সিলেটে ঘুরতে গিয়ে যা দেখা গেল
আমি খুবই কম ঘুরি। একদিন বন্ধুদের সাথে সিদ্ধান্ত হলো সিলেট যাওয়া হবে। যেই আমি চার বছরের চট্টগ্রামের জীবনে একবারও কক্সবাজার যাইনি; সেই আমি রাজি হয়ে গেলাম সিলেট যেতে। সঙ্গী হবে আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, জাকির হোসাইন এবং আতাউল্লাহ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যেতে চাইলেও কয়েকজনের ব্যস্ততায় শুক্রবারেই যেতে হয়। সবাই টিকিট আগেই কেটে রেখেছিল। আমি কাটতে গিয়ে দেখি সিট খালি নেই। মহা চিন্তায় পড়ে যাই। একবার ভাবি ওদের বলবো, ‘এবার তোমরা যাও। আমার তো টিকিট কাটা হলো না। কীভাবে যাবো?’ সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে হলো, চট্টগ্রাম থেকে টিকিট পাইনি তো কী হয়েছে? ফেনী থেকে তো থাকতে পারে। ফেনী থেকে না পেলেও ভাগ্য প্রসন্ন ছিল, নাঙ্গলকোট থেকে পেয়ে যাই। চট্টগ্রাম থেকে নাঙ্গলকোট দাঁড়িয়ে যেতে হবে। কিন্তু সিলেট পর্যন্ত হিসাব করলে এ তো সামান্য পথ। প্রবোধ দিই নিজেকে।
রাতে ঘুমানোর সময় সাড়ে পাঁচটায় অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। তবে আগেই উঠে গেছি। সবাইকে ডেকে আমরা তড়িঘড়ি ফজরের নামাজ পড়ে রেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। মাদরাসা থেকে বেরিয়ে মেইন রোডে আসতেই সিএনজি পেয়ে যাই। ট্রেন যেহেতু সাতটায়, এখন সাড়ে পাঁচটা, প্রায় দু’ঘণ্টার মতো সময় হাতে আছে। তাই একবার বাসে যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম। তবু বিপদ যেহেতু বলে-কয়ে হয় না, তাই সিএনজিতেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। পৌঁছতে তেমন সময় লাগল না। দেখলাম পয়তাল্লিশ-চল্লিশ মিনিটের মতো হাতে আছে। স্টেশনে প্রবেশ করে ট্রেন দেখে নিলাম। আগে আসার সুবিধা হলো কিছু সময় বসে থাকতে হলেও ট্রেন মিস হয় না। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার এক-দুই মিনিট পরে এলে সেই কষ্ট তো বহুগুণ বেশি হতো।
যেহেতু আমরা নাস্তা না করেই বেরিয়েছি, স্টেশনের আশেপাশেই কোথাও নাস্তা করে নিতে হবে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে থাকলাম। এত ভোরে দেখলাম হোটেলগুলো এখনো খোলেনি। আমরা পশ্চিম দিকে অন্তত দশ মিনিটের মতো হাঁটার পর বড় একটি হোটেল দেখলাম খোলা। হোটেলে প্রবেশ করি। এই সকালে আর কী খাবো! পরোটা আর হালুয়া নিলাম। কেউ-কেউ আলু-ভাজি নিলো। শেষে চা। হালুয়া অবশ্য পানসে লাগল। তবু সারাদিন ট্রেনেই থাকতে হবে, না খেয়ে আর কী করি!
