দেশজুড়ে

অরক্ষিত ফয়জাবাদ বধ্যভূমি

ইতিহাসের সাক্ষী হবিগঞ্জের ফয়জাবাদ বধ্যভূমি বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। পাহাড় ঘেরা এ বধ্যভূমিতে প্রতিনিয়ত নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটলেও তা যেন দেখার কেউ নেই। বধ্যভূমির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেলেও তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। মাঝে মাঝে চা বাগান কর্তৃপক্ষ এখানে ঝোপঝাড় পরিস্কার করলেও রক্ষাণাবেক্ষণ করে না কেউ। এখানে কখনও জাতীয় দিবসের কোনো অনুষ্ঠানও হয় না। এ ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার মোহাম্মদ আলী পাঠান জানান, এটি সংস্কারের জন্য তারা অনেক চেষ্টা তদবির করেছেন। কিন্তু কোনো ফল পাননি। সরকারি কোনো উদ্যোগও নেই। তিনি বলেন, আমরা এটি সংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের পক্ষ থেকে সীমিত আকারে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আশা করি এর কাজ শুরু করতে পারবো। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক সময় এখানে কাঁটাতারের বেড়া ছিল। সেটিও কে বা কারা তুলে ফেলেছে। বধ্যভূমির টিলাটি বাগানের বাইরে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বাগান কর্তৃপক্ষ এ টিলাটি বাগানের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে। অবিলম্বে এটি রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে এক সময় তা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জেলার বাহুবল উপজেলার শেষ প্রান্তে ঢাকা-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার সড়কের আমতলী চা বাগানে ঐতিহাসিক এ বধ্যভূমির অবস্থান। উক্ত সড়কে মিরপুর বাজার থেকে কিছু দূর এগুলেই জ্বালানি তেল শোধনাগার। এর প্রধান ফটকের ঠিক উল্টো পাশেই এ বধ্যভূমি। আমতলী চা বাগানের ৪নং সেকশনের একটি টিলার উপর এটি অবস্থিত। এর চারপাশ টিলায় ঘেরা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য বাঙালি নারী-পুরুষকে এখানে এনে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাক হায়েনারা। মুক্তিকামী অসংখ্য বীর যোদ্ধাকেও এখানে এনে হত্যার পর মাটিচাপা দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন এ স্থানটি চরম অবহেলায় পড়ে ছিল। অবশেষে ২০০৬ সালে সরকার এটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়। গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে টিলায় ওঠার জন্য নির্মাণ করা হয় একটি সিঁড়ি। উপরে হত্যাকাণ্ডের স্থানটিতে মনোরম একটি বধ্যভূমি নির্মাণ করা হয়। একই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর এর উদ্বোধন করেন তৎকালিন অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান। শুধু ঐতিহাসিক নয়, মনোরম এ স্থানটিতে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন বনভোজনেও যায়। কিন্তু নির্মাণের পর থেকে এটি রক্ষণাবেক্ষণে কারও কোনো উদ্যোগ নেই। ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেলে বাগান কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে তা পরিচ্ছন্ন করে।নির্জন এ বধ্যভূমিতে প্রতিনিয়তই ঘটে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড। সেখানে গিয়ে এর অসংখ্য প্রমাণও মিলেছে। বনভোজনে আসা মানুষজনের খাবারের প্যাকেট যেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তেমনি আছে অসামাজিক কাজের অনেক নিদর্শনও।আমতলী চা বাগানের বৃদ্ধ শ্রমিক বাবুল বাগতি জানান, এটি নির্মাণের পর থেকে তা মেরামতের উদ্যোগ কখনোই কেউ নেয়নি। মাঝে মাঝে বাগান কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এখানে দায়িত্বরত শ্রমিকরা তা পরিস্কার করেন। বাগানেরই বাসিন্দা জুয়েল মিয়া জানান, কখনোই এখানে জাতীয় দিবসে কোনো অনুষ্ঠান হতে দেখেননি তারা। পার্শ্ববর্তী লেবু বাগানের তত্ত্বাবধায়ক শংকর দাশ ও ঈদমল রানা জানান, প্রতিনিয়তই এখানে নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড ঘটে। অথচ এটি শুধু ঐতিহাসিক স্থান নয়, একটি পবিত্র কবরস্থানও বটে।ঘুরতে আসা দর্শনার্থী আনিছুজ্জামান চৌধুরী রতন জানান, এখানে যেসব অনৈতিক কাজের নিদর্শন দেখা গেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি আমাদের জন্য লজ্জাজনকও বটে। দ্রুত এটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।এফএ/জেআইএম