ঢাকার স্পিন-জাল ছেড়ার কৌশল আঁটছেন সালাউদ্দীন

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৪:৪৬ এএম, ২০ নভেম্বর ২০১৭

লাইন আপ মন্দ ছিল না। কিন্তু যে কোন কারণেই হোক, গতবার কাঙ্খিত সাফল্যের দেখা পায়নি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। এবারো শুরুতেই হোঁচট। ৫ নভেম্বর সিলেটে প্রথম ম্যাচে স্বাগতিকদের কাছে ৪ উইকেটে হেরে শুরু।

ইনজুরির কারণে নিয়মিত অধিনায়ক তামিম ইকবালের অনুপস্থিতি আর শুরুতে পরাজয়ের তেতো স্বাদ, জন্ম দিয়েছিল সংশয়ের। সমর্থকরা চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, ভাল দল গড়ার পর এবারো কি আগের বারের মতই অবস্থা হবে?

সংশয়ের সে কালো মেঘ উড়ে গেছে দ্বিতীয় খেলাতেই। সিলেটেই চিটাগাং কিংসকে উড়িয়ে (৮ উইকেটের জয়) জয়ের পথ খুঁজে পেয়েছে ভিক্টোরিয়ান্সরা। তারপর আর জয়রথ থামেনি।

নির্দিষ্ট কারো ব্যক্তিগত পারফরমেন্সের ওপরে নয়, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছে কুমিল্লা। তরুণ মিডিয়াম পেসার সাইফুদ্দিনের মাপা ও নিয়ন্ত্রিত বোলিং, আফগান লেগস্পিনার রশিদ খানের টার্ন ও বৈচিত্রে ভরা স্পিন ভেলকি আর জস বাটলার, ইমরুল কায়েস ও মারলন স্যামুয়েলসের ধারাবাহিক ব্যাটিং কুমিল্লাকে রেখেছে কক্ষপথে।

শুরুর ধাক্কা সামলে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কুমিল্লা। অধিনায়ক তামিম ইকবাল খেলতে না পারলেও টানা চার ম্যাচ জিতেছে সালাউদ্দীনের শিষ্যরা। তাদের উজ্জীবিত আর পরিকল্পিত পারফরমেন্সের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারেনি গেইল-ম্যাককালামের রংপুর রাইডার্সও। ঠিক আগের ম্যাচেই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের দুই সেরা, সফল ও ভয়ঙ্কর উইলোবাজের দলকে হারিয়ে দিয়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স।

যাদের নাম শুনলে অনেক বাঘা বাঘা বোলারের ঘুম হারাম হয়ে যায়, যাদের ব্যাটিং তান্ডবে অনেক শক্তিশালি বোলিং লাইন আপও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়; সেই গেইল-ম্যাককালাম রান করতে পারেননি। তাদের দলের সাথে কৃতিত্বপূর্ণ জয় খুব স্বাভাবিকভাবেই সাহস, উদ্যম ও আস্থা বাড়িয়েছে তামিম বাহিনীর।

সোজা পথে হেঁটে আর সনাতন ধারা অনুসরণ করে ক্রিস গেইল আর ব্রেন্ডন ম্যাককালামের উত্তাল আর ঝড়ো উইলোবাজি থামানো যাবে না, তাদের ঝড়ো ব্যাটিং থামাতে অন্য রকম কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এই বোধ-উপলব্ধি থেকেই গত পরশু শনিবার সন্ধ্যায় শেরে বাংলায় ফ্রন্টলাইন বোলারদের বাদ দিয়ে আনকোরা মেহেদি হাসানকে দিয়ে বোলিং শুরু করে কুমিল্লা। তাতেই বাজিমাৎ। অনভিজ্ঞ তরুণ মেহেদির বিস্ময়কর বোলিংয়ে মাশরাফির রংপুর রাইডার্স বধ।

এখন কুমিল্লার সামনে আরেক জায়ান্ট ঢাকা ডায়নামাইটস। আজ দুপুরেই আরেক বড় ম্যাচ তামিম বাহিনীর। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিবের নেতৃত্বে ঢাকা আরও শক্তিশালি।

যে দলে এভিন লুইসের মত মারকুটে আর বিধ্বংসী ওপেনার, চল্লিশ পেড়িয়েও এখনো যার বল ও ব্যাট সমান কার্যকর -সেই আফ্রিদি, শুধু ব্যাকরণ মেনেই যিনি এখনো দলের ব্যাটিংয়ের সব দায় দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে খেলতে পারেন, সেই কুমার সাঙ্গাকারা, স্পিন বোলিং আর সাথে ঝড়ো ব্যাটিং-দুই'ই যিনি একসঙ্গে করে দেখানোর ক্ষমতা রাখেন সেই সুনিল নারিন এবং ডেড ওভারে প্রতিপক্ষ বোলিং দুমড়ে মুচড়ে দেয়ায় কাজটি যিনি দারুণ দক্ষতার সাথে করে দেখাতে পারেন সেই ক্যারিবীয় ব্যাটিং ‘দানব ’ কাইরন পোলার্ড; সবাই সমান কার্যকর পারফরমার।

গেইল-ম্যাককলাামের মত টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের একজোড়া বিশ্ব সেরা উইলোবাজ না থাকলেও সামগ্রিক শক্তি ও সামর্থে ঢাকা ডায়নামাইটস রংপুর রাইডার্সের চেয়েও সমৃদ্ধ ও অনেক শক্তিশালি। সর্বাধিক ম্যাচ জেতানো পারফরমারে ঠাসা। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবিলার মত অভিজ্ঞ, পরিণত ও দক্ষ পারফরমারও আছেন প্রচুর।

