সাহিত্য

অধম নূর ইসলামের গল্প: নীরমালা

দীর্ঘ বিশ বছর ধরে ইকবাল সাহেবের এ শহরে আসা-যাওয়া এবং থাকা। তবে সে কিছু না কিছুর কারণে এ শহরের মায়া ছাড়তে পারে না। চাকরিকালীন তার সাথে আমার পরিচয়। অফিসের বাকি আট-দশটা মানুষের চেয়ে সে অনেকটাই ভিন্ন। কথায় কথায় হাসে, কারণে অকারণে হাসে।

আমি মানুষটির সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য, মেশার জন্য নিজের থেকেই একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই। দেখি না-বলা কথাগুলো যদি শুনতে পারি।‌‘ইকবাল সাহেব বিয়ে করেছেন?’‘হ্যাঁ ভাই, বিয়ে করেছি।’‘ছেলে-মেয়ে আছে?’‘একটি ছেলে আছে।’‘তারা কোথায় থাকে?’‘বউ, ছেলে ও মা গ্রামের বাড়িতে থাকে।’‘বাবা আছে?’‘না, বাবা মারা গেছেন।’‘বউয়ের মন রাখার জন্য অনেক সময় বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে যেতে হয়।’‘তুমি এখনো বিয়ে করোনি। তাই সংসার সম্পর্কে তোমার ধারণা নেই। ইচ্ছে হলেই টাকা খরচ করতে পারো। কেউ জিজ্ঞেস করে না কোথায় যাচ্ছো। তোমাকে পেছন থেকে টেনে ধরার কেউ নেই কিন্তু আমাকে টেনে ধরার মানুষ আছে। আছে বুকে জড়িয়ে ধরার, আবার আছে যন্ত্রণাও।’

ইকবাল সাহেব বন্ধুদের ছবিতে লাইক দিতে গিয়ে ফেসবুক টাইমলাইনে ঘুরছিল। হঠাৎ একটি মেয়ের আইডি দেখে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেয়। মেয়েটি অ্যাড করে। কিছুদিন পর ‘হাই’ লিখে ইকবাল সাহেবকে মেসেজ পাঠায়। সে রিপ্লাই দেয়। তাদের মাঝে আলাপ হয়। মেয়েটি বললো, ‘এটা আমার ছোট বোনের ছবি। প্রোফাইলে যেটা দেওয়া।’ এভাবে কথা বলা শুরু। নিয়মিত বলতে বলতে পরিচয়।

হঠাৎ একদিন তারা দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলো। ডিসেম্বরের পঁচিশ, দুই হাজার বারোতে দুপুর একটায় তারা সাক্ষাৎ করবে। ইকবাল সাহেব বসে আছে। মেয়েটি আসবে। কিন্তু তার কোনো খবর নেই। ফোন দিচ্ছে। মেয়েটি বললো, ‘আমি আসতেছি। রিকশায় আছি।’দুজনের দেখা হলো দীর্ঘসময় অপেক্ষার পর। কথা হলো, আড্ডা হলো। দুপুরের খাবার খেলো একসাথে। চাঁনখারপুল মোড়ে এসে মেয়েটি বললো, ‘সরি, আমি খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম। তাই দেরী হয়েছিল।’সেদিন তাদের প্রথম দেখা। কাচ্চি খেয়ে, রিকশায় ঘুরে তাদের মুহূর্ত কেটে যায় আড্ডায় আড্ডায়। এরপর ইকবাল সাহেব বিদায় নিয়ে মেয়েটিকে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে চলে গেল।

মেয়েটির এ শহরে কেউ নেই। তার বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই গ্রামের বাড়িতে থাকে। ছোট বোন কুমিল্লায় পড়ালেখা করে। সেখানেই বসবাস। মাঝে মধ্যে বড় বোনের সাথে সাক্ষাৎ করতে চলে আসে ব্যস্ত শহরে। বড় বোনের সাথে থাকা হয় দু’একদিন। একদিন বড় বোনের সাথে কথা বলতে বলতে ইকবাল সাহেবের কথা জানতে পারে। তখন বড় বোনকে বললো, ‘একদিন ভাইয়াকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসি। আমাদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করবে।’

