এমপি-মন্ত্রীরা কেন শপথ নেন? সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও নৈতিক অঙ্গীকার
নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শপথগ্রহণের মধ্য দিয়েই তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তবে প্রশ্ন ওঠে—এই শপথ কেন নেওয়া হয় এবং এর প্রকৃত তাৎপর্য কী?
শপথ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ও আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় করার একটি অপরিহার্য ধাপ। বাংলাদেশে শপথগ্রহণের বিধান রয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানে। সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য শপথগ্রহণ না করলে তিনি সংসদ অধিবেশনে অংশ নিতে বা ভোট দিতে পারেন না। একইভাবে মন্ত্রীরা শপথ ছাড়া তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন না।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন রক্ষা ও মান্য করার অঙ্গীকারই শপথের মূল বক্তব্য। এর মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ঘোষণা করেন যে তারা ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে দেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়া মন্ত্রীরা শপথে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নীতিনির্ধারণ ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে গোপনীয়তা বজায় রাখা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শপথ একটি নৈতিক অঙ্গীকারও বটে। এটি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ, যাদের ভোটে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন। শপথের মাধ্যমে তারা জনগণের কল্যাণে কাজ করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন।
সব মিলিয়ে, এমপি ও মন্ত্রীদের শপথগ্রহণ রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিক দায়িত্বের প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোনো ব্যক্তি সংবিধানের বিধান অনুযায়ী শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করা এবং শপথপত্রে বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করার আগে কিংবা তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য না হয়ে বা অযোগ্য হয়েছেন জেনে সংসদ সদস্য হিসেবে আসনগ্রহণ বা ভোট দিলে তিনি প্রতিদিনের অনুরূপ কাজের জন্য প্রজাতন্ত্রের নিকট দেনা হিসেবে উসুলযোগ্য এক হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি)। ২৯৭টি আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ২৯৭ জন সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে নির্বাচিত এমপিদের গেজেট প্রকাশ করা হয়।
আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে এসব এমপিকে শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। এরপর প্রথমবারের মতো নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ হবে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। বিকেল ৪টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শপথ পড়াবেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ৩০০ আসনের বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে এককভাবে সরকার গঠন করতে কমপক্ষে ১৫১ আসন প্রয়োজন। দুই শতাধিক আসন পাওয়ায় বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিতব্য মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চীন, ভারত, পাকিস্তানসহ ১৩ দেশের সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথের পর পার্লামেন্টারি বোর্ডের সভা হবে। সেখান থেকে দলনেতা নির্বাচিত হবেন। তারপর দলের নেতা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে বলবেন, আমাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে সংসদে। তখন রাষ্ট্রপতিকে তিনি সরকারপ্রধান করার অনুরোধ করবেন। রাষ্ট্রপতি দলনেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভায় সদস্যদের নির্বাচিত করবেন। প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের রাষ্ট্রপতি শপথ পড়াবেন।
