আন্তর্জাতিক

ভোটের মাঠে কেন দাপট দেখাতে পারলো না এনসিপি?

বাংলাদেশে জেন-জি অভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছে যুবনির্ভর দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাদের এই ফলাফলে রাজপথের শক্তিকে ভোটে রূপান্তর করার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গত শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ভোটাররা বিপুলভাবে সমর্থন দিয়েছেন দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি)। দলটি এর আগে তিন দফা দেশ শাসন করেছে—সবশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের অংশ হিসেবে এবারের নির্বাচনে তাদের ফলাফল ছিল হতাশাজনক।

আরও পড়ুন>>২৯৭ আসনের ফল প্রকাশ: বিএনপি ২০৯, জামায়াত ৬৮, এনসিপি ৬আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে বিএনপি জয়লাভ করেছে: এনসিপিআমি কোথাও যাচ্ছি না, সেরা সময় এখনো সামনে: তাসনিম জারা

জোট নিয়ে সমর্থকদের ক্ষোভ

এনসিপির অনেক সমর্থক অভিযোগ করেন, গত ডিসেম্বর মাসে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে দলটি কার্যত নিজেদের প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে নেয়।

শুরুর দিকে প্রায় সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জোটের অংশ হিসেবে মাত্র ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এনসিপি। দলটির দাবি, ঢাকায় আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নিহত হওয়ার পর বড় রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন প্রয়োজন হওয়ায় তারা জোটে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় এনসিপি শক্তিশালী জনভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি।

২৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের আন্দোলনের পর মানুষের যে আশা-স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, এনসিপি তা পূরণ করতে পারেনি। জামায়াতের সঙ্গে জোট করা আমাদের মতো অনেক তরুণ ভোটারের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হয়েছে।’

‘যাত্রা সবে শুরু’

এনসিপির জয়ী ছয় প্রার্থীর একজন ৩২ বছর বয়সী আইনজীবী ও দলের যুগ্ম সম্পাদক আবদুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, তারা আরও বেশি আসন জয়ের প্রত্যাশা করেছিলেন এবং কিছু আসনে অল্প ব্যবধানে হেরেছেন।

আল আমিন বলেন, ‘আমরা মাত্র যাত্রা শুরু করেছি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে নামার সময় যে প্রকৃত পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই দীর্ঘ পথচলায় আমরা এগোতে চাই।’

তিনি দাবি করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তই এনসিপিকে অন্তত ছয়টি আসন জিততে সহায়তা করেছে।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদের মতে, এই জোটই তরুণ ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অনেকেই এটিকে নতুন রাজনীতির সূচনা নয়, বরং পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাওয়া হিসেবে দেখেছেন। এতে তরুণ ভোট বিভক্ত হয়েছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি আরও সংগঠিত ও শাসনে সক্ষম বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।’

নজরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, দলটি বিরোধী অবস্থান থেকে নিজেদের পুনর্গঠন করবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গুরুত্ব দেবে।

ডিসেম্বরে দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, তারা দল গঠনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাননি। অর্থের স্বল্পতা এবং নারী ও সংখ্যালঘু অধিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান না থাকাও তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, ‘এনসিপি যদি নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় পুনর্গঠন করতে না পারে এবং বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয় এমন জোট থেকে দূরে না থাকে, তবে তারা বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার বদলে প্রতীকী আন্দোলন হিসেবেই থেকে যাবে।’

‘সেরা দিন সামনে’

পরাজিতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তরুণ প্রার্থী ছিলেন ৩১ বছর বয়সী চিকিৎসক তাসনিম জারা। তিনি জোটের প্রতিবাদে ডিসেম্বরেই এনসিপি ছেড়ে ঢাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। প্রায় ৪৪ হাজার ভোট পেলেও বড় ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন তিনি।

তাসনিম জারা বলেন, ‘আমরা দেখিয়েছি সৎ ও স্বচ্ছ প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করা সম্ভব। তবে আমাদের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। পরিচ্ছন্ন রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে হলে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।’

তিনি আরও জানান, যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা পেশায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা তার নেই। ‘আমাদের সেরা দিনগুলো এখনো সামনে,’ বলেন তিনি।

সূত্র: রয়টার্সকেএএ/