ফিচার

ঈদ সালামি, ঐতিহ্যের বিবর্তন ও বেড়ে ওঠার গল্প

ঈদের সকাল মানেই নতুন পোশাকের ঘ্রাণ আর সালামি আদায়ের মিষ্টি উচ্ছ্বাস। সময়ের সাথে সাথে আমাদের বয়স বাড়ে, বদলায় পারিপার্শ্বিকতা। একসময় যে হাত দুটো বড়দের দিকে প্রসারিত হতো নতুন কড়কড়ে নোটের আশায়, আজ সেই হাতই স্নেহের পরশে ছোটদের হাতে তুলে দেয় সালামি। সালামি শুধু কিছু টাকার আদানপ্রদান নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সালামিকে ঘিরে কয়েকজন তরুণ শিক্ষার্থীর অভিমত জানাচ্ছেন তানজিদ শুভ্র…

কড়কড়ে নোটের ঐতিহ্য থেকে ই-ওয়ালেটের ডিজিটাল সালামিআই. এইচ ইমনচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

‘ঈদ সালামি’ প্রথাটি মূলত এই উপমহাদেশেরই এক পুরোনো ঐতিহ্য। ঈদের খুশিকে আরও মধুর করে তোলে বড়দের দেওয়া নগদ উপহার, যা ঈদ সালামি নামে পরিচিত। ঈদের আনন্দ বহুগুণ বেড়ে যায়, যদি হাতে আসে একদম নতুন, কড়কড়ে টাকার নোট। বাংলাদেশে এই প্রথা বহু পুরোনো হলেও এর উষ্ণতা আজও একটুও কমেনি। বড়দের হাত থেকে সেই টাকা পাওয়ার মুহূর্তটি ছোটদের কাছে নিছক উপহার নয়, বরং ভালোবাসার এক উষ্ণ পরশ। ঈদ সালামির এই সংস্কৃতি তাই শুধু ঐতিহ্য নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক মিষ্টি স্মৃতি।

এবারের ঈদে নতুন নোটের সালামি পাবে এক ভিন্ন মাত্রা। বাংলাদেশ ব্যাংক ছয়টি নতুন নোট বাজারে এনেছে, যার প্রতিটিতে ঠাঁই পেয়েছে দেশের ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ছবি। এই নোটগুলো তাই শুধু সালামির টাকা নয়, প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

ঈদ সালামিতে এখন ধীরে ধীরে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া লাগছে। টাটকা নোটের সুবাস আর মুঠোয় ধরা কড়কড়ে টাকার পরিবর্তে এখন সামনে আসছে ডিজিটাল লেনদেনের সহজাত সংস্কৃতি। মুঠোফোন ব্যাংকিং আর ই-ওয়ালেটের কল্যাণে নিমিষেই সালামি পৌঁছে যাচ্ছে দূরদূরান্তের প্রিয়জনের দোরগোড়ায়। প্রযুক্তিমনস্ক নতুন প্রজন্মের কাছে ডিজিটাল সালামি এখন শুধু সুবিধার বিকল্প নয়, এটি একটি নতুন অনুভূতিরও নাম। ঈদ শুভেচ্ছা কার্ড, হৃদয়ছোঁয়া বার্তা কিংবা উপহার কার্ড সব মিলিয়ে সালামি পাচ্ছে এক অভূতপূর্ব পরিচয়।

শৈশবের আনন্দ থেকে বড় হওয়ার গল্পওরাইনা খাঁন চৌধুরীবরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

‘শৈশবের ঈদের স্মৃতি আজও মনে বাজে, ঈদের সেই ছোট্ট সালামিই বড় হওয়ার গল্প সাজে।’ ঈদ মানেই নতুন জামাকাপড় পরা, সুস্বাদু সেমাই-পায়েস খাওয়া এবং আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা। তবে ঈদের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য আনন্দের অংশ হলো ঈদ সালামি বা ঈদি, যেখানে বড়রা ছোটদের ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে কিছু টাকা উপহার দেন। ছোটবেলায় ঈদ সালামি পাওয়ার আনন্দ ছিল অন্যরকম। মনে হতো অনেক সালামি উঠলে বাজারে গিয়ে আইসক্রিম, চকলেট কিংবা প্রিয় কোনো খেলনা কিনব। বছরে যেহেতু আমাদের দুটি ঈদ, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা, তাই দুই ঈদ মিলিয়ে ভালোই সালামি জমে যেত।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, সবসময় সেই টাকা খরচ করা হতো না। কখনো সযত্নে রেখে দেওয়া হতো ভবিষ্যতের জন্য। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল। ছোটবেলার ঈদে পাওয়া সেই সালামি একসময় জমতে জমতে আমার প্রথম ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার পুঁজি হয়েছিল। সময় বদলায়, মানুষও বদলায়। ছোটবেলার মতোই আজও আমি বড়দের কাছ থেকে সালামি নিই, তবে বড় হয়ে যাওয়ায় এখন ছোটদের হাতেও ঈদি তুলে দিই।

