বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি অশুভ সংকেত

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:২৫ পিএম, ০২ ডিসেম্বর ২০২০

অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ইমেরিটাস অধ্যাপক, লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক। সমাজ ও রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে বলছেন-লিখছেন দীর্ঘকাল ধরে।

ভাস্কর্য ইস্যু, হেফাজত-সরকারের অবস্থান এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজ’র সঙ্গে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ না ফিরলে যে কোনো চরমপন্থারই বিকাশ ঘটতে পারে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের প্রতিবাদে ইসলামী দলগুলো মাঠে নেমে বক্তব্য দিচ্ছে। রাজনৈতিক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ইস্যুটি। এমন সময়ে ভাস্কর্যবিরোধী এ ইস্যু আসলে কী বার্তা দিচ্ছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : মুজিববর্ষে মুজিবেরই ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি ভয়ঙ্কর বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করি। এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। দিন দিন সাম্প্রদায়িক শক্তি বিকাশ লাভ করছে। ফলে আমাদের এমন আন্দোলন দেখতে হচ্ছে।

জাগো নিউজ : এই যে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিকাশ ঘটছে বলছেন, এর জন্য মূলত কোন ব্যাপারটি দায়ী করবেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : রাজনৈতিকভাবেই এই শক্তিকে ক্রমাগতভাবে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করেছি, আওয়ামী লীগ সরকারই তো হেফাজতের সঙ্গে আপস করেছে। হেফাজতের প্রধান আহমেদ শফী বেঁচে থাকতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সঙ্গে গণভবনে বৈঠক করলেন। তাকে অনেক সুবিধা দিলেন। তার ছেলেকে সম্পত্তি দিয়েছেন বলেও মিডিয়ায় খবর বের হয়েছে।

জাগো নিউজ : এমন সুবিধা অন্য সরকারের আমলেও নিয়েছে...

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : হ্যাঁ, আমি বলেছি, রাজনৈতিকভাবেই তাদের শক্তিশালী করা হয়েছে। এ সরকার সবচেয়ে বড় যে অন্যায় করেছে, তা হচ্ছে হেফাজতের দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষানীতির সর্বনাশ ঘটিয়েছে। কোনো প্রকার আধুনিকায়ন না করে কওমি শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি মান, সনদ প্রদান করা হয়েছে। এতে মৌলিক শিক্ষার উন্নয়ন না ঘটিয়ে শিক্ষা-সংস্কৃতির নিম্নগামিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

ক্ষমতায় টিকে থাকতেই আওয়ামী লীগ হেফাজতকে সঙ্গে নিয়েছে। বিএনপি এদের ব্যবহার করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই আওয়ামী লীগ হেফাজতকে হাতছাড়া করতে চায়নি।

jagonews24

জাগো নিউজ : হেফাজত যদি সরকার থেকেই সুবিধা নেয় তাহলে সরকারবিরোধী অবস্থান নিচ্ছে কেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সরকারের কাছ থেকে তারা বহু সুবিধা নিয়েছে ইতোমধ্যে। তারা আরও চাইছে। দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ নেই। গণতন্ত্রের দ্বার বন্ধ। বাকস্বাধীনতা নেই। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। এই অবরুদ্ধ সময়ের সুযোগ নিয়েই তারা রাজনৈতিকভাবে উত্থান ঘটাতে চাইছে। ধর্ম এখানে প্রধান পুঁজি। জামায়াত বা সমমনা দলগুলোরও সমর্থন পাবে এমন কর্মসূচি দিচ্ছে তারা। অন্যদিকে জেএমবি, হিযবুত তাহরীরের মতো দল জঙ্গি তৎপরতায় থাকলেও হেফাজতের সঙ্গে দূরত্ব রাখছে। হিজবুতের সদস্যরা আরও শিক্ষিত। সব মিলে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের আশঙ্কা থেকে এক অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে।

