জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষির চ্যালেঞ্জ
মোতাহার হোসেন
দেশে ক্রমাগত বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে খাদ্য চাহিদা। অন্যদিকে দিন দিন কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। এ অবস্থায় কৃষির এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে তথা বর্ধিত মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণে কম জমিতে অধিক ফসল উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই। আবার উৎপাদন বাড়াতে উর্বর মাটি, ভালো বীজ, সার, জৈব সার, কীটনাশক দরকার। একই সঙ্গে প্রয়োজন এসবের সময়মতো সুষম প্রয়োগ। কারণ মাটিই হচ্ছে খাদ্য উৎপাদনের সূতিকাগার। কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর এবং উন্নতজাতের ফসল আবাদ করতে গিয়েও জমির ওপর চাপ পড়ছে।
তা ছাড়া জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগ ছাড়াও প্রতি বছর মৃত্তিকা ক্ষয়, নগরায়ণ, রাস্তাঘাট, খনিজ কর্মকাণ্ড, জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি খরার কারণে ভূমি তার উর্বরতা হারাচ্ছে। সে কারণে জমির উৎপাদন ক্ষমতা চিন্তা করে জমিকে মাঝে মাঝে বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন। নতুবা মাটির উর্বরতা কমে যায়। মাটির উর্বরতা কমে গেলে মাটির ভূপ্রকৃতি বা পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশ। ফলে ফসল উৎপাদন যেমন কমছে; তেমনই প্রকৃতি বা পরিবেশেরও সর্বনাশ ডেকে আনছে। পাশাপাশি উৎপাদন কমে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ জরুরি। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ হেক্টরের অধিক উর্বর কৃষিজমি মরুকরণের ফলে অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে। এতে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৪৫০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। এটা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ। মাটির উর্বরতা হ্রাসের কারণ হচ্ছে, জমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ, নদীভাঙন, অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ, বন নিধন, উর্বর জমির মাটি ইট ভাটায় ব্যবহার, আবাদি জমিতে স্থাপনা নির্মাণ। এ ছাড়া প্রতি বছর মৃত্তিকা ক্ষয়, নগরায়ণ, রাস্তাঘাট, খনিজ কর্মকাণ্ড, জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি খরা প্রভৃতিতে ভূমি তার উর্বরতা হারাচ্ছে। এসব কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বে প্রায় ২ কোটি হেক্টর উর্বর ভূমি হারিয়ে যাচ্ছে।
- আরও পড়ুন
বোরো ধানের জমি শুকানোর গুরুত্ব
বীজের পর মাটি হচ্ছে কৃষির অন্যতম ভিত্তি। উপযুক্ত মাটি না হলে অর্থাৎ ফসলের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান সমৃদ্ধ মাটি না হলে কাঙ্ক্ষিত ফসল পাওয়া যায় না। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভূমি ও ফসল উৎপাদন। গবেষকরা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের ২০৬০ সালের মধ্যে দেশের প্রধান ফসলগুলোর ফলন ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা আছে। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য টেকসই মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সমন্বিত নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এ নীতিমালা অনুসারে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক পরিবর্তিত জলবায়ুর বিরূপ প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রতি বছর সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ করে আবাদি জমি অনুর্বর করে ফেলে। এতে ফসলের উৎপাদন কমে যায় মারাত্মকভাবে। অন্যদিকে ওই অঞ্চলের প্রকৃতি তথা জীববৈচিত্র্যও সংকটাপন্ন। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, লবণের কারণে জমিতে কোনো ফসল উৎপাদন হয় না। লবণের প্রভাবে মাটির উর্বরতা এবং গাছের বৃদ্ধি কমে যায়। অনেক কৃষক সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার না করে অধিকহারে অনুমান ভিত্তিক সার ব্যবহারে ফলে মাটির ইকোসিস্টেম ধ্বংস হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ৬০ শতাংশ। বর্তমানে তা ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কৃষিতে উৎপাদন নির্ভর করে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, রোদ, জলবায়ু পরির্বতনের ওপর। এ ছাড়া মাটির ক্ষয়, মাটির নিম্নস্তরের জৈব পদার্থ, উর্বরতা হ্রাস, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ইত্যাদি মোটাদাগে ফসল উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এ চিত্র বিশ্বব্যাপী হলেও বাংলাদেশে এর প্রভাব উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ন, কার্বন নিঃসরণের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এবং বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্ব ও বাংলাদেশের জন্য বিশাল হুমকি। ধারণা করা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের যতটুকু এলাকা তলিয়ে যাবে, তার মধ্যে কৃষিজমির পরিমাণ হবে ৩০ শতাংশ। দেশে বর্তমানে প্রায় ২০ কোটি মানুষ রয়েছে।
প্রতি বছর ২২-২৫ লাখ নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে; অন্যদিকে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বাড়িঘর নির্মাণ, রাস্তাঘাট তৈরিসহ নানা কারণে চাষের জমি কমছে। এ দুই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। মাটির জৈব পদার্থ দ্রুত ভেঙে যাওয়ার কারণে মাটির কাঠামো, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমছে। উচ্চ তাপমাত্রায় গাছের প্রস্বেদন ক্ষমতা কমে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের এক দুষ্ট ক্ষত অসময়ে অনেক বেশি বৃষ্টি। অসময়ে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতায় ধান ও অন্যান্য ফসল ফলনে কৃষককে নিরাশ করে। প্রসঙ্গত, উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সারের সুষম ও সময়মতো ব্যবহার নিশ্চিতে সরকারের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করে বিএফএ এবং এর প্রায় সাড়ে পাঁচশ সদস্য দেশে সকল প্রকার মাটি, সার ও উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কাজ করছে।
মূলত নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠিত বিএফএ সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে মাটির গুণাগুণ রক্ষা, নকল ও ভেজাল, নিম্নমানের সার, বীজ, কীটনাশক ব্যবহারে সচেতনতামূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদাসীনতায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের সার, কীটনাশক, বীজ বাজারজাত ও বিক্রি করায় কৃষক ও কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন অবস্থায় প্রত্যাশা থাকবে খাদ্য চাহিদা পূরণে সার উৎপাদনকারী, আমদানিকারক ও ডিলারদের কার্যক্রমের কার্যকর এবং সমন্বিত তদারকি অপরিহার্য। নতুবা খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত ও দেশের কৃষি ও কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে পরিত্রাণে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।
পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে খামার বা গৃহস্থালির আবর্জনা, উচ্ছিষ্ট পদার্থ দিয়ে বিনা খরচে জৈব সার উৎপাদন, ইউরিয়া সার পরিমিত মাত্রায় প্রয়োগ করা। একই ভাবে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার প্রয়োগে সর্তকতা অবলম্বন ও মাটি পরীক্ষা করে সুষম মাত্রায় পরিমিত পরিমাণ সার ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম।
এসইউ