হাঁটার গতি-বাসের গতি প্রায় সমান

প্রদীপ দাস
প্রদীপ দাস প্রদীপ দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৬ পিএম, ০৩ মার্চ ২০২১

ঢাকা শহরে যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরে। ওই বছরের মে মাসে এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরেন এআরআইয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন।

এ বিষয়ে সম্প্রতি মোয়াজ্জেম হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো কারণই নেই। করোনার কারণে হয়তো কিছুদিন হালকা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এ অবস্থার উন্নতি হয়নি।’ সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করেন তিনি।’

কেবল যে বুয়েটের এই প্রতিষ্ঠানই এমনটি বলছে, তা নয়। বিশ্বব্যাংকও এ নিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ‘অ্যা মডার্ন ঢাকা ইজ কি টু বাংলাদেশ’স আপার-মিডল ইনকাম কান্ট্রি ভিশন’, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত ‘অ্যাক্ট নাউ ফর অ্যা মোর প্রসপারাস অ্যান্ড লাইভেবল ঢাকা’ এবং ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় বিশ্বব্যাংক আয়োজিত ‘মেট্রো ঢাকা ট্রান্সফরমেশন প্লাটফর্ম : ট্রান্সফরমিং মেট্রো ঢাকা ইনটু এ লিভঅ্যাবল প্রসপারুয়াস অ্যান্ড রিজিলিয়েন্ট মেগাসিটি’ শীর্ষক সেমিনারে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

jagonews24

প্রকাশিত তথ্যমতে, ঢাকায় যানজটের কারণে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। যেখানে হাঁটার গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। রাজধানীতে হাঁটার চেয়ে সামান্য বেশি গাড়ির গতি। যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ (৩ দশমিক ২ মিলিয়ন) কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ থেকে ৫ মিলিয়ন বা সাড়ে ২৫ হাজার কোটি থেকে সাড়ে ৪২ হাজার কোটি টাকা।

২০১৭ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সালে ঢাকায় মাত্র ৫ শতাংশ সড়কের পরিমাণ বাড়লেও জনসংখ্যা বেড়েছে ৫০ শতাংশ। আর যানবাহন বেড়েছে ১৩৪ শতাংশ।

২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ১৯৮০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৩ মিলিয়ন এবং ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৮ মিলিয়নের বেশি। ১৯৮০ সালে গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার এবং এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটারেরও কম। এতে যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। ২০৩৫ সালে ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২৫ মিলিয়নে। ফলে যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে যানজট।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরের সেমিনারে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ঢাকায় গাড়ির গতি প্রতি ঘণ্টায় ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। হাঁটার গতি হচ্ছে প্রতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। যানজটের কারণে ঢাকায় প্রতি বছর আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে আনুমানিক ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

jagonews24

বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহরিন আহমেদ মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করি না। কয়েক বছর আগে এটা নিয়ে আমরা কাজ করেছিলাম।’

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে সামনে যানজট ও আর্থিক ক্ষতি দুটোই বাড়বে।

এ বিষয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকা শহরে যানজট নিরসনে ট্রাফিকের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, দেখছি। তারপরও যে খুব বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে, সেটা চোখে পড়ছে না। আবার এটাও ঠিক, বেশ কিছু কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। হয়তো যেগুলোর সুফল আমরা আরও পরে পাবো। সে কারণেও তো ট্রাফিক জ্যাম হচ্ছে। এই মুহূর্তে হিসাব করলে আমরা ট্রাফিক জ্যামের কারণে ক্ষতির প্রকৃত চিত্রটা বুঝবো না। কারণ এটার ফল পেতে আরেকটু সময় লাগবে।’

ট্রাফিক আইন মানাতে পারলে আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও কমবে বলে মনে করেন তিনি। সেলিম রায়হান বলেন, ‘যে কারণে এ ধরনের ট্রাফিক জ্যামগুলো হয়, ট্রাফিকের গতি কমে যায়–সেগুলোকে চিহ্নিত করলেই সমাধান পাওয়া যাবে। নানাভাবে সরকার চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। যেমন রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল। আমি মনে করি, এগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো স্লথ গতি আছে। সেগুলো একটা সমস্যা। এগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে আমার সবচেয়ে বেশি মনে হয়, ট্রাফিক আইন না মেনে চলা। প্রাইভেটকার, বাস–কেউ ট্রাফিক আইন মেনে চলে না। লাইন মেনে চলে না। আইন মানাতে যে বাধ্য করা, ট্রাফিকের ক্ষেত্রে সে ব্যাপারে আমার কাছে মনে হয় খুব যে শক্তিশালী পদক্ষেপ আছে, সেটা না। সেটা নিশ্চিত করা দরকার। কারণ আমি অনেক দেশে দেখেছি যে, ট্রাফিক আইন মানিয়েও অনেক ছোট রাস্তায় জ্যাম কমাতে তারা সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে প্রশস্ত রাস্তা আছে। তবে আমরা নিয়ম মানছি না। রাস্তা দখল করে রাখা হয়েছে। আমাদের রাস্তায় নানাগতির গাড়ি চলে। সেগুলো ঠিক করা দরকার। কোন রাস্তায় কোন ধরনের গাড়ি চলতে পারবে। মূল কথা হচ্ছে এই নিয়মগুলো মানা দরকার। এগুলো মানাতে পারলে অর্থনৈতিক ক্ষতি কিছুটা হলেও কমবে।’

পিডি/ইএ/এসএইচএস/এইচএ/এমএস

অনেক দেশে দেখেছি যে, অনেক ছোট রাস্তায়ও ট্রাফিক আইন মানিয়ে জ্যাম কমাতে তারা সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রশস্ত রাস্তা আছে, তবে আমরা নিয়ম মানছি না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]