সরকার একতরফাভাবে বিএনপিবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক শূন্যতা গ্রাস করেছে সমাজকে। এই শূন্যতা পূরণ করতেই হেফাজতে ইসলাম মরিয়া হয়ে উঠছে। হয়তো আগামী নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে আসতে চাইবে। তাদের বিভিন্ন দাবি আরও তীব্র হবে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙতে চাওয়া অশুভ সংকেত।

১৯৭৬ সালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্য ভাঙার চেষ্টা করেছিল এরা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ধাওয়া দেয়। তখন আর পারেনি।

জাগো নিউজ : আগে পারেনি। এখন শঙ্কিত কেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এখন পরিবেশটা অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ আছে। যে ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে, তাতে মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসছে।

সাধারণের ক্ষোভ যদি হেফাজতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, তাহলে মহাবিপদ হবে। পাকিস্তান আমলেও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সরকার যদি তার অবস্থান পরিষ্কার না করে তাহলে এই সাম্প্রদায়িক শক্তি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।

জাগো নিউজ : আপনার কি মনে হয় সরকার এই ইস্যুতে অবস্থান পরিষ্কার করার সক্ষমতা রাখে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সরকার আরও আপস করতে পারে হেফাজতের সঙ্গে। কিন্তু আপস করুক তা আমরা চাইব না। যদি অবস্থান পরিষ্কার না করে আপস করে, তাহলে ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক হবে।

jagonews24

সরকার যদি এখনই এদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। গণতান্ত্রিক অন্য শক্তিগুলো ক্রমশই অবদমিত হবে। বিএনপি মাঠে নেই। বামপন্থীরা শক্তিহীন। এতে ধর্মবাদীরাই সামনে আসবে।

জাগো নিউজ : নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজও বিভাজিত। তারাও সরব হতে পারেনি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এই প্রশ্ন আমারও। আওয়ামী লীগের মধ্যেই অনেক বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন তারাই মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় তাদের সচেষ্ট ভূমিকা দেখতে পাই না।

এই সুশীলরা তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলেই মাঠে নামে। সরকার থেকে সুবিধা যেখানে পাওয়া যায়, সেখানেই তাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

জাগো নিউজ : এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমাদের জন্য আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম নিয়ে রাজনীতি পছন্দ করে না। এখানকার মানুষ ধার্মিক। ধর্মের চর্চা হয়। কিন্তু এদেশে ধর্ম আশ্রিত রাজনীতি জনপ্রিয় হবে না।

এরপরও ভয় থেকে যায়। যেখানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করে না, সেখানে যে কোনো শক্তিই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। নির্বাচন-ভোট নিয়ে ক্রমাগতভাবে অবিশ্বাস তৈরি হলে রাজনীতিতে ধর্ম গুরুত্ব পাবে। সাধারণ মানুষ তখন ধর্মের রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকবে। সাধারণ মানুষ শেষবেলায় ধর্মকেই আশ্রয় মনে করে।

এই উপলব্ধিটা সবারই করা দরকার। মানুষের অনেক সমস্যা। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই এখন প্রধান সমস্যা। ধর্ষণ, খুন, আত্মহত্যা হচ্ছে। মানুষ চাকরিহারা। সর্বত্রই হয়রানি। যদি ধর্মবাদীরা সফল হয়, তাহলে এ সমস্যাগুলো চাপা পড়ে যাবে।

আমি আবারও বলছি, সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা দরকার।

এএসএস/এইচএ/এমএস

ক্ষমতায় টিকে থাকতেই আওয়ামী লীগ হেফাজতকে সঙ্গে নিয়েছে

যেখানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করে না, সেখানে যে কোনো শক্তিই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে

সাধারণের ক্ষোভ যদি হেফাজতের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়, তাহলে মহাবিপদ হবে

আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন তারাই মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় তাদের সচেষ্ট ভূমিকা দেখতে পাই না

আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম নিয়ে রাজনীতি পছন্দ করে না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]