নারী নির্যাতন: মামলার দীর্ঘসূত্রতায় বিলম্বিত অপরাধীর বিচার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত: ০৪:৩৭ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০২১

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে মেঝেতে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন রহিমা আক্তার (২৬)। যৌতুকের দাবিতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন মিলে তাকে মারধর করেছেন। হাত-পা বেঁধে ও মুখে কাপড় গুঁজে পেটানো হয়।

এতে অজ্ঞান হয়ে যান রহিমা। তার কানে জমাট বাধে রক্ত। এরপর স্বামী তাকে একটি ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরে স্থানীয় লোকজন রেহনাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। শুধু রহিমা নয়, এ রকম নারী নির্যাতনের ঘটনা ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সেখানে গত পাঁচ মাসে ধর্ষণের চেষ্টা, নির্যাতন, অপহরণ, যৌতুক ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১০১ জন নারী।

জেলা মহিলা পরিষদ সূত্র জানায়, ঠাকুরগাঁওয়ে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন বয়সের নারীরা তো বটেই, এমনকি মেয়ে শিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি নারী-শিশু হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব ঘটনা শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বেশি।

সংস্থাটি জানায়, নির্যাতনের পর গ্রাম্য সালিশ, মামলা নিতে পুলিশের অনীহা, এর মধ্যে আবার মামলার কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে আইনের আড়ালে থেকে যাচ্ছে অপরাধীরা।

জেলা মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আইরিন পারভীন লুনা বলেন, সমাজের সব স্তরের নারীরা কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। সব চেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে তারা নিজ ঘরে নির্যাতনের শিকার। নির্যাতনকারীর ভূমিকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষকেই দেখা যায়।

নারী নির্যাতন কেন বাড়ছে- এমন প্রশ্নে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদ হোসেন জানান, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই নির্যাতনের হাত থেকে নারীদের রক্ষা করতে হলে, শিক্ষা-সম্মান, সর্বোপরি মানসিকতার পরিবর্তনের জায়গাগুলোতে কাজ করতে হবে। স্কুল-কলেজের পাশাপাশি পরিবার থেকেও সন্তানদের নারীদের সম্মান করা শেখাতে হবে।

এ বিষয়ে জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রোকসানা বানু হাবিব বলেন, এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের সবাইকে যারা যার অবস্থান থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

এদিকে ঠাকুরগাঁও আদালতের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১০ মাসে জেলায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রায় তিন শতাধিক শিশু-নারী। শুধু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন প্রায় ৪৫ জন নারী। এই হিসাব শুধু থানায় দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি। ঠাকুরগাঁও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দুই হাজার ৫০৫টি মামলা চলমান রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দেড় শতাধিক নারী-শিশু। এছাড়া ধর্ষণের শিকার হয়ে গত তিন মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ জন।

অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত শাস্তি না হওয়ায় জেলায় ধর্ষণ-নির্যাতন ও হত্যার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করছে সুশীল সমাজ।

নারী-শিশু নির্যাতনের শাস্তি সম্পর্কে অ্যাডভোকেট আলতাফুর রহমান বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করছে। কিন্তু আদালতে দিনের পর দিন ধীরগতিতে মামলা চলমান থাকায় সঠিক শাস্তি পাচ্ছেন না অভিযুক্তরা। উল্টো আদালত প্রাঙ্গণে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিচারপ্রার্থী ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম জানান, নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার পুলিশ। কোনো ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু এ সমস্যা সমাধানের জন্য জনসচেতনতার বিকল্প নেই বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মাহাবুর আলম জানান, নারী-শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়া সমাজের জন্য ইতিবাচক নয়। জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রশাসন থেকে জনসচেতনতার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তানভীর হাসান তানু/জেডএইচ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]