাদের সমকক্ষ? বিভিন্ন দিবসে আমার ছবি দিয়ে পোস্টার করা হয়। এটি বেমানান। বীরদের ছবি থাকবে। আমি কেন? সাভার থেকে স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত যেতে দেখবেন কতজনের ছবি। তা কেন? বঙ্গবন্ধু, নেত্রীর ছবি থাকতে পারে। আমরা কেন?

অপসংস্কৃতির একটা মাত্রা আছে। মাত্রাতিরিক্ত কোনো কিছুই সমর্থন করা যায় না। ১৫ আগস্টের ব্যানার বা পোস্টারে আমার ছবি থাকবে— এটি তো কল্পনাই করতে পারি না।

এএসএস/এমএআর/এমএস

বঙ্গবন্ধু, নেত্রীর ছবি থাকতে পারে। আমরা কেন

যারা পোস্টার-মহড়া বা সেলফিবাজি করে নেতা হন, তারা ক্ষণিকের জন্য

আমি জনগণকে সেবা দিতে বাধ্য। কারণ, জনগণের টাকায় আমার বেতন হয়

রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি ভুল করি না, তা আমি বিশ্বাস করি না