নাগরিকদের সরলতার সুযোগে পাসপোর্ট অফিসে রমরমা দালালি

মাহবুবুল ইসলাম মাহবুবুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৫৮ পিএম, ০৩ অক্টোবর ২০২১

আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের বিপরীতে ফুটপাতের সঙ্গেই বেশ কিছু খাবার হোটেল। একটু ভেতরেই বাজার। ফুটপাতে দাঁড়াতেই এপাশ-ওপাশ থেকে ডাকাডাকি শুরু, ‘আসেন...আসেন, কী লাগবে?’

সেখানে দাঁড়ালে মনে হতে পারে খাবারের হোটেলগুলো থেকেই এসব ডাক আসছে। আসলে ডাকাডাকি হচ্ছে পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট ছোট দোকান থেকে।

সরেজমিনে গিয়ে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ দোকানগুলোই মূলত দালালদের আস্তানা।

পাসপোর্ট পেতে ভোগান্তি দূর করা এবং দালালদের দৌরাত্ম্য থামাতে ঘরে বসে অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়া চালু করা হলেও এসব দোকানে ভিড় কমেনি। যারা নিজে আবেদন করতে পারেন না বা আবেদন প্রক্রিয়া বোঝেন না, তারাই এসব দোকানে এসে ধরনা দেন। এটাই হয়ে পড়ে দালালদের জন্য ‘সুযোগ’। সাধারণত ফরম পূরণের জন্যই গ্রাহকরা এসব দোকানে আসেন। তবে পরে নানা প্রলোভনে তারা হয়ে পড়েন দালালনির্ভর।

পাসপোর্ট অফিস চত্বরে ঘুরে দেখা যায়, ডিজিটাল স্টুডিও, আল্লাহর দান স্টুডিও, ফেয়ার ডিজিটাল স্টুডিওসহ নামবিহীন আরও কয়েকটি ‘স্টুডিও’র সামনে গ্রাহকদের ভিড়।

আকারে ছোট হলেও একেক দোকানে রয়েছেন চার থেকে পাঁচজন বা তারও বেশি কর্মী। প্রতিটি দোকানে গ্রাহকও আছেন চার-পাঁচজন বা আরও বেশি। কেউ ফরম পূরণ করছেন কেউ বসে অপেক্ষা করছেন। ফরম পূরণ করার পরই শুরু হয় দালালদের ‘আসল কাজ’।

যদি কেউ ফরমে কোনো ভুল করে বসেন বা নামের সঙ্গে গরমিল থাকে অথবা দ্রুত পাসপোর্ট প্রয়োজন হয় তাহলে তারা আবার এসব দোকানে আসেন সমাধানের আশায়। তখনই তৎপরতা শুরু হয় দালালদের।

পাসপোর্ট করতে এসেছেন এমন একজনের সঙ্গে সেখানে এসেছেন রফিক নামে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘অফিসে সরাসরি গেলে নানা নিয়মের কথা বলে। দেরিতে আসতে বলে। কিন্তু দালালদের কাছে কোনো নিয়ম নেই। তারা গেলেই কাজ হয়ে যায়!’

সৌদি আরব যেতে চান হাসেম নামে এক তরুণ। ই-পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়া তিনি বোঝেন না। তাই একটি দোকানে পাসপোর্টের আবেদন করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুনেছি পাসপোর্ট করা নাকি খুব কষ্ট। আগে ফরম পূরণ করি। তারপর দেখি...যদি টাকা বেশি লাগে, দালাল ধরে হলেও কাজ করবো।’

সেখানে গ্রাহকবেশে একটি দোকানে পাসপোর্ট করার আগ্রহ জানালে ভোটার আইডি কার্ড চান তারা। সময় কতদিন লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে ফরম পূরণ করেন। পরে দেখি কী হয়।’

সময় বেশি লাগবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা দেখা যাবে!’

jagonews24

পাসপোর্ট নবায়ন করতে হলে অফিসে এসে পুরোনো পাসপোর্ট জমা দিতে হয়। এরপর সেটি নবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট নবায়ন করতে আসেন এক ব্যক্তি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, নবায়নের জন্য অনলাইনে যেদিন আবেদন করেছি সেদিন থেকে প্রায় চার মাস পর জমাদানের তারিখ পড়েছে। পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ করলে জানান, করোনা-পরবর্তী অতিরিক্ত চাপের কারণে সিডিউল অনেক দেরিতে পড়েছে। এটি ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’।

একই সমস্যার কথা বলে জাগো নিউজের কথা হয় সেখানকার একটি দোকানের কর্মী আকাশের সঙ্গে। গ্রাহকবেশে গেলে ওই দোকানি বলেন, “এটা তো বৈধভাবে তারিখ পড়েছে। তারিখ আগায় (এগিয়ে) আনতে চাইলে ‘সিস্টেমে’ আসতে হবে। আমরা করে দেব।”

তিনি বলেন, ‘টাকা দেন, দুদিন পর কাজ করে দেবো।’

টাকার পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি দুই হাজার টাকার কথা বলেন।

তবে ‘কী প্রক্রিয়ায় কাজ হবে’ তা জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে চাননি।

একই সমস্যা নিয়ে কথা হয় আরেক দোকানির সঙ্গে। ‘কাজের’ কথা বললে তিনি ফোন করে এক দালালকে ডেকে আনেন। ওই দালাল আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘অনলাইনে আবেদন করলে তারিখ পড়বই। এটা একটা ঝামেলা। আমরা তারিখ আগায় দিমুনে, ৫ হাজার টাকা দেন।’

টাকার পরিমাণ নিয়ে কথা বললে তিনি বলেন, ‘কথা ফাইনাল করেন, কাজ দেন, কমাই রাখমুনে।’

‘কাজ না হলে টাকা ফেরত’ দেওয়ার নিশ্চয়তাও দেন ওই দালাল।

সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. রুবাইয়াত ফেরদৌস জাগো নিউজকে বলেন, ‘কিছু সমস্যা আছে, এটা অস্বীকার করছি না। আমরাই এখন পরিস্থিতির শিকার। সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছি। লোকবল, সক্ষমতা সব মিলিয়ে আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এ সুযোগ নিচ্ছে তারা।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ ঘরে বসেই যেন আবেদন করতে পারেন, এজন্যই তো ই-পাসপোর্ট। কিন্তু তারা যেন বাইরে গিয়ে অসাধু চক্রের খপ্পরে না পড়েন, এ সচেতনতার দায়িত্ব নিজেদেরও নিতে হবে। আমাদের পরামর্শ থাকবে আবেদন ঘরে বসেই করার জন্য।’

দালালদের দৌরাত্ম্য থামাতে মাঝে মাঝেই অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে সাময়িক কাজ হলেও সুরাহা হয় না আসল সমস্যার।

এমআইএস/এমএইচআর/এসএইচএস/জিকেএস

কিছু সমস্যা আছে, এটা অস্বীকার করছি না। আমরাই এখন পরিস্থিতির শিকার। সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছি। লোকবল, সক্ষমতা সব মিলিয়ে আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। এই সুযোগ নিচ্ছে তারা।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]