স্টেশনের আদিম কোলাহল, মানুষের হইচই, কুলিদের ঠেলাগাড়ির টুংটাং উপেক্ষা করে আমরা ট্রেনে উঠে পড়ি। একটু পর সময় দেখে বুঝি, ট্রেন ছাড়তে আর দেরি নেই। আমরা প্লাটফর্মে প্রবেশ করে ট্রেনের নির্দিষ্ট আসনে বসে পড়ি। অনন্তর অব্যবহিত দু’বার সাইরেন বাজিয়ে ট্রেন চলতে থাকে সর্পিল গতিতে।
আমি চট্টগ্রাম থেকে টিকিট না পেয়ে নাঙ্গলকোট থেকে কেটেছিলাম। তাই নাঙ্গলকোট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যেতে হলো। ফেনী পর্যন্ত যাওয়ার পর একটু পা ধরলেও ফেনীর পর নাঙ্গলকোট পৌঁছতে তেমন সময় লাগল না। নির্দিষ্ট আসনে সারাদিনের জন্য বসলাম। ট্রেন চলতে থাকল। স্টেশনে স্টেশনে যাত্রীদের ওঠানামা, কুলিদের দৌড়াদৌড়ি, শিঙাড়া-সমুচা-চানাচুর বিক্রেতাদের হাকডাক ইত্যাদি দেখতে দেখতে সাড়ে পাঁচটার দিকে আমরা সিলেট রেল স্টেশনে পৌঁছাই। ততক্ষণে দুপুরের উষ্ণতা নেতিয়ে পড়েছে। প্রকৃতি অন্ধকারে ডুব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্টেশনের বামপাশেই একটি মসজিদ পাই। তড়িঘড়ি ওজু করে আসরের নামাজ পড়ে নিই। জোহরের নামাজ অবশ্য ট্রেনেই পড়েছি। ট্রেনযাত্রায় এ এক সুবিধা, নামাজের সময় হলে চিন্তা করতে হয় না। ওজু করে নামাজ পড়ে নেওয়া যায়। অন্য কোনো যানবাহনে এ সুবিধা নেই।
নামাজ শেষ করে সিএনজি করে আমরা হজরত শাহজালালের মাজারে এসে মাগরিবের নামাজ পড়ি। এবার রাতে কই থাকবো? তাই হোটেল ঠিক করার পালা। সাতপাঁচ ভেবে ও কিছুটা খোঁজ নেওয়ার পর হোটেলে উঠলাম। তিন রুম। দুই দিনে রুম প্রতি সাড়ে তিন হাজার। বুকিং করার সময় ম্যানেজার একে একে আমাদের সবার নাম, বাবার নাম ও মোবাইল নাম্বার এবং ঠিকানা লিখে রাখছিলেন। মনে হচ্ছিল যুদ্ধে যাওয়ার জন্য নাম লেখাচ্ছি।
আমরা ৬ জনের জন্য তিন রুম করে নিলাম। রুমে ব্যাগ-ট্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম রাতের খাবার খেতে। খেলাম ভাত, শুঁটকি ভর্তা আর গরুর গোস্তের ভুনা দিয়ে। ভালোই লাগল। তবে শুঁটকি ভর্তা ছিল অতিরিক্ত ঝাল। সিলেটিরা এমন অতিরিক্ত ঝাল খায় কি না তা আমার অবশ্য জানা নেই। বিধিবাম হলো শেষে গোস্তের ঝোল দিতে বলার পর। সেই ঝোল প্লেটে নিয়ে দেখি গোস্তে যেই ঝাল ছিল না, সেই গোস্তের ঝোল এমন অখাদ্য ঝালে ভরা। তবু খেয়ে শেষ করলাম।
রেস্টুরেন্টের বাইরে বসার ব্যবস্থা যেমন আছে, আছে ভেতরে ছাদের নিচে বসার ব্যবস্থাও। আমরা ভেতরেই বসেছিলাম। থেকে থেকে মনে হচ্ছিল বিল্ডিং ঘুরছে। সেই মনে হওয়া থেকে আমাদের কয়েকজনের মাথাও ঘুরছিল। কেউ কেউ অবশ্য বললো ক্লান্তির কারণে এমন লেগেছে। কিন্তু একই সাথে একাধিকজনের সাথে এমন হওয়ায় বিষয়টা কেমন যেন লাগল। খাবার শেষ করে আমরা কাউন্টারে বিল দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। এরপর হোটেলে ফিরে আসি। এশার নামাজ পড়ে ঘুমোই।
পরদিন শনিবার সকালে আমরা ভোরেই উঠি। নামাজ পড়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিই। এসেছি একদিনের জন্য। আজই যেখানে যেখানে যাওয়া যায়। কাল হয়তো কোথাও যাওয়ার সুযোগ হবে না। কারণ ট্রেন সকাল ১০টায়। আজ সকালে অন্য রেস্টুরেন্টে গেলাম। খেলাম খিচুড়ি। খারাপ লাগেনি।
