প্রথমত প্রতিবেশী। তার উপর সৌদি আরবে দু’জন কাজ করতেন একই কপিলের হয়ে। এ কারণে দুর্ঘটনার পর মরদেহ দেশে আনা ও দাফনসহ সকল কাজে সহযোগিতা দিয়েছেন তিনি। ঘরের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অথৈ সাগরে পড়া পরিবার ও এতিম শিশুদের প্রতি দয়াপ্রবণ হয়ে সহকর্মীর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ নিয়ে দিতে তিনি সহযোগিতার প্রস্তাব দেন।
কাজ গতিশীল করতে পরিবারের পক্ষে নানা ফরমেটে হলফনামা করে দেয়া হয় ‘পাওয়ার অব এটর্নি’। এর অনুবলে পায় ক্ষতিপূরণের ২ লাখ ২৫ হাজার সৌদি রিয়াল (বাংলাদেশি টাকায় ৪৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা)। কিন্তু এ টাকা বিধবা স্ত্রী, এতিম সন্তান ও দূর্গতিতে পড়া পরিবারের কাছে আসেনি।
অনেক দেন দরবারের পর টাকা দেয়ার কথা বলে নিহতের স্ত্রীকে ডেকে নেয়া হয় বাড়িতে। সেখানে হাতে চার লাখ টাকা ধরিয়ে দেয়ার পর ফিল্মি স্টাইলে ভাড়াটিয়া লোকজন দিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়া হয়। বাড়াবাড়ি করা হলে ভয় দেখানো হয় সন্তানদের অপহরণ ও হত্যার।
এসব বিষয় উল্লেখ করে কক্সবাজারের পেকুয়ার উপকুলীয় ইউনিয়ন রাজাখালীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন ঘোনার মৃত ইউছুপ আলীর ছেলে আবদুল মালেকসহ (৪৩) ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন একই ওয়ার্ডের পালাকাটা গ্রামের মৃত আবদুল জব্বারের স্ত্রী রুমানা আকতার (২৬)। আবদুল জব্বার ২০১৪ সালের ২৭ জুন সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তার পাসপোর্ট নাম্বার সি-১২২৮৬০৯ ও সৌদি একামা নাম্বার-২১৪৮৭০৯০৪৭।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, আবদুল জব্বার ও আবদুল মালেক পাশাপাশি গ্রামের অধিবাসী। সৌদি আরবেও তারা একই কপিলের হয়ে কাজ করতেন। আবদুল জব্বার সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাবার ৯ মাস পর ২০১৫ সালের ৫ মার্চ এসভি-৮০০ ফ্লাইটে তার মরদেহ বাংলাদেশে এনে ৭ মার্চ দাফন করা হয়।
মরদেহের সঙ্গে আসা আবদুল মালেক আবার কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সময় তার সহকর্মীর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দিতে পারেন বলে জানিয়ে ‘পাওয়ার অব এটর্নি’ দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিবেশী ও একই কোম্পানীর সহকর্মী হিসেবে বিশ্বাস করে তার কথামতো সমস্ত কাগজ তৈরি করে দেয়া হয় (চট্টগ্রামের শামশুল আলম চৌধুরীর নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ের হলফনামা নম্বর-৯৬/২০১৪)।
পরে সৌদি সরকারের চাহিদামতো আরবিতে সেসব কাগজপত্র আবারো নোটারি করে (চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হলফনামা-৪১১/২০১৬) পাঠানোর পর সেগুলো জমা দিয়ে যাবতীয় সরকারি পাওনা দাবি করা হয়। ক্ষতিপূরণ হিসেবে আবদুল জব্বারের পরিবারের পক্ষে এটর্নি পাওয়ার মূলে আবদুল মালেকের নামে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ২ লাখ ২৫ হাজার রিয়ালের একটি চেক হস্তান্তর করে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
খবরটি মুঠোফোনে জানানোর পর চেকের একটি ছায়াকপিও মামলার বাদিনী রুমানা আকতারের কাছে পাঠান আবদুল মালেক। পরে চেকটি আবদুল মালেক নিজ একাউন্টে জমা করে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে এসে টাকাটি নিহত আবদুল জব্বারের স্ত্রী ও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল।
কিন্তু তিনি (আবদুল মালেক) ফেব্রুয়ারিতে দেশে এসেছেন ঠিকই তবে টাকাটি হস্তান্তর করতে গড়িমসি শুরু করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি নিজে গিয়ে টাকা পেতে ব্যর্থ হয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেশী ও স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েও হেনস্তা ও নিগৃহীত হয়ে ফিরে আসেন রুমানারা।
ঘটনা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানানোর পর তারা থানার আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেন। সেই মতো এগুচ্ছে জানতে পেরে সমস্ত টাকা পরিশোধ করবে জানিয়ে বৈঠকে বসার প্রস্তাব জানায় মালেকরা। তাদের মতলব খারাপ হতে পারে এটি মাথায় রেখে ৩ এপ্রিল একটি কোর্ট ডায়রি করা হয় (৪৩/২০১৭)। তাদের নির্দেশনা মতে এলাকার কয়েক ব্যক্তি ও মামলার কয়েক সাক্ষী ও নাবালক সন্তানসহ ৪ এপ্রিল বিকেল ৫টায় মামলার ২ নম্বর আসামির বাড়িতে যান।
কিন্তু সেখানে হঠাৎ আসামিরা সশস্ত্রাবস্থায় এসে তাদের ঘিরে ফেলে এবং এক লাখ টাকার ৪টি বান্ডিল দিয়ে একটি পূরণ করা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বলে। বাকি টাকা দাবি করায় ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর না করায় সন্তানদের অপহরণ ও হত্যার ভয় দেখায়। অবস্থা বেগতিক দেখে তাদের নির্দেশনা মতো স্বাক্ষর দিয়ে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসেন রুমানারা। এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার হুমকিও দেয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়।
মামলাটি আমলে নিয়ে চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বিষয়টি তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশনা দিয়েছেন। এটি এখন তদন্ত করছে কক্সবাজার পিবিআই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা বলেন, বিনা কষ্টে পাওয়া টাকা হজম করতে মালেক জনপ্রতিনিধি-পুলিশ ও আইন কেনার হুমকি দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে পোষা ব্যক্তিদের বেতন দিয়ে নিজের পক্ষে মত তৈরী ও জব্বারের পরিবারকে বেকায়দায় ফেলার ফন্দি বের করাচ্ছেন।
রাজাখালী ইউপি চেয়ারম্যান ছৈয়দ নূর বিষয়টি জেনেছেন উল্লেখ করে বলেন, ঘটনাটি বড়ই অমানবিক। বিষাদে পড়া একটা পরিবার ও এতিমের হক এভাবে আত্মসাতের অপচেষ্টা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যেহেতু বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে, তাই প্রশাসন চাইলে সত্য উদঘাটনে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কক্সবাজার পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহেদ উল্লাহ জানান, আদালতের কপিটি কক্সবাজার পিবিআইতে আসার পর তদন্তের দায়িত্বভার আমার উপর ন্যাস্ত হয়েছে। অভিযোগটি স্পর্শকাতর। সুক্ষ্মভাবে সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/এমএস