‘সম্পূর্ণ সরকারি জনবলে নির্বাচন করলে আঁধার আরও ঘনীভূত হবে’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫১ পিএম, ২১ জানুয়ারি ২০২২
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক এম হাফিজ উদ্দিন খান

এম হাফিজ উদ্দিন খান। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। দায়িত্ব পালন করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি পদেও।

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অনুষ্ঠিত সংলাপ এবং এর ফলাফল নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন জাগো নিউজের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: নির্বাচন কমিশন গঠনে নতুন আইনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ করলো। সরকারি দল আওয়ামী লীগ আইন করার কথাও বললো। সংলাপের বিষয়টি নিশ্চয় নজরে রেখেছেন।

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সংলাপের বিষয়টি খুব আড়ম্বর না হলেও মিডিয়ার মাধ্যমে কিছুটা জানা গেছে। বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলই আইন করার কথা বলেছে। কিন্তু আইনের কোনো খসড়া দেয়নি।

আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারে থাকার সময় এ ব্যাপারে আইনের চূড়ান্ত খসড়া করে দিয়েছিলাম। কীভাবে একটি নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করা যায়, তার রূপরেখা ছিল সেখানে। আইনজ্ঞ এবং সংশিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেই সেই খসড়া তৈরি করা। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি।

কোনো আইন করতে হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে তা করা দরকার। সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করার দাবি রাখে। কিন্তু সেই বাস্তবতা তো আর নেই। খণ্ডকালীন আইন করে আসলে কোনো লাভ হবে না। আর সরকার স্থায়ী আইনের মধ্য দিয়ে কোনো সমাধানে যাবে বলেও মনে হয় না।

জাগো নিউজ: নির্বাচন কমিশন তো তার আইন বলেই পরিচালিত হয়ে আসছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাহলে নতুন করে আইন করার আসলে প্রয়োজন পড়লো কেন?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। সংবিধান আইন করার কথা বলে দিয়েছে। কিন্তু তা করা হয়নি।

আপনি গত এক দশকের নির্বাচন পরিস্থিতি যদি বিশ্লেষণ করেন, তাহলে হতাশ হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাদের যে ক্ষমতা দেওয়া আছে সংবিধানে, সেটাই তারা জানেন না।

jagonews24সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক ছিল না/ফাইল ছবি

জাগো নিউজ: তাহলে কি আপনি মনে করেন আইনের দুর্বলতাই কমিশনের দুর্বলতা?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: কিছু একটা দুর্বলতা তো আছেই। নইলে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বারবার ব্যর্থ হতে পারে না। নির্বাচন কমিশনে যারা পরম্পরায় দায়িত্ব পালন করে আসছেন তাদের অনেকেই আমার পরিচিতি। আমরা দায়িত্ব পালন করার সময় আলাপ করেছি। হুদা কমিশন আইনের ব্যাপারে পর্যবেক্ষণ এবং তাগিদ দিয়েছিলেন।

আমরাও চূড়ান্ত খসড়া দিয়েছিলাম। আমরা সেমিনার করেছি। গোলটেবিল আলোচনা করেছি। কিন্তু আইনমন্ত্রী বরাবরই বলেছেন সময় নেই। তাহলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের দরকার কী ছিল? সরকার চাইলে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে এবং তাই করছে। কারও সঙ্গে আলোচনা করার তো দরকার মনে করে না।

জাগো নিউজ: এমনটিই যদি মনে করেন, তাহলে সংলাপ আয়োজনের বিশেষত্ব কী দাঁড়ালো?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: অনেকটাই পর্বতের মূষিক প্রসবের মতো। প্রত্যাশা অনেক। ফলাফল নগণ্য।

বলতে পারেন লোকদেখানো আয়োজন। মানুষ এসবে ভরসা রাখে বলেও মনে করি না।

জাগো নিউজ: সরকার যে আইন করার কথা বলছে, সেখানে সরকারি জনবল দিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করার কথা আছে।

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সরকারি জনবল তো আর নিরপেক্ষ নেই। এখন নিয়োগ, বদলি, প্রমোশন সবই রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়। সরকারি আমলারা অনেকে রাজনীতিকদেরও চেয়ে বড় রাজনীতিক সাজতে চান।

আগের মতো অবস্থানে তো আর নেই। আমরা যখন দায়িত্ব পালন করেছি, তখন রাজনৈতিক বিবেচনা গুরুত্ব পায়নি। সঠিকটাই সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন এমন সিদ্ধান্ত কেউ নিতে পারবে!

জাগো নিউজ: তাহলে?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সম্পূর্ণ সরকারি জনবলে নির্বাচন করলে আঁধার আরও ঘনীভূত হবে। মানুষের আস্থা বা বিশ্বাসকে আপনার আমলে নিতে হবে। সরকারি জনবল মানুষের বিশ্বাস অর্জন করার মতো কিছু করেছে বলে সাম্প্রতিক সময়ে আপনি দেখাতে পারবেন না। তার মানে যা আছে তাই হবে, নতুবা আরও খারাপ হবে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু দেখানো হচ্ছে। ভালো কথা। কিন্তু বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, আসলে নির্বাচন কমিশন কী ভূমিকা রাখছে? নির্বাচনের আগের দিনও (স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী) তৈমূর আলম খন্দকারের নেতাকর্মীদের আটক করা হয়েছে। এটি তো সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রকাশ নয়। তার মানে কমিশন তার আইন বলে সঠিক দায়িত্ব পালন করেনি।

