এবার কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঈদ কেনাকাটায় স্বস্তি
ঈদ আসতে আর বেশি দেরি নেই। মুসলমানদের এই ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কেনাকাটার ধুম পড়ে গেছে শহর কিংবা গ্রামের ছোট-বড় সব শপিংমলে। রাজধানীতে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকছে দোকান-পাট। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ঢল নামছে ক্রেতাদের।
তবে এবার নিরাপত্তা নিয়ে অনেকটাই স্বস্তিতে সাধারণ মানুষ। যদিও ঈদের কেনাকাটা করতে গিয়ে কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীর আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না। তবে যে কোনো মানুষের নিরাপত্তায় সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকায় জোরদার করা হয়েছে পুলিশের টহল কার্যক্রম। সাদা পোশাকেও চলছে নজরদারি।
বিগত বছর এ সময়ে ঈদ কেনাকাটায় কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীর উৎপাতে আতঙ্কিত ছিল নগরবাসী। অতীতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার নগরবাসীর নিরাপদ কেনাকাটায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
তারা বলছেন, এবার নগরবাসীর কেনাকাটায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে কোনো অনাকাঙিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ শপিংমল, মার্কেট ও ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় বাড়ানো হয়েছে টহল কার্যক্রম। পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারিও রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনগণকে সচেতনতার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এছাড়া নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের থেকেও রয়েছে বিশেষ নির্দেশনা।
আরও পড়ুন
ঈদকে ঘিরে মধ্যরাতেও জমজমাট নিউমার্কেটের কেনাকাটা
ঈদের কেনাকাটায় সরগরম বেইলি রোড
জমতে শুরু করেছে ঈদের কেনাকাটা
তানিয়া খাতুন এসেছেন রাজধানীর শ্যামলী স্কয়ার শপিংমলে। ঈদের কেনাকাটা করছেন তিনি। তানিয়া বলেন, গত বছর ঈদের আগে দেশের পরিস্থিতি বেশ খারাপই ছিল। সেই তুলানায় এবার অনেকটা ভালো। গত বছর বাইরে মার্কেটে বের হতে একটু ভয় ভয়ই করতো। রাস্তায় ছিনতাইকারী কিশোর-গ্যাংয়ের প্রভাব ছিল। যার কারণে ব্যস্ততার মধ্যেও অনেকটা দিনের বেলায় কেনাকাটা শেষ করেছিলাম। কিন্তু এবার মোটামুটি সেই ভয় অনেকটা লাঘব হয়েছে। প্রশাসনও বেশ তৎপর। যার কারণে ইফতার শেষ করে ফ্রি সময়ে কেনাকাটা করতে এসেছি।
হাসান নামে আরেক ক্রেতা বলেন, গত ঈদে মানুষের মধ্যে যে ভয়টা ছিল এবাস সেটা নেই। দেশে এতবড় ঝামেলার পর প্রশাসনও বেশ ভেঙে পড়েছিল। যার কারণে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং সব বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার নির্বাচিত সরকার আসার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আবার মাঠে ঠিকমতো কাজ করছে। যার ফলে সন্ধ্যার পর মার্কেটে আসার যে আতঙ্ক ছিল সেটা নেই। মানুষ অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেনাকাটা করতে ঘরের বাইরে বের হচ্ছে।
ক্রেতাদের উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অন্যমাত্রা বেবী জোন শোরুমের এক স্টাফ বলেন, গত বছরের তুলায় এ বছর মোটামুটি ক্রেতার উপস্থিতি অনেকটা বেশি। সারাদিনই টুকটাক কাস্টমার আসছে।
সন্ধ্যার পর মার্কেটে ক্রেতাদের উপস্থিতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, অধিকাংশ কাস্টমার অফিস করে ইফতার শেষ করে কেনাকাটা করতে আসছেন। মার্কেট বন্ধের আগ পর্যন্ত মানুষ কেনাকাটা করছে।
জান্নাত ফ্যাশন শোরুমের স্টাফ রবিন বলেন, এবার ক্রেতারা মার্কেটে আসছেন। গতবার ঈদে কোনো বেচাকেনা ছিল না। মানুষ কেনাকাটা করতে আসেনি। কিন্তু এবার মানুষ রাতেও কেনাকাটা করতে বের হচ্ছে।
এসময় মার্কেটে দায়িত্বরত এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, মার্কেটের নিরাপত্তায় ও মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় শিফটিং ভিত্তিতে কাজ করছেন তারা। এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি ভালো।
