মাত্র ৪ বছর আর ১৮ ম্যাচের অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু ক্রিকেট বিশ্বকাপ

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল , স্পোর্টস এডিটর
প্রকাশিত: ০৫:২৬ পিএম, ১১ মে ২০১৯

একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করা কি খুব চাট্টিখানি কথা? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় প্রতিটি খেলায়ই কিন্তু বিশ্ব আসর আয়োজন করার কৃতিত্ব দেখিয়ে ফেলেছে। ক্রিকেটের যে ফরম্যাট চালু ছিল (টেস্ট), তাতে বিশ্বকাপ আয়োজন করা অলিক কল্পনাছাড়া আর কিছুই নয়।

কিন্তু ১৯৭১ সালে আচমকাই জন্ম নিলো ওয়ানডে ক্রিকেটের। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে বৃষ্টির কারণে একদন হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়ে গেলো একদিনের ক্রিকেটের। সে সঙ্গে বিশ্বকাপ আয়োজনের চিন্তাও শুরু হয়ে যায়। কিন্তু চিন্তা আর বাস্তবায়ন- বিষয়টা মোটেও এক নয়।

আইসিসি বিশ্বকাপের চিন্তা করতে করতেই কিন্তু আয়োজন করে ফেললো একটি আসর। নারী বিশ্বকাপ। বলাই বাহুল্য, পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল নারী বিশ্বকাপ, ১৯৭৩ সালে, ইংল্যান্ডে। ১৯৭৩ সালের ২৮ জুলাই, এজবাস্টনে নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপের ট্রফি তুলে দেন প্রিন্সেস অ্যান।

jagonews24

তার তিনদিন আগেই, অনুষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কনফারেন্স। সেখানেই টেস্ট অ্যান্ড কাউন্টি ক্রিকেট বোর্ড প্রস্তাবিত পুরুষ ক্রিকেট বিশ্বকাপের অনুমোদন দেয়। বলা হয়, দুই গ্রীষ্ম পর, অর্থ্যাৎ ১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হবে প্রথম বিশ্বকাপ।

কিন্তু স্পন্সর? ওয়ানডে বিশ্বকাপ তখনও এতটা জনপ্রিয়তা পায়নি। যার প্রমাণ, ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫- ওয়ানডে ক্রিকেটের জন্ম থেকে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজন- এই চার বছরে টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো নিজেদের মধ্যে মাত্র ১৮টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছিল। এমন পরিস্থিতিতে কে পৃষ্ঠপোষকতা করতে আসবে?

ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডই (ইসিবি) দ্বারস্থ হলো, ১৯৭২ সাল থেকে তাদের ওয়ানডে দলকে স্পন্সর করে আসা বীমা কোম্পানি প্রুডেন্সিয়ালকে। তারা রাজী হলো এবং ১ লাখ পাউন্ডের চেক দিয়ে দিলো বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য। যদিও এর মধ্যে অনেক বাণিজ্যিক শর্তও জড়ানো ছিল।

চার বছরে মাত্র ১৮টি ম্যাচের অভিজ্ঞা নিয়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে নবীন ওয়ানডে ফরম্যাট ১৯৭৫ সালে আয়োজন করে ফেললো প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপের। যদিও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ওয়ানডে খেলার তেমন কোনো মানসিকতাই ছিল না। প্রতিটি দেশ ছিল টেস্ট খেলতে অভ্যস্ত।

যার প্রমাণ দেখা গেছে ভারতের ক্ষেত্রে। উদ্বোধনী ম্যাচে ইংল্যান্ডের করা ৪ উইকেটে ৩৩৪ রানের জবাবে তারা করে কেবল ৩ উইকেটে ১২৩। সুনিল গাভাস্কার পুরো ৬০ ওভার ব্যাট করে অপরাজিত ছিলেন মাত্র ৩৬ রান করে। খেলেছিলেন ১৭৪ বল। এক ক্ষুব্ধ দর্শক তো গাভাস্কারের মাথায় তার লাঞ্চ পর্যন্ত ঢেলে দিতে চেয়েছিলেন। ভারত হেরেছিল ২০২ রানের বিশাল ব্যবধানে।

