দেশজুড়ে

বেনাপোল এক্সপ্রেসের টিকিট যেন সোনার হরিণ

যশোরের বেনাপোল থেকে ঢাকায় যাতায়াত করা ‘বেনাপোল এক্সপ্রেসের’ ট্রেনের আগের ইঞ্জিন ও ১২টি বগি বদলি হয়েছে। নতুনভাবে আরেকটি ইঞ্জিন ও ৮টি বগি ট্রেনটিতে দেওয়া হয়েছে। ফলে টিকিট সংকটে ভুগছেন যাত্রীরা। ঢাকায় যাওয়ার পাঁচদিন আগেও মিলছে না কোনো টিকিট।

এছাড়া স্টেশনে ইয়ার্ড সংকটে সময় মতো ট্রেন পৌঁছাতে না পারায় ভোগান্তির পাশাপাশি নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে যাত্রীদের। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদামতো যাত্রীদের টিকিট দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। চলমান এ সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেনাপোল বন্দরে আমদানি বাণিজ্য থেকে বছরে সরকারের ৬ হাজার কোটি টাকা ও ভ্রমণখাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। ব্যবসা, শিক্ষা, ভ্রমণ ও চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতিবছর প্রায় ১৮ লাখ পাসপোর্টযাত্রী ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যাতায়াত করেন। সড়ক পথে যাতায়াতে ফেরিতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ ও সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে দীর্ঘদিন ধরে যাতায়াতকারী যাত্রীদের দাবি ছিল বেনাপোল-ঢাকা-বেনাপোল রুটে রেল সেবার।

অবশেষে বেনাপোলের গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৯ সালের ১৭ জুলাইয়ে ওই রুটে ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি চালু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। ওই সময় ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা পিটি ইনকা সিবিসি কাপ্লিং ট্রেন চলতো। এতে অত্যাধুনিক ১২টি বগি ছিল। এর মধ্যে চারটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগিও ছিল। পরে করোনায় ট্রেনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আট মাস বন্ধ থাকার পর ২ ডিসেম্বর থেকে ফের চালু হয় ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’। তবে ইঞ্জিনসহ ইন্দোনেশিয়ার ১২টি বগি বদলি করা হয়। সেখানে যুক্ত হয় নতুন ইঞ্জিনসহ আটটি ভারতীয় বগি।

ইন্দোনেশিয়ার ১২টি বগির মধ্যে কেবিনে ছিল ৪৮টি আসন, এসি চেয়ারে ছিল ৭৮টি। নন এসি চেয়ার ছিল ৭৬০টি আসন। বর্তমানে ভারতীয় আটটি বগির মধ্যে কেবিনে দিনে আটটি ও রাতে থাকে চারটি সিট। নন এসি চেয়ারে আসন আছে ৭৪৫টি। সপ্তাহে একদিন বুধবার চলাচল বন্ধ থাকে।

তবে বর্তমানে ট্রেনের টিকিট এখন সোনার হরিণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঢাকায় যাত্রার পাঁচদিন আগেও স্টেশনে গেলে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত টিকিট। এ কারণে যশোরসহ বেনাপোলের যাত্রীরা ট্রেনটিতে আগের মত ১২টি বগি যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। যাতে তারা চাহিদা মতো টিকিট কেটে নিরাপদে ঢাকায় যাতায়াত করতে পারেন।

ট্রেনযাত্রী মশিউর রহমান বলেন, বেনাপোল এক্সপ্রেসের আগের ট্রেনটি পরিবর্তন করায় বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। নামাজের ব্যবস্থা নেই, এসি চেয়ার কোচ নেই, বাথরুম ভালো না। এছাড়া স্টেশনে চাহিদা মত ইয়ার্ড না থাকায় সময় মতো রেল স্টেশনে পৌছায় না।

