এখন কোনো রাজনীতিবিদ সংবাদপত্রকে ভয় পায় না

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৪৫ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০১৬

‘মেমসাহেব-রিপোর্টার বাচ্চু’ দুটি চরিত্র। মেমসাহেব উপন্যাসের এই দুটি চরিত্রের অমর স্রষ্টা ‘রিপোর্টার’ নিমাই ভট্টাচার্য। বৈচিত্র্যময় জীবনে শূন্য থেকে শুরু করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেছেন। একাধারে প্রখ্যাত সাংবাদিক, অন্যদিকে খ্যাতিমান লেখক। সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিমাই ভট্টাচার্য রচনা করেছেন অন্তত তিন ডজন বই। তার লেখা বইগুলো নানাভাবে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। তবে তাকে মনে রাখার জন্য একটি মাত্র বই-ই যথেষ্ট। সেটি ‘মেমসাহেব’। এই ‘মেমসাহেব’র জন্যই বাংলার তরুণ সমাজের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন ‘রিপোর্টার’ নিমাই ভট্টাচার্য।

শুধু চিরস্মরণীয় বললে ভুল বলা হবে, বরং মেমসাহেবে সাংবাদিকতার যে চ্যালেঞ্জিং ও বৈচিত্র্যময় জীবনকাব্য তুলে ধরা হয়েছে তাতে আকৃষ্ট হয়ে আজও তরুণ সমাজ এ পেশার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। খ্যাতিমান এ মানুষটির শৈশব, কৈশোরের অনেকটা বছর কেটেছে বৃহত্তর যশোরে। এ সময় লেখাপড়া করেছেন যশোরের সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে। শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত এই স্কুলের ১২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সম্প্রতি যশোরে এসেছিলেন নিমাই ভট্টাচার্য। কলকাতার নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আগে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন জাগো নিউজের যশোর প্রতিনিধি মিলন রহমান।

দীর্ঘ আলাপচারিতায় নিমাই ভট্টাচার্য তুলে ধরেন সাংবাদিকতা, সংবাদপত্র, সাহিত্যাঙ্গনের নানা দিক। আজ ১০ এপ্রিল নিমাই ভট্টাচার্যের ৮৬তম জন্মদিন। এই দিনে সেই আলাপচারিতার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন : আপনার সুদীর্ঘ জীবনে লেখালিখি ও সাংবাদিকতা একসঙ্গে চলেছে। কবে থেকে যাত্রা শুরু করলেন?
নিমাই ভট্টাচার্য : ১৯৫২ সালে বিএ পাস করার পর থেকে সাংবাদিকতা শুরু করি। সাহিত্য চর্চাও শুরু করি প্রায় একই সময়েই।

প্রশ্ন: সাংবাদিকতার শুরুতেই আপনাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, সেই দিনগুলো সম্পর্কে কিছু বলুন।
নিমাই ভট্টাচার্য : হ্যাঁ, সে সময় অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। পুরো এক বছর বেকার খাটার পর মাসিক ১০ টাকা ভাতা হয়, তাও আট আনা এক টাকার কিস্তিতে।

প্রশ্ন: আপনাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে সাংবাদিকতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য। যারা আজ সাংবাদিকতায় নবীন, তাদের সফল হওয়ার জন্য কী পরামর্শ দেবেন।
নিমাই ভট্টাচার্য : সাংবাদিক হতে গেলে দুটি জিনিস দরকার। এক হচ্ছে পড়াশোনা। পড়াশোনা না করলে ভালো সাংবাদিক হওয়া যায় না। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, সু-প্রখর দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে, আর থাকতে হবে সততা। ‘ইউ মাস্ট বি অনেস্ট’। কেউ আমাকে বিনা পয়সায় লাঞ্চ করালো, ডিনার করালো হুইস্কি খাওয়ালো-তারপর সাংবাদিকতা হয় না। যে কোনো সাংবাদিককে এখন এক বোতল হুইস্কি দিয়ে কিনে নেয়া যায়।

