ওয়েস্ট লাফায়েতে দশ দিন, যুক্তরাষ্ট্রকে কাছ থেকে দেখা
আজ যুক্তরাষ্ট্রে আমার দশ দিন পূর্ণ হলো। ইন্ডিয়ানার শান্ত ও পরিচ্ছন্ন শহর ওয়েস্ট লাফায়েতে মেয়ের বাসায় কাটানো সময়টুকু শুধু বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নয় বরং ভিন্ন সমাজব্যবস্থা ও নাগরিক সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার অনন্য সুযোগ। দূর থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে যতটা আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যস্ত মনে হতো, বাস্তবে এসে তার চেয়েও বেশি মুগ্ধ হয়েছি এখানকার মানুষের শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্বশীলতা, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ দেখে। মনে হয়েছে, উন্নত সমাজ শুধু অর্থনৈতিক শক্তিতে তৈরি হয় না বরং মানুষের দৈনন্দিন আচরণ ও মূল্যবোধই একটি দেশকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করে তোলে।
ওয়েস্ট লাফায়েত শহরটি খুব বড় নয়, কিন্তু অত্যন্ত গোছানো ও সুশৃঙ্খল। চারদিকে সবুজ গাছপালা, পরিচ্ছন্ন রাস্তা, ছিমছাম বাড়িঘর আর নিরিবিলি পরিবেশ যেন মনকে আলাদা প্রশান্তি দেয়। সকালে হাঁটতে বের হলে দেখা যায়, কেউ দ্রুত পায়ে কাজে যাচ্ছেন, কেউ সাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে ছুটছেন, আবার কেউ প্রিয় পোষা কুকুর নিয়ে নিরিবিলি হাঁটছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোথাও অযথা হর্নের শব্দ নেই, চিৎকার নেই, বিশৃঙ্খল যানজট নেই। সবকিছু যেন নীরব শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে চলছে। শহরের এই শান্ত ছন্দ মানুষকে অজান্তেই সংযত ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
এখানে এসে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হলো আমেরিকানদের নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি। একদিন সকালে হাঁটতে বের হয়ে রাস্তা পার হওয়ার জন্য ক্রসওয়াকের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। তখনো আমি রাস্তার ওপর নামিনি, কিন্তু বেশ দূরে থাকা একটি গাড়ি ধীরে ধীরে থেমে গেল। চালক হাসিমুখে হাতের ইশারায় আগে যেতে বললেন। আবার এক রাতে দেখলাম, চারপাশে তেমন কোনো গাড়ি না থাকলেও মানুষ ধৈর্য ধরে ট্রাফিক সিগন্যাল সবুজ হওয়ার অপেক্ষা করছে। মুহূর্তগুলো আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এখানে আইন মানা কেবল শাস্তির ভয়ে নয় বরং এটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও সামাজিক সচেতনতার অংশ। এই ছোট ছোট আচরণই আসলে একটি উন্নত নাগরিক সমাজের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।

ওয়েস্ট লাফায়েতে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতার বিষয়টিও চোখে পড়ার মতো। রাস্তাঘাট, পার্ক কিংবা আবাসিক এলাকার কোথাও ময়লার স্তূপ চোখে পড়ে না। একদিন দেখলাম, একটি ছোট শিশু চকলেটের মোড়ক হাতে নিয়ে বেশ কিছু দূর হেঁটে ডাস্টবিনে ফেললো। তার মা পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। তখন বুঝলাম, পরিবেশ সচেতনতা এখানে শুধু সরকারি নিয়ম নয়, পারিবারিক শিক্ষারও অংশ। বাড়ির সামনে ছোট ছোট বাগান, ছাঁটা ঘাস আর পরিচর্যা করা গাছপালা শহরটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করে রাখার বিষয়টিও মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করে। পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহারেও রয়েছে সচেতন সংযম। মনে হয়েছে, প্রকৃতিকে ভালোবাসার এই সংস্কৃতিই শহরটিকে এত নির্মল ও প্রাণবন্ত করে রেখেছে।
এখানকার মানুষের শিষ্টাচারও আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। দোকানে ঢুকতেই অপরিচিত মানুষ হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানায়। একদিন সুপারশপে ভুল করে একজনের গায়ে হালকা ধাক্কা লেগে গেল। তিনি বিরক্ত না হয়ে উল্টো হাসিমুখে বললেন, ‘ইটস ওকে।’ আবার ক্যাশ কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন থাকলেও কোথাও কারো মধ্যে অস্থিরতা বা আগে যাওয়ার চেষ্টা নেই। সবাই ধৈর্য ধরে নিজের পালার অপেক্ষা করছেন। মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করার বিষয়টিও এখানে খুব স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ। এসব ছোট ছোট দৃশ্য দেখেই মনে হয়েছে, উন্নত সমাজ শুধু বড় বড় স্থাপনা দিয়ে গড়ে ওঠে না, মানুষের ভদ্রতা, সহনশীলতা ও মূল্যবোধই একটি সমাজকে সত্যিকারের সভ্য করে তোলে।
ওয়েস্ট লাফায়েতে অবস্থানকালে পারডু বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। বিশাল ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত চলাফেরা, আধুনিক গবেষণাগার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পরিবেশ এবং প্রাণবন্ত একাডেমিক সংস্কৃতি দেখে সহজেই বোঝা যায়, কেন যুক্তরাষ্ট্র শিক্ষা ও গবেষণায় এত এগিয়ে। এখানে শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, বাস্তবজীবনের দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও গবেষণাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। পুরো পরিবেশটিতেই যেন ভবিষ্যৎ নির্মাণের নিরন্তর প্রস্তুতি কাজ করছে।

আরেকটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে, তা হলো এখানকার দেশপ্রেমের প্রকাশ। এই দেশপ্রেম অনেক ক্ষেত্রে নীরব কিন্তু বাস্তব ও কার্যকর। প্রায় প্রতিটি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত বাড়ির সামনে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা উড়তে দেখা যায়। তবে শুধু পতাকা টানানোর মধ্যেই তাদের দেশপ্রেম সীমাবদ্ধ নয়। একদিন দেখলাম, এক বৃদ্ধ নিজবাড়ির সামনের শুকনো পাতা নিজ হাতে পরিষ্কার করছেন। আবার আরেকদিন রাস্তার পাশে কেউ গাড়ি থেকে নেমে পড়ে থাকা একটি প্লাস্টিকের বোতল তুলে ডাস্টবিনে ফেললেন। তখন মনে হলো, এখানকার মানুষ দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনকেই প্রকৃত দেশপ্রেম বলে মনে করে।
আইন মেনে চলা, কর প্রদান, পরিবেশ রক্ষা কিংবা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাও তাদের কাছে দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। একইসঙ্গে এখানকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বেশ ভিন্নধর্মী। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও জনজীবনে অস্থিরতা বা সহিংসতার প্রকাশ খুব কম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্রিক। দলীয় রাজনীতির দৃশ্যমান প্রভাব সেখানে নেই বললেই চলে। মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও অনেকটাই নীরব ও নিয়মতান্ত্রিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোথাও দেওয়াল লিখন, পোস্টার বা ব্যানার চোখে পড়ে না। সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়েছে, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও নীরব নাগরিক সচেতনতাই এখানে দেশপ্রেমের অন্যতম বড় প্রকাশ।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার সবকিছু যে নিখুঁত, তা নয়। এখানে মানুষের জীবন অনেকটাই ব্যস্ত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমাদের দেশের মতো সহজ ও ঘনিষ্ঠ মেলামেশা তুলনামূলক কম। অনেক সময় মানুষ নিজের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তারপরও এই সমাজের কিছু ইতিবাচক দিক যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য নিঃসন্দেহে শিক্ষণীয় হতে পারে।

ওয়েস্ট লাফায়েতে কাটানো এই দশ দিন আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। উন্নত সমাজ শুধু অর্থ দিয়ে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে নিয়ম মানার সংস্কৃতি, নাগরিক দায়িত্ববোধ, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সচেতনতা, শিষ্টাচার এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের দীর্ঘ চর্চা। বাংলাদেশেও মানুষের আন্তরিকতা, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সহমর্মিতা রয়েছে। যদি এর সঙ্গে আরও কিছু শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও নাগরিক সচেতনতা যুক্ত করা যায়, তাহলে আমাদের সমাজও আরও সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও মানবিক হয়ে উঠতে পারে।
বিদেশ ভ্রমণের প্রকৃত সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই নিহিত। শুধু নতুন শহর দেখা, পরিচিত পরিবেশের বাইরে কিছু সময় কাটানো কিংবা আধুনিক স্থাপনা ঘুরে দেখাই ভ্রমণের আসল অর্জন নয়। বরং অন্য একটি সমাজের জীবনধারা, নাগরিক সংস্কৃতি, শৃঙ্খলাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধকে কাছ থেকে দেখে নিজেকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ তৈরি হয়। ভিন্ন দেশের মানুষের দৈনন্দিন আচরণ, দায়িত্ববোধ, সময়ের মূল্য দেওয়ার অভ্যাস কিংবা পারস্পরিক সম্মানের সংস্কৃতি মানুষকে নীরবে ভাবতে শেখায়।
ওয়েস্ট লাফায়েতে কাটানো এই দশ দিন তাই আমার কাছে শুধু একটি বিদেশ ভ্রমণের স্মৃতি নয় বরং গভীর জীবন অভিজ্ঞতার নাম। ওয়েস্ট লাফায়েতে কাটানো এই সময় তাই আমার কাছে শুধু একটি ভ্রমণ নয়, জীবনকে নতুন চোখে দেখার অনন্য ও গভীর উপলব্ধির অভিজ্ঞতা। মনে হয়েছে, একটি সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য তার উঁচু দালান বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয় বরং মানুষের আচরণ, মূল্যবোধ ও নাগরিক দায়িত্ববোধের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। এই অভিজ্ঞতা হয়তো দীর্ঘদিন আমাকে ভাবাবে এবং নিজের সমাজ ও জীবনকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে।
- আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াবাশ নদীর তীরে শান্তির ঠিকানা
যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ: বাংলাদেশি গবেষকের হৃদয়বিদারক ঘটনা
এসইউ