গত রাতেই আমরা একটি ট্যাম্পু ভাড়া করে রেখেছিলাম সারাদিনের জন্য, ২৮০০ টাকায়। ইতোমধ্যে সেই ট্যাম্পু এসে অপেক্ষা করছে। উঠে বসলাম। আমাদের গন্তব্য প্রথমে রাতারগুল। রাতারগুল থেকে ফিরে ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর। রাতারগুল যাওয়ার রাস্তা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিস্তৃত চা বাগানগুলো দেখে যে কারো চোখ জুড়াবে। এক জায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম চা বাগান দেখার জন্য।
কোথাও ঢালু, কোথাও সেই ঢালু পাহাড়ের মতো ওপরে গেছে। সেই উঁচু-নিচু মাটিতেই চা গাছ। আশ্চর্য হলাম যখন দেখলাম চা গাছ ছোট হোক অথবা বড় সবগুলোর মাথা সমান। হয়তো সমান করে কেটে রাখা হয়। তবু দূর থেকে এই সমান করে কাটা যে কারো দৃষ্টি কাড়বে। চা বাগানে সিঙ্গেল ফটো ও গ্রুপ ফটো তুলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম রাতারগুলের উদ্দেশ্যে। সাতটা থেকে রাতারগুল আসতে আসতে আমাদের দশটার মতো বেজে গেল।
বনের বুক চিরে বয়ে গেছে একটি সরু নদী। সেই নদী ধরে এগিয়ে চলছে আমাদের ছোট নৌকা। নদীর হিমশীতল আবহাওয়া শরীরে দোলা দিচ্ছে। আমি নৌকা থেকে হাত পানিতে রেখে পানির শীতলতা অনুভব করছি। কী শীতল পানি! মাঝি গান ধরে,
‘উদাস দুপুর বেলা সখি
আসবে কি একেলা নদীর ঘাটে রে,
দেখতে তোমায় মন চাইছে
ও কি দেখতে তোমায় মন চাইছে।’
দু’পাশে যতদূর দৃষ্টি যায়, চোখে পড়ে শুধু বিশাল গাছ আর গাছ। চলতে চলতে আমরা হঠাৎ এক জায়গায় নৌকা দাঁড় করিয়ে বনে প্রবেশ করি। কিছুক্ষণ হাঁটি। কে যেন গাছগুলোকে হিজল গাছ বললো। পরে উইকিপিডিয়া থেকে জানতে পারি এগুলো হিজল গাছ নয় বরং করচ গাছ। শেষে আমরা ছবি তুলি। দলবদ্ধ ছবিও তোলা হয় কিছু। শেষে দুপুর দুটোর দিকে ফিরতে হলো রাতারগুল জলাবন থেকে। এবার যাওয়ার পালা ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর।
প্রায় এক ঘণ্টায় রাতারগুল থেকে আমরা পৌঁছি ভোলাগঞ্জ। এখান থেকে নদীপথে যেতে হবে সাদাপথর। কখন না কখন ফেরা হবে কিংবা কতদূর, কিছুই তো জানা নেই—সবাই বললো খাবার খেয়ে নিলে ভালো হয়। আমার তেমন ক্ষুধা না থাকলেও ওদের কথায় খেয়ে নিলাম। পরে ক্ষুধা লাগলেও যদি খেতে না পারি তারচেয়ে কম ক্ষুধায় খেয়ে নেওয়া ভালো। নেমে দেখলাম একে একে বহু হোটেল।
আমাদের ড্রাইভারের পরামর্শমতে আমরা এক হোটেলে বসলাম। নামটা মনে করতে পারছি না। হোটেলের দিকে এগিয়ে যেতেই লম্বা ও কৃশকায় ধরনের এক লোক এসে হজরত বলে কথা শুরু করলেন আমাদের সাথে। জানালেন তিনি দাম কমিয়ে রাখবেন। ড্রাইভারও যেহেতু এ হোটেলের কথা বলেছিল, আমরা কথা না বাড়িয়ে ঢুকে পড়ি। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসি। অর্ডার দিই ভাত, মাছ, মুরগি আর কেউ গরুর গোস্ত নেয়। কিন্তু ভাত দেখে প্রথমেই হতাশ হই। এই ভাত তো বাড়িতেও খাই না। আমি নিয়েছিলাম মাছ, মাছেরও একই অবস্থা। ভেতরে স্বাদ নেই। একাধিকবার জ্বাল দেওয়ার কারণে সম্ভবত এমন হয়েছে। কিছু বলে লাভ নেই। কোনোরকম খেয়ে শেষ করলাম।
এরপর আমরা নৌকার জন্য টিকিট কাটি। নৌকা চলতে থাকে পানি কেটে কেটে। মনে হলো, ভ্রমণের সময়গুলোই তো জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত, যা বরফের মতো গলে গলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। যদি সময়কে বেঁধে রাখা যেত, তাহলে প্রকৃতির মুগ্ধতা দেখে জীবনটা কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু সে কি আর সম্ভব!