jagonews24

৭ জুন প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের পর্দা ওঠে। আয়োজক ইংল্যান্ড। ২১ জুন পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ৫টি শহরের ৬টি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপের খেলাগুলো। অংশগ্রহণকারী দেশ ৮টি। এর মধ্যে ৬টি টেস্ট খেলুড়ে- স্বাগতিক ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত, পাকিস্তান এবং নিউজিল্যান্ড। বাছাইপর্ব খেলে উঠে এলো আরও ২টি দেশ। পূর্ব আফ্রিকা এবং শ্রীলংকা।

প্রুডেন্সিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড শুধুমাত্র ১৯৭৫ সালেই নয়, পরের দুটি বিচশ্বকাপেও পৃষ্ঠপোষক ছিল। এ কারণে প্রথম তিন বিশ্বকাপের নামকরণ করা হয় প্রুডেন্সিয়াল কাপ নামে। মজার বিষয় হচ্ছে, ১৯৭৫ সালের প্রথম বিশ্বকাপের খেলাগুলো ছিল ৬০ ওভারের ফরম্যাটের। অর্থ্যাৎ, দু’দল মিলে খেলতো ১২০ ওভারের খেলা।

শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের খেলা অথচ সেখানে রঙিনের কোনো বালাই ছিল না। খেলা হয়েছিল সাদা পোষাক এবং লাল বল দিয়ে। দিবা-রাত্রির কোনো ম্যাচ ছিল না। সবগুলো ছিল দিনের আলোয়। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দক্ষিণ আফ্রিকার অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেবার বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি তারা।

অংশগ্রহণকারী ৮ দল দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলে রাউন্ড-রবিন লিগ পদ্ধতিতে। গ্রুপ পর্ব শেষে প্রতি গ্রুপের দুটি করে সেরা দল ওঠে নক-আউটে তথা সেমিফাইনালে। এরপর ফাইনাল। প্রথম বিশ্বকাপে অনুষ্ঠিত হয় মোট ১৫টি ম্যাচ। এরমধ্যে ছিল ২টি সেমিফাইনাল এবং একটি ফাইনালও।

গ্রুপ পর্বে ‘এ’ গ্রুপে পরস্পর মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ভারত এবং পূর্ব আফ্রিকা। ‘বি’ গ্রুপে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা। ‘এ’ গ্রুপ থেকে ৩ ম্যাচের সবগুলোতে জিতে শীর্ষস্থান নিয়ে সেমিফাইনালে উঠে যায় ইংল্যান্ড। নিউজিল্যান্ড ৩ ম্যাচের ২টিতে জিতে ওঠে সেমিফাইনালে। ভারত জয় লাভ করে মাত্র একটি ম্যাচে।

‘বি’ গ্রুপে ছিল শক্তিশালি চারটি দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা। এখানে দাপট ওয়েস্ট ইন্ডিজের। তিন ম্যাচের সবগুলোতে জয় নিয়ে তারা উঠে যায় সেমিফাইনালে। অস্ট্রেলিয়া ২ ম্যাচ জিতে ওঠে সেমিতে। পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা বিদায় নেয়।

সেমিফাইনাল থেকেই মূলতঃ জমে ওঠে প্রথম বিশ্বকাপের জমজমাট লড়াই। লিডসের হেডিংলিতে প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ড। স্বাগতিক ইংল্যান্ড অনেক শক্তিশালী এবং ফেবারিটও তারা। গ্রুপ পর্বে দাপটের সঙ্গেই ম্যাচ জয় করে তারা উঠে এসেছে সেমিতে।

কিন্তু টস জিতে অসি অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল ব্যাট করতে পাঠান ইংল্যান্ডকে। অধিনায়কের এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেন বাঁ-হাতি পেসার গ্যারি গিলমোর। তার বিধ্বংসী আক্রমণের মুখে বালির বাধের মত ভেঙে যা ইংল্যান্ড। ৩৬.২ ওভারে মাত্র ৯৩ রান করে অলআউট হয়ে যায় তারা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা নৈপূণ্য ছিল সেটা গিলমোরের। ১৪ রান দিয়ে একাই নেন ৬ উইকেট। এক পর্যায়ে ইংলিশদের রান ছিল ৭ উইকেটে ৩৭ রান করেছিল।

