জাতীয়

পুলিশের শীর্ষ পদে বড় রদবদলের আভাস, মাঠ পর্যায়েও প্রস্তুতি

জাতীয় নির্বাচনের তিনদিন পরেই পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম পদত্যাগ করেছেন—এমন আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। তখন গুঞ্জন হলেও সেটি ছিল সত্য। বাহারুল আলমের চাকরির মেয়াদ আট মাস বাকি থাকতেই তিনি সরে গেলেন। পদোন্নতি দিয়ে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান মো. আলী হোসেন ফকিরকে নতুন আইজিপি নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

নতুন আইজিপি নিয়োগের মধ্য দিয়ে পুলিশের শীর্ষ পদসহ মাঠ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের আভাস পাওয়া গেছে। পরিবর্তন আসতে পারে জেলা পর্যায়েও। এমনটিই বলছে পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্র।

বাহারুল আলম ২০২০ সালে পুলিশের চাকরি থেকে অবসরে গিয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে তাকে আইজিপি পদে নিয়োগ দেয়। নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি বাহারুল আলমকে অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/সংগঠনের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে দুই বছর মেয়াদে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলো। সে হিসেবে আইজিপি হিসেবে বাহারুল আলমের মেয়াদ আরও আট মাসের বেশি ছিল।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক, বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান, অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এবং ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) প্রধান পদেও পরিবর্তন আসতে পারে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ডিএমপি কমিশনারের চুক্তি বাতিল করে সেখানে নতুন একজনকে এই দুটি পদে নিয়োগ দিতে এরই মধ্যে ফাইল পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। এই ফাইলে যে কোনো সময় স্বাক্ষর করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন আইজিপি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে আলোচনা করে বাকি চারটি পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

আইজিপি হলেন আলী হোসেন ফকিরসেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় পদে রদবদলডিএমপির ১৪ পদে একযোগে রদবদলপুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে শিগগির পরিবর্তন আসবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ওই চারটি পদের ফাইলও প্রস্তুত করা হয়েছে উল্লেখ করে সূত্র জানায়, ডিএমপি কমিশনারসহ পাঁচটি পদে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসছে সরকারের একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, সারাদেশের রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার, ৬৪ জেলা পুলিশ সুপার ও ওসি পর্যায়েও রদবদল আসছে কিছুদিনের মধ্যে। কারণ নির্বাচনের আগে লটারির মাধ্যমে এসপি ও ওসি নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। লটারির প্রক্রিয়াটি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আইজিপি পরিবর্তন হয়েছে। ডিএমপি কমিশনারও আর বেশিদিন থাকছেন না বলে তারা নিশ্চিত। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে শীর্ষ পদগুলোর রদবদলের প্রক্রিয়ার খবর তারা পেয়েছেন। সবাই অপেক্ষা করছে- নতুন নেতৃত্বের নতুন দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার।

অনেকেই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে যাতায়াত বাড়িয়েছেন। শীর্ষ পদগুলোতে রদবদলের পর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ইউনিটে বড় ধরনের রদবদল হবে বলে ধারণা করছেন বিভিন্ন পদের কর্মকর্তারা। ঢাকার বাইরে দায়িত্বরত কর্মকর্তারাও ঢাকাকেন্দ্রিক যাতায়াত বাড়িয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন নেতৃত্বে সামনে ভালো কাজ উপহার দিতে বিভিন্ন অপারেশন প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। আবার অনেকে আছেন নতুন নেতৃত্বের দিকনির্দেশনার অপেক্ষায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মেট্রোপলিটন কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, এসপিসহ বড় বড় পদে পরিবর্তন আসছে। এতে প্রাধান্য পাবে মেধা, পেশাদারত্ব, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা। নতুন সরকারের ভাবনা অনুযায়ী, পদায়ন ও দায়িত্ব দেওয়া হবে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতা প্রাধান্য দেওয়া হবে।

সরকার গঠনের পর প্রথম কর্মদিবস গত বুধবারই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একান্ত বৈঠকে তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বলেন, কে কোন দলে ভোট দিয়েছেন, সেটা ভুলে যান। আজ থেকে আপনারা সবাই দেশের মানুষের জন্য কাজ করুন।

গত রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের টপ লেভেলে কিছু পরিবর্তন শিগগির আসবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক পুলিশের নামে মামলা হয়েছে, কেউ আত্মগোপনে চলে গেছেন। এরপর আবার গণহারে বদলির ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। গত ১৭ মাসে পুলিশ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। সরকার চায় এখন এই ছন্দ ভেঙে না যাক।

টিটি/এএসএ