প্রশ্ন : এখনকার সংবাদপত্র নিয়ে কিছু বলুন।
নিমাই ভট্টাচার্য : সাংবাদিকদের কেনা যায় বলেই এখনকার সাংবাদিকতার সেই জোর নেই। এখন এই সংবাদপত্রে তেমন কোনো খবর দেখবো না যা দেখে রাজনীতিবিদরা চমকে উঠবেন। এখন কোনো রাজনীতিবিদ সংবাদপত্রকে ভয় পান না। সব জিনিসেই কমার্শিয়ালাইজেশন হয়ে গেছে। টাকা দিয়ে কেনা হচ্ছে সবাইকে।

প্রশ্ন : কৈশোর কেটেছে যশোর সম্মিলনী স্কুলে। সে সময়ের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কিনা?
নিমাই ভট্টাচার্য : কৈশোর কেটেছে সম্মিলনী স্কুলে। মনে হয়, ৪র্থ থেকে ক্লাস এইট, নাইন পর্যন্ত পড়েছিলাম। আমার বাবাও এই স্কুলে পড়েছেন এবং কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন। তবে এই বয়সে এসে তখনকার তেমন কোনো স্মৃতি মনে পড়ে না। শুধু মনে আছে, তখন জ্বর হলে হেড মাস্টার বিমল কান্তির স্ত্রী আমার সেবাশুশ্রুষা করতেন, মাথায় পানি দিয়ে দিতেন। তার সেই মাতৃ স্নেহের কথা মনে পড়ে।

Nimay-Vottacharjo

প্রশ্ন : মেমসাহেব নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই। মেমসাহেব প্রকাশের দু’বছর পর এটি নিয়ে চলচ্চিত্র হলো। সিনেমা যখন হলো- তখন আপনাকে প্রশ্ন করা হলেছিল, রিপোর্টার বাচ্চু আপনার জীবনের ছায়া অবলম্বনে কিনা? উত্তরে আপনি বলেছিলেন, ‘আই উইল নাইদার কনফার্ম, নর ডিনাই’। ৫০ বছর পরে এসে কী বলবেন?
নিমাই ভট্টাচার্য : হ্যাঁ তখন সবাই জানতে চাইতো। মেমসাহেব আমার জীবনী কিনা। কিন্তু আর ৫০ বছর পর এসে আজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, মেমসাহেব আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। এটা সবাই জানে এবং এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : ৫০ বছর পরও মেমসাহেব পড়ে তরুণ সমাজ সাংবাদিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়, কেমন লাগে?
নিমাই ভট্টাচার্য : আমার বই পড়ে যদি কেউ বা একটা প্রজন্ম উদ্বুদ্ধ হয় আনন্দের কথা। বইটার গুরুত্ব বুঝতে পারে।
 

এক নজরে : ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য। তার আদি নিবাস তৎকালীন যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার (বর্তমান জেলা) শালিখা থানার অন্তর্গত শরশুনা গ্রামে। তার বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে তিনি মাতৃহীন হন। বাবার সীমিত আয়ে অকল্পনীয় দুঃখ কষ্ট অভাব-অভিযোগের মধ্যে ভর্তি হলেন কলকাতা কর্পোরেশন ফ্রি স্কুলে। কলকাতা রিপন স্কুলে কিছুদিন তিনি পড়াশুনা করার পর যশোরে ফিরে আসেন। ১৯৪১ সালে যশোর সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং নবম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়াশুনা করেন। তার বাবা সুরেন্দ্রনাথ এক সময় সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনের ছাত্র ও পরবর্তীতে শিক্ষক ছিলেন। দেশ বিভাগের পর নিমাই ভট্টাচার্য বাবার সঙ্গে কলকাতায় চলে যান এবং পুনরায় কলকাতায় রিপন স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তিনি ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।

