অস্ট্রেলিয়ার ক্যানোলা ফিল্ডের সন্ধানে

ভ্রমণ ডেস্ক
ভ্রমণ ডেস্ক ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৪৭ পিএম, ১০ অক্টোবর ২০২০

মো. ইয়াকুব আলী

স্কুল হলিডে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বাচ্চাদের অনেক জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকে। অভিভাবকরা সেটা বাস্তবায়ন করেন। এবারের স্কুল হলিডেতে কোথায় যাওয়া যায়, সেটা নিয়ে আগে থেকেই ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছিলাম আমরা চার পরিবার। বন্ধু আশিক, লাবণ্য ভাবি, আর তাদের দুই সন্তান আয়ান এবং ইথান; বন্ধু আসাদ, কুমু ভাবি আর তাদের তিন সন্তান সামিহা, আফিফ এবং তুফা; বন্ধু গালিব, সুজানা এবং তাদের মেয়ে লিয়ানা আর আমাদের পরিবারের চার জন মিলে পরিকল্পনা করা হলো, আমরা এবার ক্যানোলা ফিল্ড দেখতে যাবো। অস্ট্রেলিয়ায় এখন চলছে বসন্তকাল। চারিদিকে গাছে গাছে নতুন পাতা আর শাখে শাখে দেখা দিয়েছে বাহারি রঙের এবং গন্ধের ফুল। ক্যানোলা ক্ষেতগুলোতে রাশিরাশি হলুদ ফুল ফুটেছে। পাখির চোখে দেখলে মনে হবে, যেন পুরো এলাকা একটা হলুদ সমুদ্র।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হলো আশিকের কাঁধে। সে-ই আমাদের সব রকমের ভ্রমণের পরিকল্পনাকারী, সাথে গাইডও। কারণ ও আগে থেকেই সেসব জায়গায় হয় গিয়েছে না হলে বিস্তারিত পড়াশোনা করে তথ্য জোগাড় করেছে। পরিকল্পনা করা হলো, আমরা সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবার যাত্রা করে রোববার ফিরবো। গন্তব্য হিসেবে ঠিক করা হলো ওয়াগাওয়াগা। সেখানে সিডনির বিখ্যাত ক্যানোলা ট্রেইল আছে। আমরা শুক্রবার বিকেলে রওয়ানা দিয়ে দিলাম। মোট সাড়ে চার ঘণ্টার ভ্রমণ। আশিক ঠিক করে রেখেছিল, আমরা প্রথম যাত্রাবিরতি নেবো গোলবার্নের রকি হিল ওয়ার মেমরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামটি একটি সুউচ্চ পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত। সেখানে পৌঁছেই বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলো। আমরা বড়রাও একটু হাঁটাহাঁটি করে হাত-পায়ের জড়তা কাটিয়ে নিলাম। তারপর আবার রওনা দিলাম। বন্ধু গালিব সপরিবারে গোলবার্নে থাকে। সেও আমাদের সাথে যোগ দিলো।

Australia

রকি হিল ওয়ার মেমরিয়াল এবং মিউজিয়াম প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারী-পুরুষের স্মৃতিতে ১৯২৫ সালে খুলে দেওয়া হয়। এখানে যুদ্ধের বহু পুরাতন সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়। যার মধ্যে ১৬টি জাতীয় স্বাক্ষর সম্বলিত। এটা সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত খোলা থাকে। মূল স্মৃতিস্তম্ভটি একটা বর্গাকৃতির ১৯.৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট ওয়াচ টাওয়ার। পাশেই রয়েছে জাদুঘর। জাদুঘরে নিয়মিত অন্যান্য প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিভিন্ন উপলক্ষে বিভিন্ন রকমের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। আমাদের পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। তাই আর ভেতরে ঢুকতে পারিনি। তবুও সেখান থেকে পুরো গোলবার্ন শহরের ভিউ দেখতে পেলাম। সূর্য ডুবে পশ্চিমের আকাশ লাল হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে গোলবার্ন শহরের বৈদ্যুতিক বাতিগুলো জ্বলে উঠলো। তখন মনে হলো, যেন আকাশের মিটিমিটি তারাগুলো গোলবার্ন শহরের উপর নেমে এসেছে।

