২০ বছরেও শোনেননি ভাষাসৈনিকের নামে সড়ক আছে

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৩ এএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ভাষাসৈনিক অলি আহাদ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কৃত হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৯৫২ সালের রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের জন্য প্রথম কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন এই ভাষাসৈনিক। ভাষার জন্য আন্দোলন করায় জীবনের দীর্ঘ ১৯ বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাকে। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়ক’।

একজন ভাষাসৈনিকের নামে নামকরণ করা হলেও সড়কটির প্রকৃতি নাম জানেন না এখানকার বাসিন্দা এবং ব্যবহারকারীরা। চিনবেন কীভাবে, সবকিছুতেই যে সড়কটির পরিচিতি ‘ধানমন্ডি ৪ নম্বর রোড’ হিসেবে। ‘ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়ক’ এটি শুধুই যেন একটি নামফলকে সীমাবদ্ধ।

আরেক ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কালো পতাকা উত্তোলনকারী শিক্ষার্থী। ১৯৪৮ সালে রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এই ভাষাসৈনিক ১৯৫১ সালে যুবলীগে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯৫২ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম হলে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন।

এই ভাষাসৈনিকের নামেও ধানমন্ডির একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। ‘ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক’ নাম দেয়া হলেও এটিও অনেকটাই অজানা রয়েছে। সবাই সড়কটিকে চেনেন ‘ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোড’ হিসেবে।

সোমবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে এই দুটি সড়ক ঘুরে দেখা যায়, ‘ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়ক’ নাম দিয়ে যে স্থানটিতে নামফলক বসানো হয়েছে তার পাশেই রয়েছে স্ট্রিট ফুডের দোকান। এর একটিতে চার বছর ধরে খাবার বিক্রি করেন মো. রাকিব। তিনি যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে খাবার বিক্রি করেন ঠিক তার সামনেই বসানো হয়েছে এই নামফলক।

এ খাবার বিক্রেতার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়কটি কোথায়। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি চার বছর ধরে এখানে দোকান দিয়ে ব্যবসা করছি। এমন নাম তো আগে কখনো শুনিনি।’

এসময় তাকে প্রশ্ন করা হয় এ সড়কটির নাম কী? উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটি ধানমন্ডি ৪ নম্বর রোড।’ তার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন ‘ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়ক’ নামফলকটি একটি ময়লা গামছা দিয়ে ঢাকা ছিল। গামছাটি সরিয়ে নাম ফলকের লেখা পড়তে বললে তিনি অবাক হন। বিস্ময় নিয়ে বলেন, ‘এটি ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়ক!’

শুধু এ খাবার বিক্রেতা নন, এ সড়ক ব্যবহার করা অনন্ত ৩০ জনের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তাদের প্রত্যেকেই জানান, ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়কের নাম আগে কখনো শোনেনি।

‘ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়কে’ গিয়েও কথা হয় অন্তত ২০ জনের সঙ্গে। তারাও জানান, এমন সড়কের নাম আগে কখনো শোনেননি।

সড়কটিতে কথা হয় আব্দুল সালাম নামের একজনের সঙ্গে, যিনি ২০ বছর ধরে এলাকাটিতে ডিস, ইন্টারনেটের কাজ করছেন। তার কাছে ‘ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক’ কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ২০ বছর ধরেই এই অঞ্চলে ডিস, ইন্টারনেটের বিলের কাজ করছি। এখানকার প্রতিটি বাড়ির নম্বর আমার মুখস্ত। কিন্তু ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়কের নাম কখনো শুনিনি। এটি অন্য কোনো দিকে হতে পারে।’

সড়কটির যে স্থানে ‘ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক’ নামফলক স্থাপন করা হয়েছে, তার পাশেই ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছিলেন পুলিশ সদস্য শফিউল্লাহ। তার কাছেও জানতে চাওয়া হয় ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক কোথায়? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি এ অঞ্চলে দুই বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু এ নামের সড়কের নাম আগে শুনিনি। এটি ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোড। পাশেরটি ধানমন্ডি ৪ নম্বর রোড। আপনি কতো নম্বর রোডে যাবেন। রোড নম্বর না বললে কেউ চিনতে পারবে না।’

এমএএস/ইএ/এসএইচএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]