সুজান ভাইজ
নির্বাচনের ফলের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য তথ্যের অখণ্ডতা অপরিহার্য
নির্বাচনের ফলাফলের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য তথ্যের অখণ্ডতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেসকো) প্রতিনিধি সুজান ভাইজ।
তিনি বলেন, নির্বাচন কেবল ১২ ফেব্রুয়ারি একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির পরও তা চলমান থাকবে। ফলে নির্বাচনের চারপাশে থাকা তথ্যের ইকোসিস্টেম শক্তিশালী না হলে ফলাফল বিশ্বাসযোগ্য হবে না। এজন্য তথ্যের অখণ্ডতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল অ্যান্ড পলিসি সায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশন (পিপিএসআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে ইউনেসকো প্রতিনিধি এসব কথা বলেন।
সুজান ভাইজ বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ১৩ ফেব্রুয়ারি জনগণ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্বাস করবে কি না, গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য গ্রহণ করবে কি না এবং পরবর্তী সরকারে আস্থা রাখবে কি না। ভোট গণনা সাধারণ মানুষ করবে না, তাই তথ্যের অখণ্ডতাই এখানে মূল চাবিকাঠি। এটি নির্ভর করে তথ্যে প্রবেশাধিকার, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং তা বোঝার সক্ষমতার ওপর।
তিনি জানান, নির্বাচন মানে মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিফলন। যদি গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিষয়বস্তু মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিফলন না ঘটায়, তবে তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। বর্তমানে কণ্ঠস্বরগুলো বহুমাত্রিক। শক্তিশালী তথ্যব্যবস্থা ও স্বাধীন গণমাধ্যম না থাকলে এসব কণ্ঠস্বরের ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সুজান ভাইজ বলেন, এটি কেবল যা খুশি তা প্রকাশের স্বাধীনতা নয়। এর সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। সেই দায়িত্ব হলো, প্রকাশিত তথ্য যেন বিশ্বাসযোগ্য হয় এবং সর্বোত্তম উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়। এখানেই ভালো গণমাধ্যম, খারাপ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পার্থক্য স্পষ্ট হয়। ভালো গণমাধ্যম ফ্যাক্ট-চেকিং করে, খারাপ গণমাধ্যম তথ্য বিকৃত করে উপস্থাপন করতে পারে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্য ও কল্পনা মিশে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। তাই মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ম্যালইনফরমেশন এড়াতে ক্রিটিক্যাল থিংকিং এবং মিডিয়া ও ইনফরমেশন লিটারেসি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
সেমিনারে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হোকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, নরওয়ের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত হলেও এটি হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। কয়েক শতাব্দীর সংস্কার, আলোচনা এবং সর্বোপরি আস্থার মধ্য দিয়েই এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ১৮১৪ সালে প্রণীত নরওয়ের সংবিধান এখনো কার্যকর থাকা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সংবিধান, যা ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও জনগণের সার্বভৌমত্বের নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ১৮৯৮ সালে সর্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকার এবং ১৯১৩ সালে নারীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশটির গণতান্ত্রিক চর্চা ধারাবাহিকভাবে বিকশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, নরওয়েতে ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের নেতারাও অনেক সময় ব্যক্তিগতভাবে বন্ধু থাকেন, যা দেশটির শান্ত ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক। ব্যক্তিগত সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে তিনি সুস্থ গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।
সেমিনারে বাংলাদেশে একটি স্থিতিস্থাপক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে চারটি মূল সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলো হলো- আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন, ডিজিটাল অপপ্রচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, দেশি-বিদেশি স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও দলীয় এজেন্টদের নিরাপত্তাসহ শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজ ও সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ গড়ে তোলা।
এফএআর/একিউএফ