ট্রেনযাত্রী হাবিব চৌধুরী বলেন, ব্যবসায়িক কাজে প্রতিমাসে আমার ৪-৫ বার ঢাকা যেতে হয়। বেনাপোল এক্সপ্রেস চালু হওয়ার পর থেকে আমি ঢাকায় প্লেনে না যেয়ে ট্রেনে চলাচল শুরু করি। অনেকদিন পর ট্রেনটি ফের চালু হয়েছে। কিন্তু টিকিটের জন্য স্টেশনে এসে ট্রেনটিতে এসি নেই শুনে অবাক হলাম।

আরেক যাত্রী হায়দার আলী বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় সাত হাজার পাসপোর্টযাত্রী প্রতিদিন বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে যাতায়াত করে। এছাড়া বেনাপোল, শার্শা ও নাভারনের অসংখ্য স্থানীয় মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু এখন পাঁচদিন আগেও টিকিট মিলছে না। চারটি বগি কমিয়ে দেওয়ায় আমরা টিকিট পাচ্ছি না।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ট্রেন পাল্টে দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে নাগরিক অধিকার আন্দোলন যশোর এবং সেবা সংগঠন ঝিকরগাছা। একই সঙ্গে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।

তাদের অভিযোগ, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ট্রেনটি রেলমন্ত্রী তার নিজের এলাকায় নিয়ে পুরোনো একটি স্ক্রু কাপ্লিং ট্রেন দ্বারা বেনাপোল-ঢাকা রুট চালু করেছ। এ রুটে শুধুমাত্র বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষই যাতায়াত করে না বরং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতগামী ও ভারতফেরত অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও নিয়মিত যাতায়াত করে থাকে।

প্রধানমন্ত্রীর উপহার দেওয়া ইন্দোনেশিয়ান পিটি ইনকা সিবিসি কাপ্লিং ট্রেন ফেরত না দিলে আগামীতে রেলপথ অবরোধের মত কঠোর কর্মসূচি দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেয় তারা।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন অভিযোগ করে বলেন, বেনাপোলবাসীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ট্রেনটি বর্তমানে উত্তরবঙ্গে নিয়ে গেছেন রেলমন্ত্রী। নিম্নমানের রেল দিয়েছেন বেনাপোল রুটে। বেনাপোল-ঢাকা-বেনাপোল রুটে পূর্বের ট্রেনটি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

বেনাপোল পৌর কাউন্সিলর মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১২টি বগির ইন্দোনেশিয়ার ট্রেনটি আবার এখানে দেখতে চাই। বেনাপোলে যেভাবে যাত্রীর চাপ তাতে আট বগি দিয়ে ট্রেনটি চলাচলে নানা সমস্যায় পড়ছেন স্থানীয়সহ ভারত থেকে আগত পাসপোর্টযাত্রীরা। পরিবহনের (বাস) চেয়ে ট্রেনে যাতায়াত নিরাপদ ও আরামদায়ক। দ্রুত যাতে আগের ট্রেনটি ঢাকা-বেনাপোল রুটে চলাচল করতে পারে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাই।

এ বিষয়ে বেনাপোল রেলস্টেশন মাস্টার সাইদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনটির টিকিটের চাহিদা অত্যাধুনিক। মানুষ নিরাপদে কম সময়ে ঢাকায় যাতায়াতের জন্য এ ট্রেনটি চালু করা হয়। কিন্তু মানুষের চাহিদামতো টিকিটের যোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বেনাপোল বন্দর থেকে বেনাপোল-ঢাকা রুটে ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’, খুলনা-বেনাপোল রুটে ‘বেতনা এক্সপ্রেস’ ও খুলনা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ ট্রেন চলাচল করে। তবে করোনার কারণে বর্তমানে বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেনটি বন্ধ আছে।

যশোর রেলস্টেশনের মাস্টার আয়নাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বেনাপোল এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনটির আগের ইঞ্জিনসহ বগি বদলে গেছে। এখন ভারতীয় ইঞ্জিনসহ আটটি বগিতে ট্রেনটি চলাচল করছে। কীভাবে আগের ট্রেনটি বদলেছে সেটা আমার জানা নেই। তবে যাত্রীর চাহিদার কারণে বগি বাড়ানোর বিষয়টি রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

মো. জামাল হোসেন/এসজে/জিকেএস