ইকবাল সাহেবের প্রেমিকা খিচুড়ি রান্না করে ফোন দিয়ে বললো বাসায় যেতে। সে বললো, ‘না।’ তখন প্রেমিকা বললো, ‘তুমি যদি বাসায় না আসো, আমি গরম খিচুড়ির ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেবো।’ প্রেমিকা অনেক রাগী। মেয়েদের হোস্টেলে ছেলেরা যাওয়া নিষেধ কিন্তু তার প্রেমিকা দারোয়ানকে টাকা দিয়ে রাজি করিয়ে নেয়।

জীবনের গল্প বলতে বলতে থেমে যায় ইকবাল সাহেব। একসময় আমাকে বললো, ‘আমাকে ওর বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। ওর বাসায় গেলাম। খাবার দিলো। গরম খিচুড়ি, গরুর মাংস দেখে জিভে জল চলে এলো। আহ্ কী মজাদার খাবার।’প্রেমিকার হাতের রান্না যে প্রেমিকের কপালে জুটলো, সত্যিই সে ভাগ্যবান বলে মনে করি। আর প্রেমিকার হাতের রান্না যে প্রেমিকের কপালে জুটলো না, সত্যিই সে হতভাগা কপাল পোড়া।ইকবাল সাহেব বললো, ‘সে রাতে বাসায় আসা হয়নি, আমি চলে আসতে চাইলে ও আমাকে আসতে দিতে চাচ্ছে না। বললো, আজ থেকে যাও তুমি। তার জোরাজুরিতে রয়ে গেলাম। দুচোখে আমাদের ঘুম ছিল না। সারারাত গল্প করে কাটিয়ে দিলাম। ভোরে নামাজ পড়ে বাসায় চলে আসি। সে আসাই শেষ আসা।’ আমি জানতে চাইলাম, ‘তারপর?’সে বললো, ‘বছর ছয়েক পর আমাদের দেখা। আমাকে ফোন দিলো, সাক্ষাৎ করতে টিএসসি ছুটে গেলাম। সে বলেছিল, আমি যেন ঠিক চারটায় টিএসসিতে থাকি। পুরান ঢাকায় থাকা কিছু বন্ধুদের সাথে দেখা করে চারটার আগেই বসে আছি টিএসসিতে। অনেক সময় বসে থাকার পর আমি ফোন দিই। রিসিভ করে বললো, আমি রিকশায় আছি। সে আসার পর টিএসসি থেকে গেলাম গাউসিয়া নিউ মার্কেট। রিকশায় যাচ্ছি আর কথা হচ্ছে।’

ইকবাল সাহেবের কাছে জানতে পারি, ‘সে এখন অনলাইনে শাড়ির বিজনেস করে। তার স্বামী বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। প্রতি মাসে লাখ টাকা বেতন। বছর ছয়েক পর যখন তাকে দেখি, আমাদের সাক্ষাৎ হয়, সে শাড়ি পরে কপালে টিপ দিয়ে সেজেগুজে আসে। সাথে নিয়ে আসে তরমুজ। সে জানতো তরমুজ আমার খুব পছন্দ। সাপ্তাহখানেক পর তার সাথে দেখা করতে শাহবাগ আসি। তখন সে কাঁচা আম খেতে চায়। ওই সময় কাঁচা আম পাওয়া খুব কষ্টকর। সে কাঁচা আম খেতে খুব পছন্দ করে। বড় বোন কাঁচা আমের আচার তৈরি করেছিল। আমি সেই আচার নিয়ে পরের দিন দুপুরবেলা তার বাসায় যাই। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে সুখের কান্না করেছিল।’

‘ইকবাল সাহেব এরপর কী হলো?’ জানতে চাই আমি।সে বললো, ‘মাস দুয়েক পরের ঘটনা। শবনম আর আমি টিএসসিতে আসি, আড্ডা দিচ্ছি। সেদিন তাকে বললাম, তুমি তরমুজ নিয়ে এসেছিলে। খেয়েছি। তুমি কাঁচা আম পছন্দ করো। তাই তোমার বাসায় আমের আচার নিয়ে গিয়েছি। এটা আমার ভুল ছিল। কারণ এখন তুমি অন্যের ঘরণী। শবনম বললো, আজ কত কাছে থেকেও কত দূরে আমরা। অথচ একদিন কত দূরে থেকেও কত কাছে ছিলাম।’