আমরা আবার চলতে শুরু করলাম। এরপরের বিরতি ইয়াস ভ্যালির ম্যাকডোনাল্ডসে। সেখানে গিয়ে গাড়ি থামিয়ে নামতেই বিশাল পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। ম্যাক থেকে আমরা বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবার আর বড়দের জন্য কফি নিয়ে নিলাম। ম্যাকের আলোয় চাঁদের সৌন্দর্য ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না। এরপর আবার আমরা চলতে শুরু করলাম। তখন বুঝতে পারলাম চাঁদের আলো আজ কতটা তীব্র। চাঁদের আলোয় মোটরওয়ের রাস্তাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। আমাদের পাশ দিয়ে আরও অনেক গাড়ি চলে যাচ্ছিল। এরপর একসময় আমরা মূল মোটরওয়ে ছাড়িয়ে ওয়াগাওয়াগা যাওয়ার রাস্তায় নেমে পড়লাম। আশিক বলেছিল, এই রাস্তায় মাঝেমধ্যে গাড়ির সামনে ক্যাঙ্গারু এসে পরে। তাই আমি সামনে থাকছি, তোমরা আমাকে ফলো করে এসো। ওয়াগাওয়াগা যাওয়ার রাস্তাটাতে গাড়ির তেমন চাপ নেই। চাঁদের আলোয় অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল। অবশ্য চাঁদের আলোয় সব কিছুই কেমন যেন রহস্যময় মনে হচ্ছিল। এরপর আমরা একময় আমাদের গন্তব্য ‘দ্য রেড স্টিয়ার হোটেলে’ পৌঁছে গেলাম।

Australia

আমাদের হোটেলের বর্ণনাটা এখানে একটু দিয়ে রাখা দরকার। ওয়াগাওয়াগা জায়গাটা আমাকে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। মূল রাস্তা থেকে বেশ ভেতরে ঘর-বাড়িগুলো। বাড়িগুলোর পেছনেই অবারিত খোলা সবুজ মাঠ। আমাদের হোটেলটা একটা রাস্তার একেবারে শেষপ্রান্তে। এরপর থেকে সবুজ মাঠের শুরু। হোটেলের পাশ দিয়ে একটা সরু পিচঢালা রাস্তা সবুজ মাঠটাকে দু’ভাগ করে দিয়ে বয়ে চলেছে। হোটেলটা ইংরেজি এল অক্ষরের আকৃতির। মাঝখানে খোলা উঠান। হোটেলের উঠানে এসে দাঁড়ালে মনে হয়, যেন আপনি বাংলাদেশের গ্রামের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন। উপরে বিশাল নক্ষত্ররাজি আর নিচে মাটির বিছানা। আমরা উঠলাম এল অক্ষরের শেষের দিকের একসারি কক্ষগুলোর পাশাপাশি পাঁচটা কক্ষে।

পরদিন সকালবেলা উঠে নাস্তা খেয়েই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। ওয়াগাওয়াগার আবহাওয়াটা মজার। দিনের বেলায় তাপমাত্রা ত্রিশের উপরে উঠে গেলেও রাত্রে সেটা দশের নিচে নেমে আসে। তাই আপনি ওখানে যেতে চাইলে গরম এবং ঠান্ডা দু’ধরনের আবহাওয়ার জন্যই কাপড় নিতে হবে। আমাদের গন্তব্য তেমরার ক্যানোলা ট্রেইল। রাস্তাটার দু’পাশেই অবারিত ক্যানোলার ক্ষেত। দেখে মনে হবে, চারিদিকে সোনা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। কোলামন, তেমোরা এবং জুনি এ তিনটি জায়গায়ই সবচেয়ে বেশি ক্যানোলার চাষ করা হয়। ক্যানোলা ট্রেইলে পৌঁছে একটু হতোদ্যম হয়ে গেলাম। কারণ ক্যানোলা ঠিকই আছে কিন্তু সেগুলো সোনালি হলুদ ফুল থেকে সবুজ ফলে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

Australia

ক্যানোলা ফুলের দেখা না পেলেও সমগ্র ড্রাইভটি ছিলো খুবই উপভোগ্য। সরু রাস্তার দু’পাশে অবারিত সবুজ। আর সেই সবুজের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ একটা দু’টো গাছকে দেখে মনে হবে, যেন সে ক্ষেত পাহারা দিচ্ছে। কোনো কোনো মাঠে দলবেঁধে ভেড়া, গরু বা ছাগল চড়ে বেড়াচ্ছে। তবে ভেড়ার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আবার কোনো কোনো জায়গা গাঢ় বেগুনি বর্ণে ঢাকা পড়েছে। দেখে মনে হবে, কোনো শিল্পী তার বেগুনি বর্ণের রংটা ইচ্ছেমতো সবুজের জমিনে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ গাঢ় বেগুনি বর্ণের ফুলকে বলে প্যাডক ফ্লাওয়ার, এগুলো আসলে একধরনের আগাছা। বসন্তকালে আগাছাটি অস্ট্রেলিয়ার সর্বত্রই দেখা যায়। উঁচু উঁচু পাহাড়ের গায়ে এ গাঢ় বেগুনি বর্ণের রং আপনাকে বাধ্য করছে গাড়ি থামিয়ে কিছু সময়ের জন্য হলেও অবাক তাকিয়ে থাকতে।

কান্ট্রি সাইডের এ জায়গাগুলোয় মানুষের বসতি খুবই কম। তাই রাস্তাঘাটে মানুষজন গাড়ি-ঘোড়া দু’টোই কম। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা আমাকে খুবই টানে। আসলে সারা পৃথিবীতেই গ্রামীণ জীবনপদ্ধতি এখনো অনেক ঢিলেঢালা। শহরে যেখানে মানুষ সময়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত; সেখানে গ্রামের মানুষের ভাবনায়ও এগুলো নেই। সময় আর মানুষ দু’জনের কারোরই যেন তাড়া নেই। তাই তারা হাত ধরাধরি করে ঢিমেতালে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা রাস্তার পাশে থেমে কখনো বুনোফুল তুললাম আবার কখনো বাচ্চাদের রেললাইন চেনালাম। শহরে তো রেললাইনের ধারে-কাছে যাওয়ার উপায় নেই কিন্তু গ্রামে রেললাইনের উপর দিয়ে হেঁটে গেলেও দেখার কেউ নেই।

Australia

এভাবে ঘুরে ঘুরে আমরা কোলামন, তেমোরা এবং জুনির বিভিন্ন রাস্তা পেরিয়ে ফেরা শুরু করলাম। যাওয়ার সময় মূল রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে বড় দুইটা ক্যানোলার ক্ষেত দেখে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে আমরা সেখানেই থামবো বলে পরিকল্পনা করলাম। মূল রাস্তা থেকে আধা পাকা রাস্তা চলে গিয়েছে ক্ষেতের মধ্য দিয়ে। যেটাকে এখানকার ভাষায় বলে গ্রাভেল রোড। আমরা ধুলো উড়িয়ে সেই রাস্তা দিয়ে অবশেষে ক্যানোলা ফিল্ডের কাছে পৌঁছে গেলাম। প্রায় বুক সমান উঁচু ক্যানোলার ক্ষেতে ছোট ছোট সোনালি হলুদ ফুল ফুটে আছে। শতশত মৌমাছি গুঞ্জন তুলে ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করছে। ক্ষেতের প্রায় মাঝখানে বৃত্তাকার একটু খোলা জায়গা। সবার আগে বাচ্চারা দৌড়ে সেখানে চলে গেলো। এরপর বড়রা। সেখানে গিয়ে সবাই যে যার মতো পছন্দসই পোজ দিয়ে ছবি তুলতে শুরু করলো। আসলে এ সৌন্দর্য এতটাই বিশাল যে, সেটাকে ক্যামেরায় ধারণ করা মোটেও সম্ভব নয়, শুধু উপভোগ করা সম্ভব। আমরা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সেই সৌন্দর্য অবলোকন করতে লাগলাম।

এরপর সেখান থেকে ফিরে সরাসরি ‘লেক আলবার্ট’ চলে গেলাম। লেকের পানিতে অস্তগামী সূর্যের লাল আভা এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ তৈরি করলো। পরদিন আমরা সকালবেলা শুরুতে গেলাম ওয়াগাওয়াগার বোটানিক গার্ডেনে। সেখানে হরেক রকমের গাছ-ফুল দেখার পাশাপাশি বাচ্চারা ‘পনি রাইড’ করলো। এরপর আমরা ফিরতে শুরু করলাম। ফেরার পথে গুন্ডাগাই থেমে ঐতিহাসিক ‘প্রিন্স আলফ্রেড’ কাঠের সেতু দেখার পরিকল্পনা কিন্তু করোনার কারণে দূরে দাঁড়িয়েই শুধু দেখতে হলো। পাশেই একটা রেলসেতু সেটাও কাঠের তৈরি। মুরুমবিডগি নদী পার হওয়ার জন্য এ সেতু দুটি তৈরি হয়েছিল যথাক্রমে ১৮৬৬ সালে এবং ১৯০২ সালে। পরবর্তীতে এগুলো পরিত্যক্ত হয়ে গেলে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। অবশ্য আপনি এ সেতুগুলোতে চড়তে পারবেন না। নবনির্মিত প্ল্যাটফর্ম ধরে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত গিয়ে দু’চোখ ভরে উপভোগ করতে পারবেন মানব সভ্যতার বিবর্তনের সাক্ষী এ সেতুর অপার সৌন্দর্য।

Australia

এরপর আমরা একবারে এসে বিরতি নিলাম গোলবার্নে। গোলবার্নে আছে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ভেড়ার ভাস্কর্য ‘দ্য বিগ ম্যারিনো’। এটা স্থাপন করা হয় অস্ট্রেলিয়ার মসৃণ তন্তু উৎপাদনের প্রতীক হিসেবে। ভেড়াটি কংক্রিট এবং ইটের সমন্বয়ে তৈরি। তিন তলা ইমারতের সমান উঁচু। আমরা এর পাশের তেলের পাম্প থেকে তেল নেওয়ার ফাঁকে বিগ ম্যারিনোর সাথে ছবি তুলে নিলাম। এভাবেই আমাদের একটা অনেক আনন্দময় সফর শেষ হলো। আমরা বড়রা না যতবেশি উপভোগ করেছি; তার চেয়ে বেশি উপভোগ করেছে বাচ্চারা। এ ভ্ৰমণ থেকে একটা বিষয় বুঝেছিলাম, সেটা হলো বাচ্চারা যতই ট্যাব, মোবাইলের স্ক্রিনে আটকে থাকুক না কেন। যদি ওদেরকে একবার প্রকৃতির মধ্যে ছেড়ে দেন, তাহলে দেখবেন ওরা কত খুশি। নিজেদের মতো করে খেলাধুলা করে বেড়াচ্ছে। আমাদের ঝটিকা এ সফরে অনেক কিছুই দেখা হয়নি। আমরা পরবর্তীতে কী কী দেখবো সে বিষয়ে বিশদ ধারণা পেয়েছি। ভ্রমণ শেষে আমরা বন্ধু আশিককে আন্তরিক ধন্যবাদ দিলাম এমন একটি সফল সফর আয়োজন করার জন্য।

লেখক: অস্ট্রেলিয়ার সিডনি প্রবাসী।

এসইউ/এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]