দেশজুড়ে

মেয়রের চেয়ার নিয়ে কাড়াকাড়ি

একটি ফৌজদারি মামলায় চার্জশিটভুক্ত হওয়ার পর প্রায় ১৭ মাস আগে সাময়িক বরখাস্ত হন কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র সরওয়ার কামাল। তার স্থলে চেয়ারে বসার কথা ছিল প্যানেল মেয়রদের যেকোন একজনকে। কিন্তু আইনি মারপ্যাঁচ ও মন্ত্রণালয়ের আদেশে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পান কাউন্সিলর ও জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী মাবু। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আদেশে বহিষ্কৃত মেয়র সরওয়ার কামালই তাকে দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন।

কিন্তু জনগণের রায়ে নগরপিতা হওয়ার পরও মামলার কারণে স্ব-পদ থেকে ছিটকে পড়া সরওয়ার দমে যাননি। আইনের সহযোগিতায় আবারও চেয়ারে বসার অধিকার ফিরে পাওয়ার আদেশ নিয়ে এসেছেন তিনি। আদালতের আদেশানুবলে নিজ পদ ফিরে পাওয়ার আশায় বুধবার বিকেলে কক্সবাজার পৌরসভায় আসেন সাময়িক বহিষ্কৃত মেয়র সরওয়ার কামাল।

সেখানে এসেই পৌরসভার প্যাডে তিনি ২৬ এপ্রিলের স্মারক (কপৌ/২০১৭/২২৮ (১৪)) মূলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সরবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর কক্সবাজার পৌরসভার মেয়রের দায়িত্বভার গ্রহণ বিষয়ে চিঠি পাঠান।

সেখানে উল্লেখ করা হয়, রিট পিটিশন নং-৫৫৯৭/২০১৭ এর আদেশের প্রেক্ষিতে নিম্ন স্বাক্ষরকারী ২৬ এপ্রিল অপরাহ্নে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পুলিশ সুপার, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-সচিব (পৌর-১), উপ-পরিচালক স্থানীয় সরকার কক্সবাজার, জেলা হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা, পৌরসভার কাউন্সিলর, নির্বাহী প্রকৌশলী, সচিব, হিসাব রক্ষককে চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে।

চেয়ার ফেরত পাওয়ার আদেশ নিয়ে তিনি পৌরসভায় এসেছেন এমন খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সরওয়ার ও মাবুর পক্ষের লোকজন, গোয়েন্দা সংস্থা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা পৌরসভায় ভিড় জমান।

সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতে চাইলে, পৌরসভার সম্মেলন কক্ষে তাৎক্ষণিক এক সংবাদ সম্মেলনে সরওয়ার কামাল গণমাধ্যমকে জানান, গত ২৪ এপ্রিল হাইকোর্টের বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি জাফর আহমদের নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ তাকে (সরওয়ার কামাল) মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনে আর কোনো বাঁধা নেই বলে আদেশ দেন।

সংবিধানের ৭ ও ১১ ধারার আলোকে দায়ের করা রিট পিটিশন (নং ৫৫৯৭/১৭) শুনানি শেষে আদালত এ আদেশ দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আর জনস্বার্থে রিট পিটিশনটি দায়ের করেন পৌরসভার উত্তর তারাবনিয়ারছড়ার মৃত আহমদ হোসাইনের ছেলে আবুল কাশেম।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, আমি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। একটি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে আমাকে হয়রানি করা হয়। ওই মামলায় আমি জামিনে রয়েছি। আদালতের আদেশে আমি বর্তমানে বৈধ মেয়র। তাই দায়িত্ব নিতে এসেছি।

কিন্তু সরওয়ার কামালের ক্ষমতা গ্রহণের এ দাবিকে অবান্তর বলে মন্তব্য করেছেন বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরী।

সন্ধ্যায় মেয়রের চেয়ারে বসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশ ছাড়া তিনি নিজে নিজে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন না। আর তিনিও (মাবু) তাকে (সরওয়ারকে) ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেন না।

তিনি বলেন, আমাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ওই মন্ত্রণালয়ের চিঠি না পাওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব হস্তান্তর করা অসম্ভব।

পৌরসভায় এসে মেয়র সরওয়ার কামালের কর্মকান্ডকে গুণ্ডামি বলে অবিহিত করেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র। এসব বিষয় উল্লেখ করে তিনিও ২৬ এপ্রিল অপর এক স্মারকমূলে (কক্স:পৌর:/২০১৭/২২৯) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর অপর একটি পত্র পাঠান।

সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ২৬ এপ্রিল বিকাল সাড়ে তিনটায় কক্সবাজার পৌরসভার বরখাস্তকৃত মেয়র সরওয়ার কামাল মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের অজুহাত দিয়ে ভাড়াটিয়া গুন্ডাবাহিনী ও দলবল নিয়ে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারির উপর চাপ সৃষ্টি করে অবৈধভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। চেয়ারে বসে বর্মকর্তা-কর্মচারিদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে থাকেন। এমতাবস্থায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।

প্রথম চিঠিতে দায়িত্বভার গ্রহণের কথা উল্লেখ করলেও রাত ৮টার দিকে সংশোধিত অপরপত্রে দায়িত্ব গ্রহণের ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে ফিরে যান বলে উল্লেখ করা হয়। এ চিঠিটিও সরওয়ার কামালের মতো প্রশাসনের ১১ জনের কাছে অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

মাবুর মতে, সরওয়ার কামাল নির্বাচিত মেয়র এটা ঠিক। কিন্তু বরখাস্ত হওয়ার আদেশ আদালত কর্তৃক স্থগিতকরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সংক্রান্ত লিখিত প্রজ্ঞাপন মন্ত্রণালয় থেকে আনতে হবে।

বরখাস্তকৃত ও ভারপ্রাপ্ত মেয়রের চেয়ার কাড়াকাড়ি নিয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ভারপ্রাপ্ত মেয়রের বিষয়ে যে আদেশ এসেছিল এরপর থেকে আজ (গতকাল বুধবার) পর্যন্ত সরওয়ার কামালের স্বপদে বহালের বিষয়ে এখনো অফিসিয়ালি কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবে আদালতের একটি আদেশ বলে পৌরসভায় ক্ষমতা গ্রহণ ও বর্জন নিয়ে নানা ঘটনা হয়েছে বলে শুনেছি।

সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. খলিলুর রহমান স্বাক্ষরিত এক (যার স্মারক নং-স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয় ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ, পৌর-১ শাখা- ৪৬.০০.০০০.০৬৩.২৭.০১৫.১৫-২১৮৮/১(৮) প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মেয়র সরওয়ার কামালকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এরপর থেকে পৌর কাউন্সিলর মাহবুবুর রহমান ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সায়ীদ আলমগীর/এফএ/পিআর