এমন একটি দলের সাথে সনাতন ধারা অনুসরণ করে সফল হওয়া কঠিন। এ সত্য উপলব্ধি করে আজও রংপুরের মত কিছু ব্যতিক্রমি কৌশল ও পরিকল্পনা মাথায় আঁটছেন কুমিল্লা কোচ সালাউদ্দীন।

খালি চোখে এটা অবশ্যই ঢাকা ও কুমিল্লার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুই বন্ধু সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের ক্রিকেট লড়াই, তার পিছনে তীক্ষ আর সুক্ষ্ণ ক্রিকেট বুদ্ধি সম্পন্ন দুই কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন ও মোহাম্মদ সালাউদ্দীনেরও যুদ্ধ।

তাই খালেদ মাহমুদ সুজন যেমন তার দলের শক্তি ও সামর্থর কথা বিবেচনায় এনে মোহাম্মদ আমিরের মত ফাস্টবোলারকে ছাড়া একাদশ সাজানোর কথা ভাবছেন, একই ভাবে কুমিল্লা কোচ সালাউদ্দীনও চিন্তা করছেন কিভাবে তারার মেলা ও সর্বাধিক ম্যাচ উইনারের দল ঢাকাকে আটকানো যায়।

দল হিসেবে ঢাকা অনেক শক্তিশালি। প্রতিপক্ষ হিসেবেও কঠিন। এ সত্য স্বীকার করেই নিজের দলকে তৈরির কথা ভাবছেন সালাউদ্দীন।

আজকের ম্যাচে নিজেদের লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা জানতে চাওয়া হলে কুমিল্লা কোচ সালাউদ্দীন বলেন, ‘ঢাকা খুবই ভাল দল। অনেকগুলো অলরাউন্ডার আছে। ব্যাটিংটা লম্বা। ম্যাচ উইনারও আছে বেশ ক'জন। ঢাকা সব দিক দিয়েই ভালো। প্রথম ম্যাচটি ছাড়া এখন পর্যন্ত একটা ম্যাচেই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল তারা, খুলনার সাথে। কাজেই আমার মনে হয় খুব খেলা ভালো হবে।’

কেউ যা স্বপ্নেও ভাবেনি, রংপুরের বিপক্ষে সে অকল্পনীয় কাজটিই করেছে কুমিল্লা। গেইল ও ম্যাককালামের বিপক্ষে আনকোরা ও অনভিজ্ঞ মেহেদি হাসানকে খেলানো এবং তাকে দিয়েই বোলিং শুরু করা হয়েছে। তাতে অবিশ্বাস্য সাফল্যও ধরা দিয়েছে।

আজও কি সে পথে হাঁটবে কুমিল্লা? আবার অমন কোন ‘ক্রিকেট গ্যাম্বল’ করবেন কোচ সালাউদ্দীন? কুুমিল্লা কোচের মুখে স্মিত হাসি। বললেন, 'কি করবো, তা মাঠেই দেখবেন। কৌশলগত কারনেই তা বলবো না এখন। তবে তাতো অবশ্যই, আমরা কোন না কোন প্ল্যান নিয়েই মাঠে যাবো।'

আগের ম্যাচে সালাউদ্দীনের চোখ ছিল, গেইল ও ম্যাককালামের ওপর। তাদের কম সময় ও অল্প রানে সাজঘরে ফেরানোর চিন্তায় মেহেদিকে দিয়ে 'গ্যাম্বল' করছিলেন। আর আজ ঢাকার বিপক্ষে তার মূল ফোকাস, সাকিব-নারিন-আফ্রিদিকে নিয়ে গড়া ঢাকার ধারালো, তীক্ষ্ণ ও বৈচিত্রপূর্ন স্পিন আক্রমণের যথাযথ মোকাবিলা।

কুমিল্লা কোচ বললেন, ' আমি ভাবছি ঢাকার একদম স্ট্রং যে জায়গা সেটা নিয়ে। আমার মনে হয় ঢাকার স্পিন এ্যাটাকটা খুব বেশী ভালো। সেটাই তাদের শক্তির অন্যতম বড় জায়গা। আমরা যদি সেই শক্তির জায়গায় প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি তাহলে অবশ্যই ঢাকাকে দূর্বল করা সম্ভব। আমরা তাই ঢাকার স্পিন আক্রমণটা যথাযথভাবে মোকাবিলার পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে যাবো।'

নিজ দলের ফ্রন্টলাইন বোলিং নিয়েও এখন সন্তুষ্ট কুমিল্লা কোচ, ‘আমরা প্রথম ৪ ম্যাচ প্রথম ৬ ওভারে অনেক রান দিয়ে ফেলেছি। এখন সঠিক কম্বিনেশন হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রনে চলে এসেছে।’

গেইল-ম্যাককালামকে থামাতে শুরুতে তরুণ মেহেদীর হাতে বল তুলে সাফল্য পাওয়া। আফ্রিদি (৩ ম্যাচে ৯ উইকেট), সুনিল নারিন (৪ খেলায় ৬ উইকেট) ও সাকিবের (৫ খেলায় ৫ উইকেট) স্পিন জাল কি নতুন কৌশল আঁটেন কুমিল্লা কোচ, সেটাই দেখার। তবে কি ব্যাটিং লাইনআপে কোন অভিনব পরিবর্তন?

এআরবি/এমএমআর/জেআইএম