নৌকায় বসে বসে নদী থেকে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখি। বালু উঠিয়ে বিশেষ নৌকায় করে সেগুলো পাড়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকৃতির হেঁয়ালিপনা, মানুষের বিচিত্র পেশা আর পানি দেখতে দেখতে একসময় আমরা সাদাপথর পৌঁছাই। নৌকা থেকে নামলেও মূল পাথরের জায়গা আরও দূরে। সেই পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। আমরা হাঁটতে শুরু করি বালুর মধ্যে। শুরুর দিকে বালু কম থাকলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ক্রমান্বয়ে পাও বালুতে ডেবে যেতে চায়। তবু ক্লান্তি ভুলে হাঁটতে থাকি। আধা ঘণ্টা কি পৌনে এক ঘণ্টা পর আমরা সাদাপথরের মূল জায়গায় পৌঁছাই।
জোহরের নামাজ যেহেতু পড়তে পারিনি, নদীর ওপারে সীমান্তঘেঁষা ছোট একটি মসজিদ চোখে পড়ে, সেখানেই পড়া যায়। এতক্ষণ হেঁটেছি বালুতে। এখন পাথরের ওপর হাঁটতে হাঁটতে পায়ের অবস্থা ভালো নেই। পথ আর শেষ হয় না। আবার শুকনো পাথরের পর পানির স্রোত। অতি সতর্কতার সাথে না চললে পরে যাবো নিশ্চিত। পরার কাপড় ছাড়া অতিরিক্ত কাপড়ও সাথে আনিনি। হাঁটতে হাঁটতে এপারে মসজিদটিতে এলাম। মসজিদ নদী থেকে বেশ উঁচুতে। ছোট মসজিদ। পাশেই ভারতের সীমান্ত। কিছুটা আগ্রহ ও কিছুটা উত্তেজনা নিয়ে আমরা মসজিদে গেলাম। ওজু করে নামাজ পড়লাম। এরপর নদীতে ফিরে এলাম।
সাদাপাথরে মনে হয় অজস্র ছোট-বড় পাথর যেন বিছিয়ে রাখা। সাথে পানির সশব্দ স্রোত। উত্তর ও পুবে সবুজাভ পর্বতশ্রেণির মুগ্ধকর দৃশ্য। এর চেয়ে মুগ্ধকর দৃশ্য কী আর হতে পারে! অনেক মানুষ দেখলাম নদীর শীতল পানিতে গোসল করছে। আমরা করলাম না। হাঁটলাম। পানি নিয়ে খেললাম। কিছু ছবি তোলা হলো। এভাবেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এবার আমাদের ফিরতে হবে।
আসরের নামাজ এখনো পড়তে পারিনি। যদি নামাজ পড়তে আবারও ওপারের মসজিদে যাই, অনেক দেরি হয়ে যাবে। এদিকে নৌকাগুলো সন্ধ্যার আগেই চলে যায়। আমরা একটি টং দোকানের পাশে দোকান ঢেকে রাখার ত্রিপল বিছিয়ে আসরের নামাজ পড়লাম। মাঝি আসতে দেরী করায় মাগরিবের নামাজও এভাবেই পড়তে হলো। এরপর মাঝি এলে আমরা নৌকায় উঠি। সন্ধ্যার শীতল হাওয়া, তার সাথে মেশিনচালিত নৌকার ঘরঘর এবং চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসা পরিবেশে পয়তাল্লিশ মিনিট কি এক ঘণ্টায় আমাদের নৌকা নোঙর করে।
