সৌম্যকে অতিরিক্ত সুযোগ দিয়ে ফেলছি আমরা


প্রকাশিত: ০৮:৩০ পিএম, ০৩ জানুয়ারি ২০১৭
সৌম্যকে অতিরিক্ত সুযোগ দিয়ে ফেলছি আমরা

২০১৭ সালের প্রথমেই আমরা হার দিয়ে শুরু করলাম। অথচ হারটা এমন এক ফরম্যাটে এসেছে, যে ফরম্যাটে আমরা গত দুই মাস ধরে নিয়মিত খেলে যাচ্ছিলাম। এই ফরম্যাটটা এই মুহূর্তে আমাদের জন্য সবচেয়ে ফেবারিট ছিল। অথচ এই ফরম্যাটে আমরা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীতাই সৃষ্টি করতে পারিনি।  

ব্যাটিংয়ে যে সমস্যা, যে দুর্বলতা সেটা আবারও আমরা দেখতে পেলাম। লম্বা ইনিংস খেলতে না পারার প্রবণতা এবং মনসংযোগের অভাব দারুণভাবে ফুটে উঠেছে এই ম্যাচে। তারপরও আমি বলব যে, মাহমুদউল্লাহ রানে ফিরেছে। এটা একটা ভালো দিক। আর কোনো ব্যাটসম্যানকেই দেখলাম না একটু দায়িত্ব নিয়ে খেলতে কিংবা সফল হতে।

এখানে একটা জিনিস বলে রাখি, সৌম্য সরকারকে আমরা আবারও দেখলাম সুযোগ দিতে। তার ওপর তাকে খেলালাম খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। সৌম্য হচ্ছে একমাত্র খেলোয়াড়, যে এই সফরে গিয়েছে, যার বিপিএলে রান তোলার গড় ১০-এর মত হবে। তারপরও তিনি কিভাবে একজন স্পেশালিস্ট টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড় হলেন, সেটা দেখার বিষয়। যেখানে মিরাজের মত খেলোয়াড় বাইরে বসেছিল।

কেন সৌম্য সরকারের কথা বলছি? সৌম্য সরকারসহ, উইকেটরক্ষক সোহানসহ আমরা আটজন ব্যাটসম্যানকে নিয়ে খেলতে নেমেছি। এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার যে আটটা ব্যাটসম্যান নিয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আমরা খেলতে নেমেছি এবং শুরু থেকে বলে আসছিলাম, দল নির্বাচন, একাদশ নির্বাচন নিয়ে এই যে হ-ব-র-ল অবস্থা, তারই কিন্তু প্রতিফলন এই রেজাল্টগুলো।

সৌম্যকে কেন এত বেশি সুযোগ দেয়া হচ্ছে- এর কারণ আসলে আমি জানি না। ঢাকা লিগেও তো এতবেশি নজরকাড়া পারফরম্যান্স নেই তার। টি-টোয়েন্টি তথা বিপিএলেও এত বেশি রান নেই। এমনকি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তার কোনো রান নেই। অথচ, সব জায়গাতেই তাকে দেখা যাচ্ছে। এটা অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে না! কারও পছন্দ ঠিক আছে, যে আমার পছন্দ- আগে ভালো খেলেছে এ কারণে তাকে সুযোগ দিলাম; কিন্তু তাই বলে এত বেশি সুযোগ?
braverdrink
এমন ব্যাপার হলে তো আপনি শামসুর রহমান শুভ থেকে শুরু করে, নাঈম ইসলাম-নাসির থেকে শুরু করে কত ক্রিকেটার আছে যারা আগে ভালো খেলেছে, তাদের সুযোগ করে দিতে পারেন। তারা কী দোষ করেছে? তারাও তো এক সময় বাংলাদেশ দলের পারফরমার ছিল। জয়ে অবদান রেখেছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, খুব বেশি বেশি সুযোগ দেয়া হয়ে যাচ্ছে সৌম্যকে। আগের দিন বাংলাদেশ দলের কোচকে বলতে শুনলাম, সৌম্য ফর্মে ফিরলেই বাংলাদেশ জিতবে; কিন্তু সৌম্য কবে ফর্মে ফিরবে আর কবে বাংলাদেশ জিতবে?

আমরা তো দেখছি সৌম্য গত দু’বছর ধরেই ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো খেলছে না। গত দেড় বছরে যে ঘরোয়া, আন্তর্জাতিক মিলিয়ে অন্তত ১০০টা ম্যাচ হয়ে গেছে। কই কোথাও তো দেখলাম না সৌম্য অনেক বড় কোনো স্কোর খেলেছে! কোচকে যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, সে কারণেই দেখতে পাচ্ছি সৌম্যকে জোর করে খেলানো হচ্ছে, তানভিরকে দলে নেয়া, মিরাজকে না খেলানো, নাসিরকে নির্বাচনেই না আনা। এই ছোটো ছোটো জিনিসগুলো কিন্তু আমাদেরকে অনেক পিছিয়ে দিচ্ছে।