সালামি দিয়ে একটা বড় প্লেন কিনবোমিজানুর রহমানবরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

ছোটবেলায় ঈদের সকালগুলোর উত্তেজনা ছিল একেবারেই অন্যরকম। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে নতুন পোশাক পরার মাধ্যমেই যেন ঈদের আসল আনন্দ শুরু হতো। নাশতা শেষ করেই শুরু হতো আমাদের সালামি আদায়ের মিশন। প্রথমে বাবা-মা, তারপর দাদু-দাদি থেকে শুরু করে একে একে সবাইকে সালাম করা চাই। ঈদের প্রথম সালামিটা জুটত বাবার কাছ থেকেই। আর মা হয়তো ১০০ টাকার একটা নতুন নোট হাতে দিয়ে কপালে চুমু এঁকে দিতেন।

সালামি আদায়ের এই পর্ব শুধু বাবা-মা বা দাদু-দাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না। একবারের কথা বেশ মনে পড়ে, কিছুদিন আগেই নতুন বিয়ে হয়ে আসা চাচির কাছেও সালামির আবদার জুড়তে ছাড়িনি। চাচি অপ্রস্তুত হয়ে বলেই বসলেন, আমার কাছে তো টাকা নেই, এবার কী দিই তোমাকে? আমি নাছোড়বান্দা হয়ে বলেছিলাম, তাহলে চাচার কাছ থেকে ধার নেন। আমার কথা শুনে চাচি হেসে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, যাও বড় হও বাবা।

পকেটভর্তি সালামি নিয়ে গুনতে বসার আনন্দটাই ছিল অন্যরকম। এর মধ্যেই হয়তো ছোট বোন এসে সালাম করে বসত। তাকে একটা ৫০ টাকার নোট দিতেই সে খুশিতে নেচে উঠত। একবার সালামির সব টাকা জমিয়ে মায়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। মাকে বলেছিলাম, এই টাকা দিয়ে আমি একটা বড্ড প্লেন কিনব, আর সেই প্লেনে করে সবাইকে নিয়ে ফুফুর বাসায় যাব। মা সেদিন হেসে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আজ বড় হয়েছি। সালামির টাকায় সেই বড় প্লেন আর কেনা হয়নি, কিন্তু সালামি নিয়ে ছোটবেলার সেই মিষ্টি স্মৃতিগুলো আজও ঈদের আনন্দকে রঙিন করে রাখে।

বাংলার সংস্কৃতির গল্পনাঈমা ইসলামমুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

বাংলাদেশে ঈদের আনন্দের একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে ঈদের সালামি। এটি যুগ যুগ ধরে মিশে আছে আমাদের সংস্কৃতির সাথে। ঈদ যেমন আনন্দের, ঈদের সালামিও ঠিক তেমনই খুশির, বিশেষ করে ছোটদের জন্য। সালামি ছাড়া তাদের ঈদ যেন পূর্ণতাই পায় না। গ্রাম হোক বা শহর, বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরেই একই চিত্র। ছোটরা সকালে নতুন জামা পরে দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায় আর বড়দের সালাম করে সালামি চেয়ে নেয়। তাদের মাঝে অন্যরকম একটা উচ্ছ্বাস কাজ করে। তাদের হাসি-আনন্দে চারপাশ ভরে ওঠে। কে কার চেয়ে বেশি সালামি সংগ্রহ করবে, তা নিয়ে ছোটদের মাঝে অলিখিত এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এটি যেন তাদের জীবনের প্রথম অর্থনৈতিক সঞ্চয়। সেই টাকা তারা সযত্নে মায়ের কাছে জমিয়ে রাখে অথবা দোকান থেকে পছন্দের খাবার কিনে খায়।

বাবা যখন সকালে নতুন পাঞ্জাবি পরে ঈদের নামাজ পড়তে যান, তখন তাকে সালাম করে সালামি চেয়ে নেওয়ার আনন্দটার কোনো তুলনাই হয় না। বাবার দেওয়া নতুন চকচকে সেই নোটগুলোর জন্যই আমরা অপেক্ষায় থাকতাম। আমাদের সবারই ছেলেবেলার এমন মধুর স্মৃতি রয়েছে। সময়ের স্রোতে আমরা যারা এখন বড় হয়েছি, তারাই আবার ছোট ভাইবোনদের সালামি দিয়ে থাকি। এভাবেই ঈদ সালামি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

জেএস/