ভোলাগঞ্জ থেকে ফিরে সন্ধ্যায় আমরা হজরত শাহজালালের মাজারে গেলাম। মাজার শরিফে প্রবেশ করতেই বুক বেয়ে কেমন উত্তেজনা ও কৌতূহলের শীতল স্রোত বয়ে গেল। আমরা হেঁটে মাজারের পুরো আঙিনা উৎসুক চোখে দেখি। কিছুক্ষণ মোবাইলের ক্ষীণ আলোয় পুকুরের মাছ দেখার চেষ্টা করি, আবছা আলোয় হলেও মাছের দেখা মেলে। জালালি কবুতরও দেখতে পাই। ছোটকালে এই কবুতরের কথা কোনো এক বইয়ে পড়েছিলাম; নামটা মনে করতে পারছি না। তখন এই কবুতর দেখার কৌতূহল জেগেছিল খুব, আজ মনে পড়ল।
সবশেষে আমরা মাজার শরিফ জিয়ারত করতে যাই। মাজার মসজিদের উত্তর পাশের সিঁড়ি হয়ে পশ্চিম-উত্তরে। পশ্চিম পাশে যাওয়ার পর দুটো কবর চোখে পড়ল। মূল মাজার এরও পুবে। মাজারে দক্ষিণে একত্রে বেশ কয়েকটি কবর দেখলাম। আর মূল মাজার বড় করে বানানো। ওপরে কাপড় দেওয়া। দেখলেই বোঝা যায়। মাজারে যাওয়ার প্রবেশমুখে দেখি দাড়ি-টুপিঅলা একজন বৃদ্ধ বসা। তিনি আমাদের মাজার দেখিয়ে দিলেন।
ভেতরে প্রবেশ করার পর মনটা কেমন উতলা হয়ে উঠল হঠাৎ করে। কেমন বর্ণনাতীত অনুভূতির উদয় হলো। প্রথমেই চারপাশ হেঁটে দেখলাম। দেখি মাজারের পূর্বপাশেও আরও একটি কবর আছে। আর এ অংশের পূর্বপাশের পুরো দেওয়ালেই ছোট ছোট খোপে অসংখ্য মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা এবং দক্ষিণ পাশেও। এ ছাড়া মূল মাজারেও মাথার দিকে কিছু মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা। আমরা অন্যদের মতো জিয়ারত করি। একবার সুরা ফাতিহা ও তিনবার ইখলাস পড়ে দোয়া করি। জিয়ারত শেষে মাজার থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে সাধারণ কবরস্থানে যাই। এখানেও দোয়া করি। তারপর ফিরি। ফিরলেই কি আর ফেরা হয়? কেমন উতলা হয়ে থাকে মন, সেই আবেশ যেন থেকে যায় আমার সাথে; এই, এখনো, আমাকে আরও যেতে প্ররোচিত করছে।
ভোলাগঞ্জ থেকে ফিরতে ফিরতে আমাদের প্রায় পৌনে সাতটা হয়ে গেল। এত দেরি অবশ্য হতো না, আরও ঘণ্টাখানেক আগেই পৌঁছতে পারতাম। কিন্তু টেকুর বাজারে আমরা রাতের খাবার খেয়ে নিয়েছি; যেন খবারের জন্য আবার কোথাও যেতে না হয়। এভাবেই মূলত দেরী হয়। বাসায় ফিরেই আমি প্রথমে বন্ধ হয়ে যাওয়া মোবাইল চার্জ দিলাম। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হলাম। এরপর পাঞ্জাবি পরে সাথে সাথেই বের হলাম।
পৌনে সাতটার দিকে বন্দরবাজারে কালান্তর প্রকাশনীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। কালান্তর প্রকাশনী আমার অনূদিত ‘মুসলিম বিশ্বে আধুনিকতাবাদ ও তার প্রবক্তারা’ প্রকাশ করেছে। ঢাকায় শাখা থাকলেও ওদের মূল ঠিকানা সিলেট। আবার কখন আসবো তার ঠিক নেই। এখন যেহেতু এসেছি, তাই মনে হলো ঘুরে যাই।