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মন্ত্রিসভায় একজন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্ধারণ করবেন, সেভাবে অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী থাকবেন। তবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংখ্যার কমপক্ষে ১০ ভাগের নয় ভাগ সংসদ সদস্যের মধ্য থেকে নিয়োগ পাবেন। সর্বোচ্চ ১০ ভাগের এক ভাগ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভার সদস্য মনোনীত (টেকনোক্র্যাট) হতে পারবেন বলে সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদ সদস্যরা যেসব সুযোগ-সুবিধা পান
বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত নানা ধরনের বেতন-ভাতা ও সুযোগ–সুবিধা ভোগ করেন। এসব সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট (রিমিউনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস), ১৯৭৩’ বা ‘সংসদ সদস্য (পারিশ্রমিক ও ভাতা) আদেশ, ১৯৭৩’ অনুযায়ী। এটি বিভিন্ন সময়ে সংশোধন করা হয়েছে, সর্বশেষ ২০১৬ সালে এটি সংশোধিত হয়।
আইন অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য নিয়মিত মাসিক বেতন ছাড়াও পরিবহন, অফিস, চিকিৎসা, ভ্রমণ, বিনা শুল্কে গাড়ি আমদানি, বিমা ও নানা ধরনের ভাতা পান। একজন সংসদ সদস্য মাসিক ৫৫ হাজার টাকা মূল বেতন পান। এর পাশাপাশি তিনি মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্বাচনি এলাকা ভাতা পান। এছাড়া মাসিক ৫ হাজার টাকা আপ্যায়ন ভাতা দেওয়া হয়।
সংসদ সদস্যরা মাসিক ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা পান। এই ভাতার মধ্যে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং চালকের বেতন অন্তর্ভুক্ত থাকে। নির্বাচনি এলাকায় অফিস পরিচালনার জন্য মাসিক ১৫ হাজার টাকা অফিস ব্যয় ভাতা দেওয়া হয়।
ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সংসদ সদস্যরা মাসে আরও কিছু ভাতা পান। এর মধ্যে রয়েছে এক হাজার ৫০০ টাকা লন্ড্রি ভাতা এবং ৬ হাজার টাকা বিবিধ ব্যয় ভাতা; যা বাসনপত্র, বিছানাপত্র, টয়লেট্রিজসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য নির্ধারিত।
সংসদ সদস্যদের জন্য বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো শুল্ক ও করমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা। একজন সংসদ সদস্য তার মেয়াদকালে সরকার নির্ধারিত শর্তে একটি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করতে পারেন শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর ছাড়াই। পাঁচ বছর পর একই শর্তে আবার নতুন একটি গাড়ি আমদানির সুযোগও রয়েছে।
ভ্রমণ সুবিধার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা সংসদের অধিবেশন, কমিটির সভা ও দায়িত্বসংক্রান্ত কাজে যাতায়াতের জন্য আলাদা ভাতা পান। রেল, বিমান বা নৌপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড় গুণ ভাতা দেওয়া হয়। সড়কপথে যাতায়াতে কিলোমিটারপ্রতি ভাতা নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া দেশের ভেতরে যাতায়াতের জন্য বছরে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ভ্রমণ ভাতা অথবা সমমূল্যের ট্রাভেল পাস সুবিধাও দেওয়া হয়।
সংসদ অধিবেশন, সংসদীয় কমিটির সভা বা দায়িত্বসংক্রান্ত অন্য কোনো কাজে দায়িত্বস্থলে অবস্থান করলে সংসদ সদস্যরা ৭৫০ টাকা দৈনিক ভাতা ও ৭৫ টাকা যাতায়াত ভাতা পেয়ে থাকেন।
সংসদ অধিবেশন বা কমিটির সভায় উপস্থিত থাকলে সদস্যরা দৈনিক ভাতাও পান। উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রতিদিন ৮০০ টাকা দৈনিক ভাতা ও ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা নির্ধারিত হারে প্রদান করা হয়।
চিকিৎসা সুবিধার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবার সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের চিকিৎসা সুবিধা পান। পাশাপাশি মাসিক ৭০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয়।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সংসদ সদস্যদের জন্য সরকারিভাবে ১০ লাখ টাকার বিমা সুবিধা রাখা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে এই বীমা কার্যকর হয়।
এছাড়া প্রত্যেক সংসদ সদস্য বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত একটি ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল ব্যবহার করতে পারেন, যা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ব্যয় করার বিধান রয়েছে।
টেলিযোগাযোগ সুবিধার অংশ হিসেবে সংসদ সদস্যদের বাসভবনে সরকারি খরচে একটি টেলিফোন সংযোগ দেওয়া হয় এবং মাসিক ৭ হাজার ৮০০ টাকা টেলিফোন ভাড়া ও কল খরচ বাবদ প্রদান করা হয়।
এমএএস/এসএইচএস