আমিনুল ইসলাম
ইসরায়েল আজ লেবাননে ইতিহাসের সবচাইতে বড় হামলাটা করেছে। আমি বৈরুতে ঘুরতে গিয়েছি অনেক বার। চমৎকার শহর। বৈরুত কিন্তু কোনো আরব শহরের মতো না। মানে আপনি সৌদি আরবের রিয়াদ, কাতারের দোহা কিংবা দুবাইতে গেলে যেমন দেখবেন। বৈরুত সেই রকম না। এটি অনেকটা ইউরোপীয় কিংবা পশ্চিমা ধাঁচের শহর। লেবানন দেশটার একটা আলাদা আবেদন আছে।
লেবাননই আরব দেশগুলোর মাঝে একমাত্র দেশ; যেখানে মুসলিম এবং খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। মুসলিম ৫৩ ভাগ, খ্রিষ্টান ৪২ ভাগ। এরা চমৎকারভাবে মিলেমিশে থাকে। ওদের প্রেসিডেন্ট কিন্তু খ্রিষ্টান ধর্মের। ওদের সংস্কৃতিও ঠিক ওই অর্থে আরবদের মতো না। বৈরুতের কোনো ক্যাফেতে সন্ধ্যার আড্ডায় বসলে আপনার মনে হবে, আপনি পশ্চিম ইউরোপের কোনো দেশে চলে এসেছেন। খুবই চমৎকার একটি দেশ। সেই শহরে আজ পাঁচ মিনিটের মাঝে প্রায় ১৫০টি বোমা ফেলেছে ইসরায়েল।
লেবাননের মানুষজন সাধারণত কিছুটা হলেও জানে, কোন জায়গায় ইসরায়েলিরা হামলা চালাতে পারে। মূলত দক্ষিণ লেবানন এবং রাজধানী শহর বৈরুতের দক্ষিণের উপশহরেই ইসরায়েলিরা হামলা করে। অনেক বছর ধরে চলছে তো, ওরা অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে এতে। কিন্তু আজকে ইসরায়েলিরা কোনো নিয়ম মানে নাই। নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর মাঝে ২৫৪ জন মারা গেছে। প্রায় হাজারেরও বেশি আহত হয়েছে। এখনো কাউন্ট চলছে।
অর্থাৎ কয়েক হাজার মানুষ আজ হতাহত হয়েছে। মাত্র ৫৩ লাখ জনসংখ্যার দেশে যদি কয়েক হাজার মানুষ হতাহত হয়; তাহলে তো বুঝতেই পারছেন, কী ভয়াবহ হামলাটা করেছে। ওদের হাসপাতালগুলোতে জায়গা হচ্ছে না। ইসরায়েলের সাথে লেবাননের এত বছরের যুদ্ধের ইতিহাসেও কোনো দিন এত বড় হামলা হয় নাই (এমনকি বছর কয়েক আগের পেজার বিস্ফোরণের ঘটনাও না।) অন্তত আমার স্মরণকালে তো নয়-ই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আজ এমন হামলা করলো? সহজ দুটো উত্তর আছে, এক. যুদ্ধ বিরতির সংবাদে নেতানিয়াহু পাগলপ্রায়। তাই লেবাননে হামলা করে নিজের শক্তি দেখাতে চাইছে সাধারণ ইসরায়েলিদের কাছে। বলতে চাইছে, দেখো ইরানে যুদ্ধ বিরতি হলেও আমরা লেবাননে ঠিকই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি।
দুই. যেটা হবার সম্ভাবনাই বেশি, ইসরায়েল চাইছে ইরান যেন পাল্টা হামলা চালায়। তাহলে ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে। যেহেতু ইরান আগেই শর্ত দিয়ে রেখেছিলো, লেবাননেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। ইরান ঘণ্টাখানেক আগে জানিয়েছে, লেবাননে যদি হামলা বন্ধ না হয়, তাহলে শুক্রবারে যুদ্ধ বন্ধের জন্য যে আলোচনা শুরু হবার কথা, আমরা সেখানে যাব না।
আরও পড়ুনএলাচিতে রং মেশাতে হচ্ছে কেনএদিকে ট্রাম্প একটু আগে বলেছে, লেবানন যে এই যুদ্ধ বিরতিতে ছিল, এটা আমার জানা ছিল না! মানে চিন্তা করে দেখেন অবস্থা, সে নাকি জানতো না! ট্রাম্প যে নেতানিয়াহুর স্রেফ খেলার পুতুল হিসেবে এই যুদ্ধ শুরু করেছে; এখন এটা পরিষ্কার হচ্ছে। এটাই এপিস্টিন ক্লাসের চরিত্র। আমেরিকার সাবেক জাতীয় সন্ত্রাস দমন প্রধান জো কেন্ট, যাকে ট্রাম্পই নিয়োগ দিয়েছিল। এই যুদ্ধ শুরু হবার পর সে পদত্যাগ করে বলেছে, এটা একটা অনৈতিক যুদ্ধ।
সে আজ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবার পর বলেছে, এটা খুবই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি। এরপর সে বলেছে, ইসরায়েল যে কোনো পর্যায়ে, যে কোনো সময়ে এই শান্তি প্রচেষ্টা স্যাবোটেজ (নাশকতা) করার চেষ্টা করবে। মধ্যপ্রাচ্যে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না, যদি না আমেরিকা ইসরায়েলকে যে কোনো রকম নাশকতা করা থেকে বিরত রাখতে পারে।
