বিশেষ প্রতিবেদন

চায়ের দেশে আমেজহীন ভোট

সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে ঘিরে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গলসহ নানা প্রতীকের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠছে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো। তবে চায়ের দেশখ্যাত সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। পাঁচ বছর পর আবারও ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন এ ইউনিয়নের অবহেলিত চা শ্রমিকরা। তবে নির্বাচনকে ঘিরে এসব শ্রমিকদের মাঝে নেই কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা। কারণ ভোট এলে বিজয়ী প্রার্থীদের ভাগ্য বদলালেও শুধু বদলায় না যুগ যুগ ধরে বঞ্ছনার শিকার  এসব চা শ্রমিকদের।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগামী ৪ জুন পাইকপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ইউনিয়নের মোট ভোটার সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই চা শ্রমিক। এর ফলে নির্বাচন এলেই চা শ্রমিকদের কদর কিছুটা বেড়ে যায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সকাল-সন্ধ্যায় চা শ্রমিকদের কাছে হাজির হচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। শ্রমিকদের জীবনমানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন। তবে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতে মন গলছে না চা শ্রমিকদের। কারণ ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর আর প্রার্থীদের খুঁজে পাওয়া যায় না।ভোট নিয়ে কথা হয় পাইকপাড়া ইউনিয়নের দেওন্দি চা বাগানের শ্রমিক অরুণ মালের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে জানান, ভোট নিয়ে আমাদের কোনো বাড়তি ভাবনা নেই। প্রতিবারই ভোটের আগে প্রার্থীরা আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসেন, আমাদের ভোটে প্রার্থীরা নির্বাচিত হন ঠিকই কিন্তু আমাদের জীবনমান উন্নয়নে কোনো কাজ করেন না। তিনি আরও বলেন, চা বাগান থেকে বাড়িতে আসা-যাওয়ার সেই কাঁচা রাস্তাটি এখনো পাকা হয়নি। এছাড়া আমাদের এলাকায় চোরের উপদ্রব সব থেকে বেশি। প্রায় রাতেই আমাদের গরু চুরি করে নিয়ে যায় চোররা। এসব সমস্যা সমাধানে কেউ এগিয়ে আসেন না।দেওন্দি চা কারখানার নিরাপত্তারক্ষী বিমল বাক্তি জাগো নিউজকে বলেন, আমারা যুগের পর যুগ ধরে অসহায় জীবন-যাপন করছি কিন্তু আমাদের ভাগ্য ফেরাতে আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য কেউ কথা বলেন না। তবে পাঁচ বছর পর যেহেতু আবারও প্রার্থী নির্ধারণের সুযোগ পেয়েছি তাই ভোট দিয়ে এমন প্রার্থীকেই বেছে নেব যিনি সত্যিকার অর্থেই চা শ্রমিকদের জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করবেন।এদিকে, নির্বাচনকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণায় দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন চেয়ারম্যান ও সদস্য (মেম্বার) প্রার্থীরা। নির্বাচনের দমকা হাওয়া একটু হলেও পৌঁছেছে চা শ্রমিকদের ঘরে-ঘরে। আর তাই প্রার্থীরা এখন ভোটারদের দরজায় কড়া নেড়ে চা শ্রমিকদের খেদমতের সুযোগ দেয়ার জন্য তাদের মূল্যবান ভোট প্রার্থনা করছেন।পাইকপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. ওয়াহেদ মাস্টার জাগো নিউজকে জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর চা শ্রমিকদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছে। সরকার তাদের জন্য নানা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। তবে আমি যদি নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারি তাহলে চা শ্রমিকদের প্রতি আমার বিশেষ নজর থাকবে তারা যেন সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারেন। এছাড়া চা শ্রমিকদের প্রধান সমস্যা গরু চুরি, সেটি আমি ঠেকানোর চেষ্টা করবো।বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী আইয়ূব আলী নির্বাচনে ভোট কারচুপির আশঙ্কা প্রকাশ করে জাগো নিউজকে জানান, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন নির্বাচনে জোরপূর্বক কেন্দ্র দখল করে তারা নৌকা প্রতীকে সিল মারবেন। এর ফলে ভোটাররা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।তিনি আরও জানান, যদি সুষ্ঠু ও নিপেক্ষ নির্বাচন হয় তাহলে আমি বিপুল ভোটে নির্বাচনে বিজয়ী হব। বিজয়ী হওয়ার পর আমি অবহেলিত চা শ্রমিকদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাবো।তবে নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র। তিনি জাগো নিউজকে জানান, নির্বাচন কমিশন থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তার চাইতে বেশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন।উল্লেখ্য, পাইকপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৩ জন, সদস্য (মেম্বার) পদে ৪৭ জন ও সংরক্ষিত নারী সদস্য (মেম্বার) পদে ১৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ইউনিয়নের মোট ভোটার সংখ্যার ১৮ হাজার ৭৭০ জন।এসএস/পিআর