ব্যাটসম্যানদের নিদারুণ ব্যর্থতার পরও মাহমুদুল্লাহর অসাধারণ ব্যাটিং, মোসাদ্দেকসহ দু’একজনের ছোট ছোট ইনিংসের কারণেই ১৪১ রান তোলা সম্ভব হলেও বোলিং এতটাই দুর্বল মানের পরিচালনা ছিল যে, মোসাদ্দেক মাত্র ২ ওভার বোলিং করেছে। এরপর দেখলাম যে, খুব গুরুত্বপূর্ণ এক ওভারে সৌম্য সরকারকে দিয়ে বোলিং করানো হয়েছে। ওই ওভারেই ১৭ রান তুলে নিয়েছে বাংলাদেশকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড।

এই জিনিসগুলো কিন্তু মাশরাফির মত একজন অধিনায়কের কাছ থেকে আমরা আশা করিনি। যদিও আমাদের স্পিনাররা বেশ ভালো বল করেছে। সাকিব ভালো বল করেছে। তবে এখানে কথা হলো, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশন মিলিয়ে আমরা জানি যে, স্পিনের বিপক্ষে সবচেয়ে ভালো খেলে কেন উইলিয়ামসন। তার বিপক্ষে আমরা স্পিন দিয়ে শুরু করে তাকে সেট করে দিয়েছি। এ জিনিসগুলো আমার কাছে খুব একটা পছন্দ হয়নি।

তারপরেও আমাদের এই দলটা এর আগে ভালো খেলেছে। আমাদের এই দলে বেশ কিছু সিনিয়র খেলোয়াড় আছে, যারা ম্যাচ জেতার ক্ষমতা রাখে। যেমন আজ শুধু মাহমুদউল্লাহ একলা খেলেই আমাদেরকে ম্যাচটায় ১৪১ রানের মত সংগ্রহ এনে দিয়েছে। সামনের দিনে সাফল্য পেতে হলে, আমাদের এই দলে যে কম্বিনেশনটা আছে, এই কম্বিনেশন আরেকটু ঢেলে সাজাতে হবে।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে যে, ফিল্ড সেটিংয়ের ব্যাপারটা। ফিল্ড সেটিংয়ের দুর্বলতার কারণে দেখলাম একটা ছক্কা, একটা চার হলো। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সাধারণত ফিল্ডাররা বাউন্ডারি লাইনে থাকে ক্যাচ ধরার জন্য। সাকিব কিন্তু একটা দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেছে, বাউন্ডারি লাইনে থাকার কারণে। এরপর আমরা করলাম কী, একটি সৌম্য সরকার এবং ইমরুল কায়েস- এমন দুটো ক্যাচ মাথার ওপর দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন, যেগুলো চার এবং ছয় হয়েছে। ওই দুটি ক্যাচ ধরতে পারলে হয়তো ম্যাচের চিত্র অন্যরকমও হয়ে যেতে পারতো।

আগেরদিনই বলেছিলাম বাংলাদেশের চেয়ে ফিল্ডিং এবং রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে অনেক এগিয়ে নিউজিল্যান্ড। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে যে টপ অর্ডারে একজনকে টেনে নিয়ে যেতে হয়, সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন কেন উইলিয়ামসন। এগুলো আমাদের বড় দুর্বলতা। তবে আমাদের আরেকটা বড় দুর্বলতা এখন দেখা যাচ্ছে। সেটা হলো, দলের মানসিক অবস্থা। পুরো দলটাকে দেখে এখন মনে হচ্ছে তিন-চার দিনের দল। কারো সাথে কারো কোনো মিল নেই। একেকজনকে দেখে মনে হচ্ছে একেকটা আইলাইন। একটা সম্মিলিত দল মনে হচ্ছে না।

এর কারণও খুব স্পষ্ট। দলের কেউ বলছে, সিনিয়র খেলোয়াড়দের দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হবে। কেউ বলছে, এখানে তো ১১জনই খেলোয়াড়, দলের অংশ। এই যে ছেঁড়া ছেঁড়া কথাবার্তা- এগুলো কোনো ভালো চিহ্ন নয়। আগেরদিনই বলেছিলাম যে, ২১-২২ জনের এত বড় একটা বহর নিয়ে মুভ করাটাও কিন্তু ভালো দিক না। এর কারণে অটোমেটিক্যালি কিন্তু দলের মধ্যে একটা বাজে প্রভাব পড়ে এবং ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স নিয়ে বাজে কথা ওঠে। কানা-ঘুষা হয়। এটা ছিল একটা ভুল সিদ্ধান্ত। আমি জানি না এটা কার ধারণা ছিল। কার মাথা থেকে এসেছে।

কোচকেও আমরা অতিমাত্রায় ক্ষমতা দিয়ে ফেলেছি এবং তার খেসারত হয়তো দেয়াও শুরু করেছি আমরা। তবুও বলবো, এখনও দুটো টি-টোয়েন্টি বাকি আছে। টেস্ট সিরিজ বাকি আছে। তাকিয়ে রইলাম সেই দুটি টি-টোয়েন্টি এবং টেস্ট ম্যাচের দিকে।

আইএইচএস/