আমরা মনে করি মানুষ পাওয়া সহজ। কিন্তু না, মানুষ পাওয়া সহজ নয়। টাকা পাওয়া সহজ। ঘাম ঝরালে টাকা পাওয়া যায় কিন্তু টাকা থাকলেই মনের মানুষ পাওয়া যায় না। প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার পর ইকবাল সাহেব পাড়ি দিয়েছিলেন বিদেশে। সেখানে গিয়ে একটা হোলিডেইন ফাইভ স্টার হোটেলে চাকরি নেন। বাংলাদেশের টাকায় তার বেতন পনেরো হাজার টাকা মাত্র।সেখানে গিয়ে তার সাথে পরিচয় হয় নেপালের নাগরিক নীরমালার সাথে।

নীরমালা এ হোটেলে ছয় মাসের জন্য কোর্স করতে আসে। নীরমালা প্রথম দেখাতেই তাকে ভালোবেসে ফেলে। তারা কাজ শেষে প্রতিদিন আড্ডায় মেতে ওঠে। এভাবে চলতে থাকে প্রবাস জীবন।

নীরমালা একদিন ইকবাল সাহেবকে বললো তাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতে। বিদেশের সিনেমা হলে তার সিনেমা দেখা হয়নি। ইকবাল সাহেব রাজি হয়। এই প্রথম নীরমালা বিদেশি সিনেমা হলে যাচ্ছে। ইকবাল সাহেব নীরমালাকে নিয়ে গাড়ির জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করছে, গাড়ি এসে হাজির।

তারা অনেকটা পথ গল্প করতে করতে সিনেমা হলে আসে। টিকিট কেটে সিনেমা দেখে হোটেলে ফেরে। ইকবাল সাহেব আর নীরমালা প্রতি সপ্তাহে বা মাসে দুইবার সিনেমা হলে যায়। আসলে ছবি দেখাটা মূল বিষয় নয়। তারা একে অপরের সাথে সময় কাটাতে দিনটাকে বেছে নেয়।

হোটেলে সবাই থাকে। চাইলেও যে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা যায় না। তাই ছুটির দিনটাতে সিনেমা হলে গিয়ে আড্ডা দেওয়া, ছবি দেখা আর সুখ-দুঃখের গল্প করে কাটিয়ে দেওয়াই তাদের আনন্দ বা সুখের জীবন মনে করে। নীরমালা তার প্রেমিকের কাঁধে মাথা রেখে সিনেমা দেখে শান্তি পায়, ইকবাল সাহেবও শান্তি পায় তার কাঁধে প্রেমিকার মাথা রাখায়।

একদিন সিনেমা দেখা শেষ করে হোটেলে আসার পথে নীরমালার পিরিয়ডের ব্যথা শুরু হয়। তার ব্যথা দেখে ইকবাল সাহেব কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বললো, ‘তোমার আজ বের হওয়াটা ঠিক হয়নি।’ ব্যথার মাঝে জ্ঞানের কথাও ব্যথাই মনে হয়। নীরমালা চুপ করে আছে। ইকবাল সাহেব তাকে যাত্রী ছাউনির নিচে বসিয়ে ছুটে গেল সুপার শপে। সেখান থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে এক বাঙালি মুসলিমের বাড়িতে উঠলো।নীরমালা নিজেকে সামলে নিয়ে ঘণ্টাখানেক পর বললো, ‘এবার আমরা যাই।’ইকবাল সাহেব বাঙালির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নীরমালাকে নিয়ে হোটেলে ফিরে এলো।

কঠিন সময়ে যে তোমার পাশে থাকে; সেই হচ্ছে প্রকৃত বন্ধু। হোক সে মা-বাবা, ভাই-বোন, প্রিয় মানুষ বা অপরিচিত কেউ। ভাগ্য অনেক সময় উল্টে গিয়ে নিজেকে ছোবল দেয়। ইকবাল সাহেবের ভাগ্যে সব সময় তা-ই হয়েছে। প্রিয় মানুষটাকে ছেড়ে বিদেশে এসেছে। এখানে চেয়েছিল জীবনটাকে নতুন করে গড়তে কিন্তু কী অদ্ভুত তার ভাগ্য!