আবার ইভিএম কারচুপি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

জাগো নিউজ: ইভিএম পদ্ধতিতেও অনাস্থা! আস্থা মিলবে কীসে?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: ইভিএম পদ্ধতিতে বহু সমস্যা আছে। আমরা এর অসঙ্গতি নিয়ে বারবার বলে আসছি। ভেরিফাই করার দাবি করে আসছি। কিন্তু সে প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়নি। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রও ইভিএম থেকে বেরিয়ে আসছে। ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।

জাগো নিউজ: নির্বাচন সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কী?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সাধারণ ভোটার ভোট দেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধান নির্বাচন কমিশন বলছেন, ভোটারদের কি বাড়ি থেকে ডেকে আনব? এটি দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য হতে পারে না।

ভোটার না আসার কারণ কী, তা খুঁজে বের করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এটি তার কর্তব্য। তাকে ক্ষমতা দেওয়া আছে ভোটারদের আস্থা কীভাবে অর্জন করা যায়। ভোটের এই সংস্কৃতি আমাদের জন্য অন্ধকার নামিয়ে আনছে।

জাগো নিউজ: রাজনীতি নিয়েও তাই মনে করছেন?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: হ্যাঁ। আপাতত কোনো পরিবর্তন দেখছি না। রাজনীতির যে সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেলো, তা থেকে মুক্তির জন্য আপনি কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর ভরসা রাখতে পারবেন না।

জাতীয় নির্বাচন থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষণ করেন, দেখবেন কী ক্ষতি হয়ে গেছে আমাদের রাজনীতির। এখান থেকে সহসা কে মুক্তি দেবে জাতিকে?

কতদিন এই ঘোর থাকবে, তা বলা যাচ্ছে না। ২০১৪ সালে নির্বাচন নিয়ে আপত্তি ছিল। ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন। এটি কীভাবে সম্ভব? সরকারপ্রধান বললেন, এটি নিয়মরক্ষার নির্বাচন। পরে অংশগ্রহণমূলক আরেকটি নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। আর হয়নি। রাজনীতির এমন ইতিহাস তো ভালো ফল বয়ে আনে না। আর এই সংকট থেকে সরকারকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে।

jagonews24নির্বাচন ভবন, আগারগাঁও, ঢাকা/ফাইল ছবি

জাগো নিউজ: সরকার তো ভালো অবস্থানে আছে। আন্দোলন নেই, সহিংসতা নেই।

এম হাফিজ উদ্দিন খান: আমি একবার প্রেসক্লাবে আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের নেতাদের বললাম, আপনারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন না, এই মর্মে জাতিকে আশ্বস্ত করেন। তারা সবাই পাশাপাশি বসা। অথচ, কেউ জবাব দিলো না। তার মানে সরকারে গেলে সবাই একই রূপ দেখাতে অভ্যস্ত। এ কারণে সরকারের কাছে আপনি সঠিক অধিকার প্রত্যাশাও করতে পারেন না।

জাগো নিউজ: বিরোধীশক্তিও নিষ্ক্রিয়...

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সরকার পরিকল্পিতভাবে বিরোধীজোটকে শক্তিহীন করেছে। আপনি নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন দেখেন। বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ছিল না। তৈমূরকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলো। এরপরও সরকারের পুলিশ বাহিনী তৈমূরের নেতাকর্মীদের চার বছর আগের মামলায় আটক করলো। এটিই প্রমাণ করে বিরোধীশক্তিকে সরকার কীভাবে দমন করছে।

জাগো নিউজ: কিন্তু সরকারের এই অবস্থানকে সাধারণ মানুষও এক প্রকার সয়ে নিচ্ছে। এর কী কারণ?

এম হাফিজ উদ্দিন খান: আমি একজন সচেতন মানুষ। তবু আমি এখন ভোট দিতে যাই না। কারণ ভোট দেওয়ার আর দরকারও পড়ে না। তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কেন?

মানুষ আসলে সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছে না, যার ওপর ভর করে আন্দোলন-সংগ্রাম করবে। আর সরকারের শক্তির সামনে কেউ দাঁড়াতেও সাহস পাচ্ছে না।

জাগো নিউজ: অর্জনের গল্পও তো আছে। সামরিক সরকারেরও পতন হয়েছে।

এম হাফিজ উদ্দিন খান: বাঙালি সব সময়ই প্রতিবাদী জাতি। প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই আমাদের সব অর্জন। কিন্তু মানুষ প্রতিবাদের ভাষা ভুলে গেছে। আর এটিই হতাশার কারণ। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। দেশের জন্য, মানুষের জন্য ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে।

এএসএস/এইচএ/এএসএম

২০১৪ সালে নির্বাচন নিয়ে আপত্তি ছিল। ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন। এটি কীভাবে সম্ভব? সরকারপ্রধান বললেন, এটি নিয়মরক্ষার নির্বাচন। পরে অংশগ্রহণমূলক আরেকটি নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। আর হয়নি। রাজনীতির এমন ইতিহাস তো ভালো ফল বয়ে আনে না

একবার প্রেসক্লাবে আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতের নেতাদের বললাম, আপনারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন না, এই মর্মে জাতিকে আশ্বস্ত করেন। তারা সবাই পাশাপাশি বসা। অথচ, কেউ জবাব দিলো না

আমি একজন সচেতন মানুষ। তবু আমি এখন ভোট দিতে যাই না। কারণ ভোট দেওয়ার আর দরকারও পড়ে না। তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কেন?

বাঙালি সব সময়ই প্রতিবাদী জাতি। প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই আমাদের সব অর্জন। কিন্তু মানুষ প্রতিবাদের ভাষা ভুলে গেছে। আর এটিই হতাশার কারণ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]