সে এ কথা বলার তিন ঘণ্টার মাঝেই ইসরায়েল লেবাননে হামলা করেছে। আপনাদের জানিয়ে রাখি, নিউইয়র্ক টাইমস আজ রিপোর্ট করেছে, জো কেন্ট এই যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে যে আলোচনা হয়েছে; সেই টেবিলে ছিল এবং কেন্ট জানিয়েছে, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ করতে রাজি করিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুদ্ধবিরতি কি তাহলে টিকবে? আল জাজিরার বিখ্যাত কলামিস্ট জন পাওয়ার আজ একটা কলাম লিখেছে। যার শিরোনাম হচ্ছে, ‘হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে।’ বোধকরি পুরো কলামের ব্যাখ্যা দেবার আর প্রয়োজন নেই। বোঝাই যাচ্ছে, এই যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবার পর ইরান যে এখন থেকে হরমুজে টোল নেবে, সেটা আমেরিকান ডলারে না হয়ে চাইনিজ কারেন্সিতে হবার সম্ভাবনাই বেশি। তাহলে তো আমেরিকার ডলারের যে হেজিমনি (প্রভাব) পুরো পৃথিবীতে রয়েছে, সেটা কমে যাবে। এখন ট্রাম্প মানলেও সাধারণ আমেরিকানরা কি এটা মানবে?
আমি আজকে সিএনএন দেখেছি খুব ভালো করে। আপনারা যারা জানেন না, তাদের জানিয়ে রাখি, সিএনএন হচ্ছে ডেমোক্রাটদের টেলিভিশন। আর ফক্স নিউজ হচ্ছে রিপাবলিকানদের (ট্রাম্পের দলের)। এখন যেহেতু ট্রাম্প ইরানের শর্ত মেনে নিয়েছে। সিএনএন শুরু করেছে আরেক তামাশা! ওরা আজকে নিজেদের আলোচকদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান করেছে। সেখানে সবাই বলেছে, ইরানে যুদ্ধ থামিয়ে ট্রাম্প তো আমেরিকার প্রভাব পৃথিবীব্যাপী কমিয়ে দিলো। এটা তো আমেরিকার জন্য খারাপ হয়েছে ইতাদি।
আরও পড়ুনঅস্থিরতার আগুনে পুড়ছে জনপদ: আজহারীঅথচ এই টেলিভিশনই গতকাল রাত পর্যন্ত বলেছে, ট্রাম্প মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে যাচ্ছে ইরানে। মানে অন্য আরও অনেক সমালোচনা। এখনো সমালোচনা করছে। কিন্তু ভিন্ন সুরে। এটাই এপস্টিন ক্লাস আমেরিকান বড় বড় মিডিয়াগুলোর আসল চরিত্র।
তবে ইউরোপীয়রা বসে নেই। আজ ইংল্যান্ড, জার্মানি এবং সব ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো বিবৃতিতে বলেছে, সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতি মানতে হবে। ইসরায়েলকে অবশ্যই লেবাননে যুদ্ধ থামাতে হবে। এ যুদ্ধ ইসরায়েল থামাতে দেবে কি দেবে না; এটা এখনই বলা যাচ্ছে না। যে কোনো মুহূর্তে ওরা নাশকতা করতে পারে। নিজেরা কোথাও হামলা করে বলবে, ইরান কিংবা ইরানের প্রক্সি করেছে। খুবই নড়বড়ে একটা যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তাই পৃথিবীকে ধৈর্য নিয়েই অপেক্ষা করতে হবে, যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হয়, সেটাই দেখার।
তবে এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়, যুদ্ধ যদি পুরোপুরি থেমে যায়; তাহলে যেমন আমেরিকার সাম্রাজ্যের হেজিমনি (প্রভাব) কমে যাবে। আর যদি না থামে, মানে ইসরায়েলের জন্য যদি আমেরিকা শেষপর্যন্ত এই যুদ্ধ চালিয়ে নেয়। তাহলে তো সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার প্রভাব পুরোপুরিই ভেঙে যাবে। কোনো দেশ আর এদের কথা শুনবে না। এই যুদ্ধে কেউ যদি জয়ী না-ও হয়। আমেরিকার পরাজয় হয়েছে, এটি একদম পরিষ্কার করেই বলা যায়।
লেখক: বিশ্লেষক এবং জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, এস্তোনিয়ান এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ইউনিভার্সিটি।
এসইউ