সেদিন ইকবাল সাহেব আর নীরমালা একসাথে হোটেলে প্রবেশ করে, যা দেখে ফেলে নীরমালার স্যার। সেই নেপালি স্যার হোটেলের ম্যানেজারকে বিষয়টি ভিন্নভাবে বলায় ইকবাল সাহেবের ওপর সতর্কবার্তা চলে আসে। তাই তাকে তার স্থান পরিবর্তন করতে হয়।

নীরমালার সাথে যোগাযোগ বন্ধ হওয়ার পর ইকবাল সাহেবের কাজকর্মে মন বসে না। মালয়েশিয়া মনে হয় তার কাছে বন্দি জেলখানা। শক্ত করে হাত ধরে আছে শবনম, ‘আমি ভয় পাচ্ছি, সে যদি কোনো বিপদে ফেলে আমাকে।’ইকবাল সাহেব বললো, ‘কী হয়েছে তোমার? তুমি এমন করছো কেনো?’‘ইকবাল তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না, আমাকে তুমি ছেড়ে চলে যেও না।’শবনম বললো, ‘আমি স্বামী পেয়েছি কিন্তু প্রেমিক পাইনি, তোমার মতো করে কেউ আমাকে ভালোবাসে না।’

প্রত্যেক নারীই চায় স্বামী তাকে ভালোবাসুক, তাকে জানুক, তার না-বলা কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করুক। ভালোবাসা ছাড়া জীবন হচ্ছে লবণ ছাড়া তরকারির মতো, স্বাদ লাগে না। ভালোবাসা ছাড়া জীবনের মানেই হচ্ছে স্বাদহীন। ব্যথা পেলে, কষ্ট পেলে আনন্দ লাগে প্রিয় মানুষটি যদি ভালোবাসে। নয়তো যতই সুখ আর আনন্দ নিজেকে ঘেরা দিয়ে রাখুক না, মনে শান্তি নেই, প্রিয় মানুষটিকে ছাড়া।

স্মৃতি আর বিরহের গল্পে ফুরিয়ে আসে শবনম আর ইকবাল সাহেবের সময়। এরপর সন্ধ্যার আজান। শবনমকে ঝিগাতলা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ইকবাল সাহেব চলে যায় গাজীপুর। ইকবাল সাহেব যে সুখ চেয়েছিল মালয়েশিয়ায় গিয়ে, তা-ও আজ মরীচিকা হয়ে গেছে। নিজ দেশের মাটিতে শবনম বেঁধেছে ঘর অন্যের সাথে, তার সংসারে ফুটফুটে কন্যাসন্তান।

নীরমালার খবর আজ অজানা। সেও হয়তো সুখেই আছে নেপালে। সত্যিই কিছু কিছু মানুষের জীবনে সুখ হচ্ছে মরীচিকা। ইকবাল সাহেবের মায়ের বয়স হয়েছে। মাকে গ্রামের বাড়িতে একা রেখে ব্যস্ত শহরে এসে কাজকর্ম করতে ভয় হয় তার। তাই ভাগ্যকে বিধাতার চরণে দিয়ে নতুন জীবনে পা রেখেছে সে।

ইকবাল সাহেবের সংসারে একটি রাজপুত্র এখন। প্রতিদিন ছেলের সাথে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে। ছেলেকে যখন জিজ্ঞেস করে, ‘আব্বু খেয়েছো?’ সে বলে, ‘হুম।’ সে হুম হুম বেশ বলতে পারে।

পরের অধীনে কাজ করা মানেই তাদের মন জোগাড় করে চলতে হবে, চলতে হয়। ইকবাল সাহেব এখন আইটি অফিসে চাকরি করে। সেখানে লজিস্টিক সাপোর্টে আছে। প্রতিদিনই কমবেশি এক অফিস থেকে আরেক অফিসে প্রোডাক্ট নিয়ে যেতে হয়। ডেলিভারির কাজ তাকেই করতে হয়। সময় আর শরীর একসাথে দৌড়াতে থাকে। শেষ নেই, যতক্ষণ অফিস চলবে; ততক্ষণ ঘড়ির কাঁটা টিক টিক টিক আর তার দেহ ঠিক ঠিক ঠিক।

আরও পড়ুনকবির হোসেন মিজির গল্প: চাঁদরাতের শেষ সেলাই হাসান জাহিদের গল্প: অনঘ 

এসইউ