এরপর তিনি কলকাতা রিপন কলেজে ভর্তি হন এবং রিপন কলেজ থেকে আইএ উত্তীর্ণ হন। ১৯৫২ সালে তিনি বিএ পাশ করেন। নিমাই ভট্টাচার্য বাংলাদেশের বগুড়া জেলার কালীতলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর কন্যা দীপ্তি ভট্টাচার্যকে বিবাহ করেন। বর্তমানে তিনি কলকাতায় বসবাস করছেন।

জীবনের টানে, জীবিকার গরজে কক্ষচ্যূত উল্কার মতো এশিয়া-আফ্রিকা ইউরোপ- আমেরিকা, গ্রাম-গঞ্জ, শহর-নগর ঘুরে বেড়িয়েছেন নিমাই ভট্টাচার্য। দারিদ্রতা নিমাই ভট্টাচার্যকে পরাভূত করতে পারেনি। ক্ষয় করতে পারেনি তার সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে। পরম উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে ভাগ্যের সঙ্গে পাঞ্জা কষেছেন তিনি। সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তার কর্মজীবন শুরু হয়। কিন্তু প্রথম অবস্থায় সেখানেও তিনি ভাগ্যের বিড়ম্বনার শিকার হন।
 

নিমাই ভট্টাচার্যের সাহিত্য চিন্তা তার জীবনচর্চার একান্ত অনুগামী হয়ে দেখা দিয়েছে। ১৯৬৩ সালে তার লেখা একটি উপন্যাস কলকাতার সাপ্তাহিক ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় এবং সাহিত্যামোদীদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। পরবর্তীকালে ‘রাজধানী নৈপথ্য’ রিপোর্টার. ভিআইপি এবং পার্লামেন্ট স্টীট নামক চারটি উপন্যাস ওই একই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিমাই ভট্টাচার্য পূর্ণোদ্যমে আরো উপন্যাস লেখা শুরু করেন।

‘মেমসাহেব’, ‘ডিপ্লোম্যাট’, ‘মিনিবাস’, ‘মাতাল’, ‘ইনকিলাব’, ‘ব্যাচেলার’, ‘ইমনকল্যাণ’, ‘ডিফেন্স’, ‘কলোনী’, ‘প্রবেশ নিষেধ’, ‘কেরানী’, ‘ভায়া ডালহৌসী’, ‘হকার্স কর্নার’, ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’, ‘নিমন্ত্রণ’, ‘নাচনী’, ‘অ্যাংলো ইন্ডিয়ান’, ‘ডার্লিং’, ‘ম্যাডাম’, ‘ওয়ান আপ-টু-ডাউন’, ‘গোধুলিয়া’, ‘প্রিয়বরেষু’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, ‘মোগল সরাই জংশন’, ‘ইওর অনার’, ‘ককটেল’, ‘অনুরোধের আসর’, ‘যৌবন নিকুঞ্জে’, ‘শেষ পরানির কড়ি’, ‘হরেকৃষ্ণ জুয়েলার্স’, ‘পথের শেষে’ প্রভৃতি প্রকাশিত উপন্যাসগুলি উল্লেখযোগ্য।

নিমাই ভট্টাচার্যের লেখা উপন্যাসগুলোতে বিষয়গত বৈচিত্র্যতার ছাপ প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো উপন্যাসে তিনি রাজধানীর অন্দর মহলের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অভিজাত সমাজের কুৎসিত রূপের চিত্র তুলে ধরেছেন। কোথাও নীচু তলার মানুষের সুখ-দুঃখের জীবন কাহিনী চিত্রিত করেছেন। তার লেখায় কোথাও কোথাও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদও লক্ষ্য করা যায়। আবার অনেক উপন্যাসে সোনালী আনন্দ দিনের বিলাপ লক্ষ্যণীয়। তার লিখিত উপন্যাসগুলো সাহিত্যরস সমৃদ্ধ ও সুখপাঠ্য।

এমএএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।