নতুন সরকারের প্রথম ঈদে পোশাকসহ ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা কিছুটা বেড়েছে। দেশের নামকরা কোনো কোনো পোশাক ব্র্যান্ডের বিক্রিতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পোশাক বিক্রেতাদের অধিকাংশই বলছেন, এবার বিক্রি ভালো হয়েছে। আগের চেয়ে কিছুটা হলেও বিক্রি বেড়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে মন্দা থাকলেও ঈদে বিক্রি বেড়েছে কসমেটিক্সেরও। গত ঈদের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে অন্তত ১৫ শতাংশ। তবে মোবাইল ও গেজেট বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি হয়নি। গত কয়েক ঈদের তুলনায় বিক্রি কারও কারও কমেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। নির্বাচনের পরেই রোজা আসায় মুসলিম ধর্মের প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতর নিয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠেন দেশের ব্যবসায়ীরা। প্রত্যাশা করতে থাকেন, নির্বাচিত সরকারের আমলে ব্যবসা ভালো হবে। প্রায় সব শ্রেণির ব্যবাসায়ীর সঙ্গে কথা বলে ঈদকেন্দ্রিক বেচাকেনা যে বেড়েছে, সেই আভাস পাওয়া গেছে।
রোজার ঈদে পোশাকের বাজার ২০ হাজার কোটি টাকার!রোজার ঈদে পোশাকের বাজারই মূল। ঈদ সামনে রেখে প্রতিটি মানুষের জন্য একটি হলেও নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে জুতা থেকে শুরু করে শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট, প্যান্ট, থ্রি-পিস, সালোয়ার, টুপি, আতর সবই কেনা হয়। আর ধনিক শ্রেণির পরিবারে পোশাক কেনায় চলে প্রায় প্রতিযোগিতা। ফলে ঈদে পোশাকের বাজারও বেশ বড়।
পোশাক ব্যবসায়ীরা বলেন, পোশাকের মূল বাজার মূলত রোজার ঈদ। এই ঈদের ওপর নির্ভর করে তাদের পুরো বছরের ব্যবসা চলে। ফলে ঈদে পোশাকের বাড়তি দাম আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
আরও পড়ুনশেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় মানুষের ঢলভিড়ের মাঝে ফুটপাতেই উৎসবের রংমিরপুরে জমজমাট ঈদ বাজার, ফুটপাতেও ভিড়গুলিস্তানের ফুটপাতে জমজমাট ঈদের বেচাকেনা
দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ রয়েছে। যারা জাকাত গ্রহণ করেন কিংবা একেবারেই কাপড় কেনার সুযোগ নেই, তিনিও হয়তো একটি কাপড় পেয়ে থাকেন। আবার এমনও মানুষ রয়েছেন, ঈদে জনপ্রতি যার কেনাকাটা ১০ হাজার টাকারও বেশি। ৩ থেকে ৫ বছরের সন্তানের জন্য কেনাকাটা করতে গিয়েও ৫ হাজার টাকায় ঠেকে। ফলে ধারণা করা হয়, মানুষ প্রতি পোশাকে ব্যয় অন্তত ১ হাজার টাকা। সে হিসাবে ঈদে পোশাকের বাজার প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার। পোশাক বিক্রেতাদের ধারণা অনুযায়ী, ঈদকেন্দ্রিক পোশাকের বাজার অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার।
পোশাকের বিক্রি বেড়েছে ২৫ শতাংশ পর্যন্তএবার ঈদে কোনো কোনো ব্র্যান্ডের পোশাকের বিক্রি বেড়েছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। আবার কারও কারও বিক্রি বেড়েছে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ। আবার অনেকে বলছেন, বিক্রি আগের চেয়ে কম। তবে অধিকাংশই বলছেন, আগের চেয়ে কিছুটা হলেও বিক্রি বেড়েছে।