তাদের অফিস বশির কমপ্লেক্সের পঞ্চমতলায়। পঞ্চমতলায় এসে দেখি অফিস এখনো খোলা। আসার আগে কাউকে বলে না আসায় দ্বিধান্বিত ছিলাম খোলা আছে, না বন্ধ হয়ে গেছে। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ইলিয়াস মশহুদ ভাইকে কল করলাম। বললাম, ‘আমি অফিসে এসেছি। আপনি কই?’ বললেন, ‘আমি দশ মিনিটের মধ্যে অফিসে আসছি।’ তিনি গ্রামের বাড়ি থেকে আগেভাগে চলে এসেছেন। আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম।
আবুল কালাম আজাদ ভাইকে সালাম দিয়ে দেখা করলাম। দেখলাম আরও কয়েকজন বসে আছেন তার পাশে। যাদের চিনি না। ইতোমধ্যে ইলিয়াস মশহুদ ভাই এলেন। দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম, ‘কেমন আছেন’। দ্বিধা নিয়েই প্রশ্ন করলেন, মনে হলো আমি শাকের কি না। সামান্য কিছু কথা হলো। পরে তিনি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমি আবুল কালাম আজাদ ভাইয়ের পাশে বসলাম। এলোমেলো অনেক কথা হলো। ফেরার সময় তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লেন কী বই দেবেন। ড. গওহার মুশতাকের ‘ইন্টেলিজেন্স হার্ট’ এবং আবু লুবাবা শাহ মানসুরের ‘সিক্রেটস অব ইয়াহুদিজম’ দিলেন।
রোববার সকালে আমাদের ফেরার পালা। প্রতিদিনের মতো এই রাতও গল্পে-আড্ডায় কেটে গেল। ঘুমালাম খুবই অল্প সময়। চোখে ঘুম, তবু ঘুমোতে মনে চায় না। এভাবে ফজর হয়ে গেল। ফজরের নামাজ পড়ে আমরা শেষবারের মতো হজরত শাহজালালের মাজারে গেলাম। ভোরের কোলাহলহীন পরিবেশে মসজিদসহ পুরো আঙিনা ঘুরে দেখলাম। মাজারের পশ্চিম পাশের রাস্তা ধরে কিছুদূর হেঁটেও এলাম সবার সাথে। শেষে মাজারের পূর্বপাশের লাগোয়া হোটেলটিতে নাস্তা করে বাসায় ফিরে এলাম।
যেই পাহাড়িকা এক্সপ্রেসে এসেছি, সেই পাহাড়িকা এক্সপ্রেসেই আজ ফিরবো। মাজার থেকে ফিরতে ফিরতে আমাদের সাড়ে নয়টা হয়ে গেল। অথচ ট্রেন দশটায়। ত্রিশ মিনিটে স্টেশনে পৌঁছতে হবে। দাঁড়িয়াপাড়া থেকে আমরা রিকশাযোগে সরাসরি স্টেশনে পৌঁছলাম। এসে দেখলাম তখনো পনেরো মিনিট বাকি। কিছুটা খুশি হলাম, যদিও সেই খুশি পরক্ষণে আর রইলো না ট্রেনের বিলম্বের কারণে। আসনে বসে রইলাম। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার কোনো নাম-নিশানা নেই। এভাবে বসে থাকতে থাকতে দশটার ট্রেন সাড়ে এগারোটায় ছাড়ল। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম—তবুও ছেড়েছে।
ট্রেন চট্টগ্রাম ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত দশটা হয়ে গেল। চট্টগ্রাম স্টেশনে এসে আব্দুল্লাহকে বিদায় জানালাম। ও কক্সবাজার চলে যাবে। আর আমি চট্টগ্রামেই থেকে যাবো।
লেখক: শিক্ষার্থী, বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসা, চট্টগ্রাম।
এসইউ