নাটক জমেছিল অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসেও। ইংলিশ বোলারদের তান্ডবের মুখে নাটকীয়ভাবে ৩৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বসে তারা। কিন্তু সেই গিলমোরে ব্যাটেই হার মানতে হয় ইংলিশদের। বল হাতে তিনি যেমন ধ্বংসলীলা চালিয়েছিলেন, তেমনি ব্যাট হাতেও ধ্বংসলীলা চালান। ২৮ বলে করেন অপরাজিত ২৮ রান। ৫টি বাউন্ডারি মারেন তিনি। তার অলরাউন্ড নৈপূণ্যেই ফাইনালে উঠে যায় ইংল্যান্ড।

অন্য সেমিফাইনালে মুখোমুখি ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর নিউজিল্যান্ড। এই ম্যাচে টস জিতে নিউজিল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ব্যাট করতে নেমে ক্যারিবীয়দের আগুনে বোলিং সামলে ১ উইকেটে ৯৮ রান করার পরই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে কিউইদের ব্যাটিং। কিউিই অধিনায়ক গ্লেন টার্নার এবং তিন নম্বরে নামা জিওফ হাওয়ার্থ সাজঘরে ফিরে গেলে নিউজিল্যান্ডের বাকী ৯ উইকেটে আর মাত্র ৬০ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। বার্নার্ড জুলিয়েন, অ্যান্ডি রবার্টস এবং ভ্যানবার্ন হোল্ডার মিলে নিউজিল্যান্ডকে অলআউট করে দেয় ১৫৮ রানে।

জবাব দিতে নেমে আলবিন কালীচরণ এবং গর্ডন গ্রীনিজের ২য় উইকেট জুটিতে ১২৫ রান করে সহজেই ক্যারিবীয়দের জয় এনে দেন। ৫ উইকেটে জয়লাভ করে ক্যারিবীয়রা। গর্ডন গ্রিনিজ ৫৫ রান এবং আলবিন কালিচরন করেন ৭২ রান।

jagonews24

ফাইনালে মুখোমুখি ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অস্ট্রেলিয়া। গ্রুপ পর্বে এই দু’দলের লড়াইয়ে জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফাইনালে টস জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় অস্ট্রেলিয়া। ক্যারিবীয় অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েডের অধিনায়কোচিত ৮৫ বলে ১০২ রানের অসাধারণ সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়াকে ১৭ রানে পরাভূত করে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

ক্লাইভ লয়েডের ১০২ এবং রোহান কানাইয়ের ৫৫ রানের ওপর ভর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করে ২৯১ রান। জবাব দিতে নেমে ৫৮.৪ ওভারে ২৭৪ রান তুলতেই অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। ইয়ান চ্যাপেল ৬২ এবং অ্যালান টার্নার ৪০ রান করেও বাঁচাতে পারলেন না অস্ট্রেলিয়াকে।

ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার জিতে নেন ক্যারিবীয় অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড। ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় কাউকে ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার প্রদান করা হয়নি।

ফাইনালের সংক্ষিপ্ত স্কোর
২১ জুন, ১৯৭৫, লর্ডস, ইংল্যান্ড। টস : অস্ট্রেলিয়া
ওয়েস্ট ইন্ডিজ : ২৯১/৮, ৬০ ওভার (ক্লাইভ লয়েড ১০২, রোহান কানাই ৫৫, গ্যারি গিলমোর ৫/৪৮)
অস্ট্রেলিয়া : ২৭৪, ৫৮.৪ ওভার (ইয়ান চ্যাপেল ৬২, অ্যালান টার্নার ৪৪, কিথ বয়েস ৪/৫০)
ফল : ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৭ রানে বিজয়ী হয়ে চ্যাম্পিয়ন।
সেরা খেলোয়াড়: ক্লাইভ লয়েড (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

আইএইচএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :