ভয়ংকর পাথরের দ্বীপে কেন যাবেন?

শেখ আনোয়ার
শেখ আনোয়ার শেখ আনোয়ার , বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১২:৩০ পিএম, ২৭ জুলাই ২০২১

ভয়ংকর পাথরের দ্বীপের অপর নাম ‘হর্ন অব আফ্রিকা’। বছরে পাঁচ মাস এখানে সামুদ্রিক ঝড় হয়। অবাক হলেও সত্য, এখানে পাথরে গোলাপ ফুল ফোটে। পাথর মরুর গোলাপ গাছ দেখতে ভয়ংকর দৈত্যের মত। বিমান থেকে দেখলে পরিবেশটা এলিয়েনদের ভিন গ্রহ বলে মনে হয়। কিছু মানুষের বসতিও আছে। নেই কেবল একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। সভ্যতার আলো যেন মৃত এ দ্বীপপুঞ্জে।

দুর্গম গিরি কান্তার মরু: ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে একশ মাইল দূরে চারটি দ্বীপপুঞ্জ আছে। দ্বীপগুলো পরিচিত আরব উপদ্বীপ নামে। এগুলো ইয়েমেনের অধীনস্ত এলাকা। নাম আব আল কুরি, আল সামহা, ডাবসা এবং সোকোত্রা। অতি দুর্গম এলাকায় সোকোত্রার অবস্থান। এটি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন স্থান। দ্বীপপুঞ্জের দৈর্ঘ ১৩২ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৫০ কিলোমিটার। ইউনেস্কো এ পাথরের দ্বীপকে আরবের জুয়েল বলে উল্লেখ করে বিশ্ব ঐতিহ্যপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের কারণে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ধ্বংস হতে চলেছে।

jagonews24

ড্রাগনের রক্তের গাছ: মধ্যযুগের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা ওষুধি গাছ সংগ্রহ করতে প্রথম আসে এ পাথরের দ্বীপে। তখন নৌকাই ছিল একমাত্র পরিবহন। পরিবেশ বিজ্ঞানী গালাপাগোস’র মতে, ‘এই দ্বীপের অদ্ভুত গাছ ও প্রাণি পৃথিবীতে আর কোথাও চোখে পড়ে না।’ গবেষকরা বলেন, গাছ-গাছড়াগুলোর নামের মধ্যেও পৌরাণিক যোগসূত্র আছে। যেমন- ড্রাগনের রক্তের গাছ, বানর রুটির গাছ, বোতল গাছ, মরু গোলাপ, মরু শসা ইত্যাদি। এমন অদ্ভুত নামের পৌনে তিনশ প্রজাতির গাছপালা জন্মে এ পাথর মরুভূমিতে। এখানকার মরু গোলাপের কাণ্ড, ডালপালাগুলো মোটা ও কোঁকড়ানো বিশাল দৈত্যের মত দেখা যায়। ইতালিতে এ গাছের আঠা বা রজনের ব্যাপক চাহিদা আছে। এ রজন বেহালার বার্নিশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পাথরের দ্বীপ কেন ভয়ংকর: পাথরের দ্বীপে অদ্ভুতুড়ে কীট-পতঙ্গ আছে। যেগুলোর প্রায় সবই বিষাক্ত। দ্বীপের মরু গোলাপের ছায়ায়, পাথরের নিচে এসব ক্ষুদে বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ বসবাস করে। যার কামড়ে মানুষের মৃত্যু ঘটে। এজন্য পাথরের দ্বীপ ভয়ংকর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এছাড়াও এখানে রক্ত খেকো গিরগিটি, টিকটিকি, বিছা পোকা কিলবিল করে ঘোরে। পাখি খেকো দৈত্য প্রাণি, মাকড়সা আর শতপা বিশিষ্ট সরীসৃপ তো আছেই। আরও আছে, বিশেষ এক জাতীয় চড়ুই পাখি। যার বৈজ্ঞানিক নাম মিরাফ্রা ডিগোডাইয়েনসিস। অবাক হলেও সত্য, চড়ুইপাখিগুলো অবিকল মানুষের মত শব্দ উচ্চারণ করে। এ চড়ুই পাখির ডাক শুনে মনে হয় যেন সত্যি মানুষ কথা বলছে। প্রখর রোদেলা দুপুরে মিশরীয় শকুন পাথরের দ্বীপের আকাশে চক্কর মারে। বিপন্নপ্রায় মিশরীয় শকুন এখানেই দেখতে পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি।

jagonews24

শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য: ধারণা করা হয়, দু’হাজার বছর আগে এখানে প্রথম মানুষ পা রাখে। কিছুটা উর্বর আর সুগম এলাকায় বাস করে এখানকার উপজাতি মানুষ। এদের সংখ্যা এখন চল্লিশ হাজারের কাছাকাছি। ভাষা আফ্রিকান-আরবি মিশ্র। বর্তমানে বিদেশি সাহায্য সংস্থা গুহাবাসী এসব মানুষদের ঘরবাড়ি করে দিচ্ছে। তবে বেশিরভাগ মানুষ এখনো গুহায় বসবাস করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। সামুদ্রিক মাছ, খেজুর এবং ছাগলের দুধ এদের প্রধান খাবার। এতো মানুষ বাস করে সত্যি! কিন্তু পরিবেশ দূষিত হয়নি এতোটুকুও। প্রতিবছর অসংখ্য শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে মারা যায়। এখানকার দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া রোগেও অনেক মানুষ মারা যায়। ম্যালেরিয়া, টিবি রোগ প্রায় ঘরে ঘরে। শত শত বছর ধরে এখানকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে এখানে অনাবৃষ্টির কারণে গরু, ছাগল ও ঘোড়ার খাদ্য সংকট চলছে। বিপন্ন মানবতাকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে জাতিসংঘের সাহায্য সংস্থা ইউএনডিপি। তারা বিভিন্ন খাদ্য, পোশাক ও স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা রকম ফ্রি সাহায্য কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। তবে এখানকার মানুষ জাতিসংঘের সাহায্য সংস্থার কাছে ভিড়তে ভীষণ ভয় পায়। স্থানীয় পশু-পাখি, গাছ-পালার ছবি সম্বলিত নানান রকম শিক্ষামূলক পোস্টার দিয়ে শিশুদের শেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে দুর্ভিক্ষের কারণে শিশুরা আর স্কুলে পড়তে চায় না। এজন্য শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি হিসেবে এদের আটা, চাল, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি সাহায্য দেওয়া হচ্ছে।

jagonews24

পাথরের দ্বীপে কেন যাবেন: খুব কম সংখ্যক মানুষের সৌভাগ্য হয় পাথরের দ্বীপ ভ্রমণের। কারণ হাতের তালুতে জীবন রেখে ওখানে যেতে হয়। হাঙ্গর শিকারের নৌকায় চড়ে যেতে লাগে তিনদিন। এখন অবশ্য হেলিকপ্টারেও যাওয়া যায়। তবে সাগরে ঝড় যখন থাকে না, কেবল তখন। অ্যাডেনবার্গ বোটানিক্যাল গার্ডেনের বিজ্ঞানী এবং বহু ভাষাবিদ ড. মিরান্ডা মরিস কিছুদিন আগে এ দ্বীপ ভ্রমণ করে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ ছিল ওখানকার আবহাওয়া উপযোগী গাছ-লাগানো। উপজাতীয়দের বলে-কয়ে, বুঝিয়ে ধুনা গাছ লাগিয়েছিলাম। পরদিনই অন্য গোত্রীয় উপজাতীয়রা তুলে ফেলেছে। তাই পরিবেশ রক্ষার প্রচেষ্টায় কোন কাজ হচ্ছে না।’

jagonews24

ড্রাগন গুহার উপাখ্যান: এখানে ড্রাগনের গুহা আছে বলে উপজাতীয়দের বিশ্বাস। প্রতিদিন অসংখ্য ছাগল, ভেড়া খোয়া যায়। প্রতিদিন ড্রাগন এসে ছাগল ভেড়া ধরে নিয়ে গুহায় বসে বসে খায় বলে উপজাতীয়দের ধারণা। কিন্তু বাস্তব কতটুকু সত্য? কেউ জানে না। ড. মিরান্ডা বলেন, ‘আমরা ক’জন ড্রাগনের আস্তানায় যাই। গুহার মুখে দেখা যায় ফোঁটা ফোঁটা ঝুলন্ত চুন। দাঁতের মত শক্ত হয়ে বীভৎস দেখাচ্ছে। কোন পদচিহ্ন নেই। গোলক ধাঁধায় পড়ে যাই। পাথরের আকার-আয়তন দেখে স্নায়ু বিকল হওয়ার মত অবস্থা। আমাদের দলের অনেকেই ভেতরে না ঢুকে ফিরে যায়। কিন্তু আমরা চার জন ভেতরে ঢুকি। গুহার দেয়ালে প্রাচীন যুগের চিত্রকলা দেখে গা ছমছম করে ওঠে। যেন এক ভৌতিক অভিজ্ঞতা। ভেতরে দেখা যায়, এক সাধু পৌত্তলিক। আমাদের দেখে পানীয় জল খেতে পানপাত্র এগিয়ে দেন। আমরা মাথা দুলিয়ে না বলি। তারপর গুহা থেকে বের হয়ে আসি।’

jagonews24

পাথরে ফোটা ফুল: ভয়ংকর এ দ্বীপের পাথরে এবার নতুন করে ফুল ফোটাতে উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি সরকার। জাপানি সহযোগিতায় পাথরের দ্বীপে পর্যটন শিল্প গড়ার পরিকল্পনা করেছে দেশটি। যদি পরিবেশ বিপর্যয় না ঘটানো হয়, তবে পর্যটন এখানে সভ্যতার আলো ফিরিয়ে দিতে পারে। পাথরের গুহায় বসবাসকারী মানুষ আলোকিত হতে পারে। হয়তো একদিন ফুলের মত প্রস্ফুটিত হবে এখানকার শিশুদের জীবন। তবুও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আশঙ্কাও করছেন, অধিকতর উন্নয়নের চেষ্টা করা হলে ভারসাম্য হারাতে পারে প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের পাথরের দ্বীপ সোকোত্রা।

এসইউ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]