জানতে চাইলে ফ্যাশন ব্র্যান্ড লা রিভ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মন্নুজান নার্গিস জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার ঈদে আমাদের বিক্রি বেশ ভালো হয়েছে। গতবারের চেয়ে এবার প্রবৃদ্ধি রয়েছে। শুরুর দিকে ক্রেতারা যেমন কম বের হয়েছে, শেষ দিকে এসে বিক্রি ভালো হয়েছে। ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে।’
আরও পড়ুনতালতলা মার্কেট: ভেতরে-ফুটপাতে সমানে চলছে ঈদের কেনাবেচাএবার কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঈদ কেনাকাটায় স্বস্তিঈদকে ঘিরে মধ্যরাতেও জমজমাট নিউমার্কেটের কেনাকাটাভারতীয়-পাকিস্তানি পোশাকের দাপটে মিরপুরের বেনারসি পল্লিতে বিক্রি কম
গত ঈদের তুলনায় বিক্রি কেমন বেড়েছে জানতে চাইলে লা রিভের সিইও বলেন, ‘এবার আমাদের বেশ কিছু নতুন শোরুম হয়েছে। ফলে প্রবৃ্দ্ধি ভালো হয়েছে। এবার আমাদের ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশে নির্বাচিত সরকার এসেছে। এবার পরিবেশ ভালো। ব্যবসা ভালো হবে, সেটিই আশা করছি। আরও দু-একদিন আছে, প্রত্যাশা অনুযায়ীই ব্যবসা হবে বলে আশা করছি।’
বিক্রি কেমন হয়েছে জানতে চাইলে পোশাক ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ-এর স্বত্বাধিকারী বিপ্লব সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিক্রি এবার আগের চেয়ে বেড়েছে। গতবারের তুলনায় ভালো সাড়া পড়েছে। আগের চেয়ে কিছুটা হলেও বিক্রি বেড়েছে।’
এ বিষয়ে বসুন্ধরা সিটির ফ্যাশন লেডি নামের নারীদের পোশাকের দোকানের মালিক মো. মনির জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার ব্যবসা ভালো হয়েছে। বসুন্ধরা মার্কেটে বিক্রি বেশ ভালো হয়েছে। আমাদের চাহিদার শেষ নেই, তবে বিক্রি ভালো হয়েছে। গতবারের চেয়ে বিক্রি বেড়েছে।’
তবে রাজধানীর মিরপুরের নান্নু মার্কেটে প্যান্ট বিক্রেতা রাসেল বলেন, ‘এবার বিক্রি কম। মনে হয় বেশি ছুটি দেওয়ার কারণে এবার মানুষ আগেভাগেই বাড়ি ফিরে গেছেন। ফলে এবার গতবারের চেয়ে বিক্রি কিছুটা কম।’
কসমেটিক্স বিক্রি বেড়েছে ১৫ শতাংশগত কয়েক মাস ধরে কসমেটিক্সের বাজারে মন্দাভাব ছিল। বিক্রি অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তবে ঈদে বিক্রি বেড়েছে। কোনো কোনো দোকানে বিক্রি বেড়েছে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। বেশিরভাগ খুচরা কসমেটিক্স বিক্রেতারা বলছেন, এবার বিক্রি ভালো হয়েছে।
রাজধানীর মহাখালীর এসকেএস টাওয়ারে পাইকারিতে কোরিয়ান কসমেটিক্স বিক্রি হয়। বর্তমানে দেশে কোরিয়ান কসমেটিক্সের আধিপত্য চলছে। মার্কেটটির অধিকাংশ বিক্রেতা বলছেন, বিক্রি আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। নির্বাচন হওয়ার তিন থেকে চার দিন পর থেকেই বাজারে কসমেটিক্সের টান পড়ে। খুচরা দোকানিরা প্রচুর কসমেটিক্স কিনে নিয়েছেন।
আরও পড়ুনমৌচাক মার্কেটের অলি-গলিতেও পা ফেলার জায়গা নেইঈদের কেনাকাটার ধুম, বেশি বিক্রির আশা নিউমার্কেটের দোকানিদেরগণমানুষের কথা ভেবে উইনারের ঈদ কালেকশনবসুন্ধরা সিটিতে ঈদের রঙিন প্রস্তুতি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কসমেটিক্স ব্যবসায়ী বলেন, ব্যবসায় যাদের মূলধন বেড়েছে তাদের বিক্রিও বেড়েছে। গত ঈদের তুলনায় বিক্রি অন্তত ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অনলাইন পেজগুলোতেও বিক্রি বেড়েছে। পাইকারি ও খুচরা উভয়েই বিক্রি বেড়েছ। তবে অভারঅল খুব একটা বিক্রি যে বেড়েছে তা নয়।