ঈদ কেনাকাটায় নগরবাসীর নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটায় রাজধানীর মার্কেটগুলোতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে। যাতে মার্কেটগুলোতে কেনাকাটা করতে আসা নগরবাসীর নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে পারি আমরা। এছাড়াও সাদা পোশাকে আমাদের নজরদারি রয়েছে।
আরও পড়ুন
অনলাইনে জমতে শুরু করেছে ঈদের কেনাকাটা, প্রত্যাশা ভালো বিক্রির
ঈদের কেনাকাটায় জমজমাট রিয়াজউদ্দিন বাজারের তামাকুমন্ডি লেন
ঈদের কেনাকাটার ধুম, বেশি বিক্রির আশা নিউমার্কেটের দোকানিদের
র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে র্যাবের পক্ষ থেকে যে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চেকপোস্ট। রাজধানী ঢাকা শহরসহ সারাদেশেই যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। পূর্বে ঈদে কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোকে অ্যানালাইসিস করেই এবারের যে ঈদনির্ভর কার্যক্রম সেগুলোকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এই বাড়তি চেকপোস্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থা আছে। এভাবে সব পরিকল্পনা মাথায় রেখে কার্যক্রম সাজানো হয়।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি আমাদের ডগ স্কোয়াড, বোম্ব ডিসপোজাল টিম সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত। যে কোনো সময় দুষ্কৃতকারীদের যদি কোনো অপচেষ্টা বা তাদের অপতৎপরতা যদি আমরা দেখতে পাই, পর্যবেক্ষণ করতে পারি, সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ডগ স্কোয়াড বোম্ব ডিসপোজাল টিম দ্রুত সেখানে নিয়োজিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে ইনশাআল্লাহ। এর পাশাপাশি সাইবার মনিটরিং টিম র্যাব হেডকোয়ার্টারের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করছে। ঈদকে কেন্দ্র করে যত ধরনের অপতৎপরতা বা অপরাধ কার্যক্রম চলমান সেগুলো প্রতিহত করার জন্য আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা আছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতির কথা যদি আমরা বলি, এটার দায়ভার কিন্তু আমাদের দেশের সর্বস্তরের মানুষের ওপর নির্ভর করে। এককভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এটা ম্যানেজ করা সম্ভব না। সবাইকে আইন মানতে হবে, বুঝতে হবে। আমি যদি আমার পাশে কোনো অন্যায় সংঘটিত হতে দেখি, সঙ্গে সঙ্গেই যদি আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর চেষ্টা করি, অবশ্যই দ্রুত সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। কিন্তু আমার পাশে অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে এবং আমি মোবাইল বের করে ভিডিও করছি। এই মানসিকতা নিয়ে কিন্তু দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব না। এই অঘটনটা এখানে ঘটলো কেন এর উত্তর পৃথিবীতে দেওয়া সম্ভব না। আমাদের সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে একটা প্রচেষ্টা আমি সবসময় আহ্বান জানাই। আমরা সবাই যদি এগিয়ে আসি, সবাই যদি সচেষ্ট হই, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে বাধ্য ইনশাল্লাহ।
র্যাব-২ এর উপ-অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খালিদুল হক হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, আমরা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় প্রতিনিয়ত চার থেকে পাঁচটা ফোকাল পয়েন্টে আমরা চেকপোস্ট পরিচালনা করি। যে কোনো ধরনের অপরাধ কার্যক্রম প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত কাজ করছি।
গত ২ মার্চ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সব জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মতবিনিময়ে নির্দেশনা দেন পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, দেশের প্রধান প্রধান মার্কেটে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। চুরি, ছিনতাই রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কেআর/এসএনআর