ঈদে জুতার বিক্রি বেড়েছে ১০ থেকে ২০ শতাংশঈদে পোশাকের সঙ্গে নতুন জুতার প্রতিও মানুষের আগ্রহ থাকে। বাজেট অনুযায়ী জুতা কেনেন মানুষ। কেউ ব্র্যান্ডের দোকান থেকে জুতা কেনেন, কেউবা নন-ব্র্যান্ডের। ঈদ কেন্দ্র করে গত বছরের তুলনায় ব্র্যান্ডের জুতা বিক্রি বেড়েছে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। দেশে বাটা, এপেক্স, লোটো, বে, ওয়াকার, ওরিয়নসহ অন্তত ২০টি জুতার ব্র্যান্ড রয়েছে। সারা বছর যে পরিমাণ জুতা বিক্রি হয় তার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ হয় ঈদুল ফিতরের সময়। এবার ঈদে ব্র্যান্ডের প্রতিটি শোরুমে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় ছিল।
ফার্মগেটের এপেক্স শোরুমের ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার আমাদের বিক্রি বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ।’
আরও পড়ুনরাজধানী সুপার মার্কেট: ‘এক জায়গায় পাওয়া যায় সবকিছু’ঈদে কিনতে পারেন ১৫ হাজার টাকা বাজেটে ৫ স্মার্টফোনঈদ উপলক্ষে বেইলি রোডে চলছে ‘মেহেদি উৎসব’শেষ সময়ে জমজমাট মিরপুরের ফুটপাত
বাটা শোরুমের ব্যবস্থাপক বলেন, ‘বিক্রি গতবারের চেয়ে বেড়েছে।’ তবে প্রবৃদ্ধি কতটা হয়েছে তা তিনি জানাতে চাননি।
বসুন্ধরা সিটির এপেক্সের বিক্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মেহেদি হাসান জানান, গত বছরের হিসাবে এই বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি বেড়েছে ২১ শতাংশ।
আর বসুন্ধরা শপিংমলের বে বিক্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. ইমাম হাসান বলেন, ‘এবার আমাদের বিক্রয়কেন্দ্রে নারীদের জুতার বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।’
মোবাইল বিক্রিতে খরাএবার ঈদে মোবাইল বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি নেই। জানতে চাইলে শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার মোবাইলের বিক্রি মোটামুটি হয়েছে। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী বিক্রি হয়নি। হয়তো গত বছর যেমন বিক্রি হয়েছিল, বিক্রি তেমনই স্থির থাকবে, নতুবা বিক্রি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কম হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপী বেশিরভাগ মোবাইল ফোনের দাম বেড়েছে। সে কারণে বাংলাদেশেও দাম বেড়েছে। যেহেতু মোবাইলের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে, সে কারণে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা এমনিতেই কমে যাবে। এবার ঈদের বাজারে এটিই হয়েছে।
মোবাইল বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে বসুন্ধরা সিটির তানভীর টেলিকমের তানভীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদে এবার মোবাইলের বেচাকেনা তেমন হয়নি। মোবাইল সব সময় বিক্রি হয়। আবার ঈদেও অনেকেই নতুন ফোন কেনেন। তবে এবার বেচাকেনা গতবারের চেয়ে কম হয়েছে, এই মার্কেটের কেউ বলছে না আগের চেয়ে বিক্রি বেড়েছে।’
ইএইচটি/এমএমএআর/ এমএফএ